দেহভাষায়ও লাগে ভ্রু-পল্লবের দোলা
আমার এক চাচাতো বোনকে একুশে বইমেলা থেকে কেনা একটি বইয়ে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। লিখেছিলেন, 'ভ্রু-পল্লবে ডাক দিলে, দেখা হবে চন্দনের বনে।'
চন্দনের বন কোথায়, কখন বা কীভাবে সেখানে ডাক দিতে হবে, তার কিছুই অবশ্য বলা ছিল না। তবে এ নিয়ে বোনকে আমরা কম ঠাট্টা করিনি! ডাকসাইটে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ অটোগ্রাফে তুলে দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কবিতার পঙ্ক্তি। কিন্তু 'ভ্রু-পল্লবে' ডাক দেওয়ার কথাটিই দেহভাষার একটি চমৎকার উদাহরণ।
'মার হবে, শব্দ হবে না'—কয়েক বছর আগে কথাটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। দেহভাষার ক্ষেত্রেও অনেকটা এমনই ঘটে। কথা ছাড়াই ভাবের আদান-প্রদান হয়। একজনের মনের সংকেত পৌঁছে যায় অন্যজনের কাছে। কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারিত হয় না, মুখে ফোটে না কোনো বচন। সবটাই অবাচনিক।
অর্থাৎ দেহভাষা এক নীরব ভাষা। অঙ্গভঙ্গি, চোখের ইশারা, মুখের অভিব্যক্তি ও শারীরিক ভঙ্গিমার মাধ্যমে মানুষ তার আবেগ, উদ্দেশ্য, চিন্তাভাবনা এবং সামাজিক মনোভাবের নানা সংকেত প্রকাশ করে। কথ্য ভাষার পরিবর্তন যেমন স্পষ্টভাবে শনাক্ত ও নথিবদ্ধ করা যায়, দেহভাষার বিবর্তন তেমন নয়। এর পরিবর্তন ঘটে অনেকটাই সূক্ষ্মভাবে। তবে এসব সূক্ষ্ম পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও সমাজ ও সংস্কৃতির বৃহত্তর রূপান্তরের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সময়ের সঙ্গে দেহভাষা কীভাবে বদলেছে, তা বুঝতে হলে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণা শুধু অবাচনিক যোগাযোগের পরিবর্তনশীল ধরনই তুলে ধরে না, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সমাজের বিবর্তন সম্পর্কেও গভীর ধারণা দেয়।
তবে দেহভাষার ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে আরও বহু দূরের অতীতে। যখন মানুষের মুখের ভাষারই জন্ম হয়নি। দেহভাষা যোগাযোগের এক আদিম মাধ্যম। কথ্য ভাষারও আগে থেকে এর প্রচলন। আমাদের আদি পূর্বপুরুষেরা অঙ্গভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি ও চোখের ইশারায় নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতেন, ইচ্ছা-অনিচ্ছা কিংবা অভিপ্রায় জানাতেন। এসব সংকেতের মাধ্যমেই তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে উঠেছিল। তৈরি হয়েছিল সামাজিক বন্ধন। কিন্তু কীভাবে এই নীরব যোগাযোগের বিকাশ ঘটল? কীভাবে দেহভাষার ওপর নির্ভরশীল সেই আদিম মানুষ একসময় মুখের ভাষা আয়ত্ত করল? আর কীভাবেই বা দেহভাষা মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের অংশ হয়ে উঠল?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হবে মানুষের বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে। সেই ইতিহাসের অনেক অজানা অধ্যায় উন্মোচনে সহায়তা করেছে জিনবিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান ও প্রাণীর আচরণবিষয়ক গবেষণা। আর সেই দীর্ঘ যাত্রার শুরুটা আমাদের নিয়ে যায় প্রায় ৫০ লাখ বছর আগের মানুষের পূর্বপুরুষদের কাছে।
প্রাইমেট বা বানরজাতীয় প্রাণীদের আচরণ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, অবাচনিক যোগাযোগ আমাদের সম্মিলিত বিবর্তনের ইতিহাসেরই অংশ। শিম্পাঞ্জি ও বোনোবো নানা আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করে। আগ্রাসন থেকে স্নেহ-ভালোবাসা—সবই। এ জন্য আজও তারা অঙ্গভঙ্গি ও নানা শারীরিক ইশারা-ইঙ্গিত ব্যবহার করে।
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিটি সংস্কৃতিতে অবাচনিক যোগাযোগের নিজস্ব রীতি গড়ে উঠেছে। কিছু অঙ্গভঙ্গির অর্থ নির্ভর করে পরিস্থিতি ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতির ওপর। একই অঙ্গভঙ্গি এক সংস্কৃতিতে যে অর্থ বহন করে, অন্য সংস্কৃতিতে তার অর্থ হতে পারে পুরোপুরি ভিন্ন।
বুড়ো আঙুল দেখানোর কথাই ভাবুন। আজ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেও বাংলাদেশে বুড়ো আঙুল দেখানো মানে ছিল 'কলা' বা 'কাঁচকলা'। রাগ, ঘৃণা বা অপমানের প্রকাশ। অপমানজনক হিসেবেই ধরা হতো। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো অঞ্চলেও এই অঙ্গভঙ্গিকে অপমানজনক বলে মনে করা হয়।
অথচ পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে দেখানো সম্মতি বা অনুমোদনের প্রতীক। বাংলাদেশের সমাজেও এখন এই দেহভাষা ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। অন্যদিকে জাপানে মাথা নত করে অভিবাদন জানানোর মাধ্যমে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা প্রকাশ করা হয়। এটি দেশটির সৌজন্যবোধ ও শ্রদ্ধাশীল সংস্কৃতির মূল্যবোধের প্রতীক।
বাংলাদেশে কোনো মুরব্বি বা ভারী পদ-পদবির মানুষকে হাতের ইশারায় ডাকা যায় না। সাধারণভাবে এভাবে ডাকা যায় রেস্তোরাঁর বয়-বেয়ারাদের বা সমাজের নিচুতলার মানুষদের।
ফ্লাইং কিস—একেবারে পশ্চিম থেকে আমদানি করা জিনিস। এখানে কোনো ভেজাল নেই। দুই প্রজন্ম আগেও এটিকে কেবল সাহেবি চালচলন বা ফিরিঙ্গিপনা হিসেবে ভাবা হতো। এখন সমাজে এর বিস্তার ঘটেছে। ব্যবহারও দেখা যায়। নিজে কখনো ব্যবহার করেছি কি না, সে প্রশ্নের জবাবে মৌনবাবা সেজে থাকাই উত্তম। কোন কথা কোথায় বিপদ আর কোথায় আপদ হয়ে দেখা দেয়, তার ঠিক-ঠিকানা আছে!
দেহভাষা, বিশেষ করে মানুষের অভিব্যক্তি নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে রেনেসাঁ যুগে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ও মাইকেলেঞ্জেলোর মতো শিল্পীরা মানুষের শারীরিক গঠন ও চলন নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল শিল্পকর্মে মানুষের নানা ধরনের আবেগ যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা।
শিল্পীদের এই গবেষণা দেহভাষা সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। মানুষের অভিব্যক্তি ও আবেগ প্রকাশের বিষয়টি আরও সচেতনভাবে বিবেচিত হতে থাকে। সমাজের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেহভাষা সম্পর্কেও মানুষের ধারণা বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক ভাববিনিময়ে দেহভাষার গুরুত্বও দিনে দিনে বেড়েছে।
দেহভাষার ওপর সামাজিক কাঠামোরও প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতার স্তরবিন্যাস ও ক্ষমতার সম্পর্ক এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রভাব ফেলে। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনসমাগমস্থলসহ বিভিন্ন পরিবেশ মানুষের অবাচনিক অভিব্যক্তিকে প্রভাবিত করে। সময়ের সঙ্গে সমাজের কাঠামো ও রীতিনীতি বদলায়। সেই সঙ্গে পরিবর্তন আসে দেহভাষার প্রচলিত নিয়মেও।
দেহভাষার বিবর্তনে নারী-পুরুষের সামাজিক ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যগতভাবে মনে করা হতো, পুরুষ ও নারী নিজেদের ভিন্ন ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। পুরুষদের মধ্যে দেহভাষার মাধ্যমে কঠোরতা ও আধিপত্যের ভাব প্রকাশের প্রবণতা গড়ে তোলা হতো। অন্যদিকে নারীদের শেখানো হতো নমনীয়, সহযোগিতাপ্রবণ ও যত্নশীল হতে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে লিঙ্গসমতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণারও পরিবর্তন ঘটছে। এখন নারীরা আগের তুলনায় আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ় দেহভাষা ব্যবহার করছেন। খোলামেলা আচরণকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রভাবেও দেহভাষার প্রচলিত রীতিনীতি বদলে যেতে পারে। যেমন ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে নারীমুক্তি আন্দোলনের উত্থান নারী-পুরুষের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে নির্ধারিত সামাজিক ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এর ফলে নারীরা জনসমক্ষে উপযুক্ত অঙ্গভঙ্গি ও দেহভাষার মাধ্যমে নিজেদের আরও দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন।
একইভাবে নাগরিক অধিকার আন্দোলন অবাচনিক অভিব্যক্তির নতুন ধারা তৈরি করে। এর একটি প্রতীকী উদাহরণ হলো মুষ্টিবদ্ধ হাত ওপরে তুলে ধরা। ঐক্য ও প্রতিবাদ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে এই অঙ্গভঙ্গি ব্যবহৃত হয়। এসব আচরণ বা অভিব্যক্তি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেহভাষাও কীভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
কানাডীয় যোগাযোগ তত্ত্ববিদ মার্শাল ম্যাকলুহানের বিখ্যাত ধারণা—'মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ', অর্থাৎ যোগাযোগের মাধ্যমই অনেক সময় বার্তার অর্থ ও প্রভাব নির্ধারণ করে। দেহভাষার ক্ষেত্রেও আজকের দিনে কথাটি যেন নতুনভাবে সত্য হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দেহভাষা ও অবাচনিক যোগাযোগের ধরন গভীরভাবে বদলে দিচ্ছে। এখন মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের বড় একটি অংশই হচ্ছে বিভিন্ন পর্দার মাধ্যমে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দেহভাষার প্রকাশ ও ব্যবহারের ধরনও প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।
খুদে বার্তা বা ই-মেইলের মতো ডিজিটাল যোগাযোগে সাধারণত দেহভাষার সরাসরি কোনো সুযোগ নেই। ফলে মানুষ নিজের ভাব, আবেগ ও অভিপ্রায় প্রকাশের জন্য ইমোজি, জিআইএফ ও যতিচিহ্নের ওপর নির্ভর করছে।
ইমোজি যেমন লিখিত বার্তায় বাড়তি মাত্রা ও সূক্ষ্মতা যোগ করে। এর মাধ্যমে প্রেরক একটি নির্দিষ্ট বার্তায় ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা বুঝতে কিছুটা সুবিধা হয়। তবে এ ধরনের যোগাযোগে ভুল-বোঝাবুঝির আশঙ্কাও থাকে। কারণ, এখানে মানুষের সরাসরি শারীরিক উপস্থিতি নেই। ফলে দেহভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত অনেক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হারিয়ে যায়।
কোভিড-১৯ বিশ্বমারির সময় জুমের মতো ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তার ঘটে। এর ফলে অবাচনিক যোগাযোগের ধরনেও পরিবর্তন আসে।
ভার্চুয়াল বৈঠকে যোগাযোগের মাধ্যম বদলে যাওয়ায় একই বার্তার গুরুত্ব এবং তা প্রকাশের ধরনও বদলে যায়। সীমিত দৃশ্যমানতা—অর্থাৎ পর্দায় সাধারণত পুরো শরীর দেখা যায় না, মুখ ও শরীরের সামান্য অংশই দেখা যায়—এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। ক্যামেরার কোণ এবং দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার ক্লান্তিও যোগাযোগের ওপর প্রভাব ফেলে। চোখের যোগাযোগ, শারীরিক ভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গির মতো অবাচনিক ইশারা-ইঙ্গিতও এই নতুন ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন রূপ নিচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো 'জুম ক্লান্তি'। ক্যামেরার সামনে নিজের দেহভাষা নিয়ে সারাক্ষণ সচেতন ও সতর্ক থাকতে হয়। বিষয়টি বেশ ক্লান্তিকর হতে পারে। একই সঙ্গে এটি মানসিক চাপও তৈরি করতে পারে। এই অভিজ্ঞতা অনেকেই হাড়ে হাড়ে বুঝতে শিখেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেহভাষাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। এসব মাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট নির্মাতাদের পথ এক হয়ে গেছে। দুদলই পরিকল্পিতভাবে দেহভাষা ব্যবহার করেন। দর্শক ও অনুসারীদের নজর কাড়তেই তারা এমনটি করেন।
টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো মাধ্যম দৃশ্যনির্ভর। সেখানে গল্প বলার সময় অঙ্গভঙ্গি, ইশারা-ইঙ্গিত, মুখের অভিব্যক্তি ও শারীরিক ভঙ্গি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এসবের মাধ্যমেই অনেক অবাচনিক বার্তা পৌঁছে যায়।
এর ফলে 'ভাইরাল অঙ্গভঙ্গি'র প্রচলন ঘটছে। অর্থাৎ কিছু বিশেষ অঙ্গভঙ্গি খুব অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এগুলো দ্রুত বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বদলে দিতে পারে অবাচনিক যোগাযোগের গোটা চিত্র।
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে আবেগ প্রকাশের ধরন এক নয়। আবেগ প্রকাশের গ্রহণযোগ্য রীতিনীতিতেও পার্থক্য রয়েছে। এশিয়ার বেশ কিছু অঞ্চলে আবেগ প্রকাশে সংযম ও সূক্ষ্মতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে সামষ্টিক সম্প্রীতি ও ঐক্যের ওপর জোর দেওয়া সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটে।
অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সংস্কৃতিতে আবেগের খোলামেলা প্রকাশকে উৎসাহিত করা হয়। ফলে সেখানে দেহভাষার মাধ্যমে আবেগ প্রকাশের প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্ট হতে পারে।
আবেগ প্রকাশের এসব সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের অবাচনিক যোগাযোগের ধরন নির্ধারণ করে। সময়ের সঙ্গে এসব দৃষ্টিভঙ্গিও বদলায়। পাশাপাশি বদলায় দেহভাষা।
যাদের মধ্যে সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা বেশি, তারা সাধারণত অন্যের দেহভাষা বুঝতে পারদর্শী হন। এর অর্থও তারা তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
দেহভাষা আবেগ প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই উপলব্ধি থেকেই বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তব্যক্তিক দক্ষতা বাড়ানোর কর্মশালা ও পাঠ্যক্রমেও দেহভাষা স্থান পেয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিও দেহভাষার প্রচলিত রীতিনীতি পরিবর্তনের একটি কারণ। বর্তমানে মানুষ নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আগের তুলনায় বেশি খোলামেলা কথা বলছে। এ বিষয়ে কথা বলতে তারা এখন বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। ফলে দেহভাষাকেও এখন দুর্বলতা প্রকাশ কিংবা সহায়তা চাওয়ার একটি সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রচলিত গৎবাঁধা ধারণা শিথিল হয়েছে। সমাজও আরও সহনশীল হয়ে উঠছে। ফলে মানুষ খোলামেলা শারীরিক ভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে।
বিশ্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেহভাষার গতিপ্রকৃতিও বদলাবে। প্রযুক্তির বিকাশ, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং সামাজিক রীতিনীতির রূপান্তর ভবিষ্যতের অবাচনিক যোগাযোগের ধরনও নির্ধারণ করবে।
দেহভাষার ভবিষ্যৎ বিবর্তনে বিশ্বায়নও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। পাশাপাশি মূল্যবোধেরও মেলবন্ধন ঘটছে। এর ফলে অবাচনিক যোগাযোগে নতুন নতুন উপাদান যুক্ত হবে। অঙ্গভঙ্গির একটি অভিন্ন সংস্কৃতিও গড়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন সংস্কৃতির অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তির মিশ্রণে দেহভাষা আরও সমৃদ্ধ হবে। ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে অবচেতন পর্যায়ের যোগাযোগের দূরত্বও কমে আসতে পারে।
লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয় ও ব্যক্তিসত্তাকে ঘিরে সামাজিক রীতিনীতি বদলাচ্ছে। এর সঙ্গে বদলাবে দেহভাষার প্রেক্ষাপটও।
পরিবর্তনশীল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ মানুষকে আরও স্বতঃস্ফূর্ত ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিজেকে প্রকাশের সুযোগ করে দেবে। অন্যদের প্রতি অনুরাগ ও অনুভূতিও আরও স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ করা সম্ভব হবে। এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন সামাজিক ব্যবস্থার নানা দিক তুলে ধরতে নতুন অঙ্গভঙ্গি ও অভিব্যক্তিরও জন্ম হতে পারে।
দেহভাষার বিবর্তন তাই চলতেই থাকবে। এর মধ্য দিয়ে সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির গভীর পরিবর্তনও প্রতিফলিত হবে। মানবজাতির আদিম যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা বদলেছে। ডিজিটাল যুগেও দেহভাষা মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে টিকে রয়েছে।
দেহভাষার এই পরিবর্তনশীল রূপ সম্পর্কে সচেতন থাকলে আমরা নিজেদের সম্পর্কগুলো আরও সচেতনতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারব। ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা বিশ্বে এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আরও অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শুরুতে যে 'ভ্রু-পল্লবে ডাক'-এর কথা বলেছিলাম, শেষ পর্যন্ত তার অর্থও যেন এখানেই এসে মেলে। শব্দ ছাড়াই একটি ভ্রুর সামান্য নড়াচড়া, চোখের এক ঝলক কিংবা মুখের ছোট্ট অভিব্যক্তি অনেক কথা বলে দিতে পারে। মানুষ হয়তো ভবিষ্যতেও এভাবেই নীরবে একে অন্যকে ডাকবে। আর বুঝতে শিখবে, সব কথা শব্দে বলতে হয় না।
