মৎস্যকন্যার আদি কাহিনি: মানুষ, দেবী আর জন্তুর শরীর মিশে জন্ম যে রূপকথার
অনেক অনেক দিন আগের কথা। সাগরের নোনাপানির নিচে বাস করত আমাদের রূপকথার জলপরী আর জলকন্যারা। তাদের মন ছিল মানুষের মতোই নরম। শরীরটাও ছিল পুরোপুরি মানুষের মতো।
উনিশ শতকের শেষ দিকে এসে বদলে গেল সেই চেনা ছবি। সুদূর ডেনমার্ক থেকে হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের করুণ রূপকথা বাংলায় এল। সেখানে এক সুন্দরীর কোমরের ওপরের অংশ রাজকন্যার মতো। অপরূপ সুন্দরী। কোমর থেকে নিচে চকচকে রুপালি মাছের লেজ। সে ডাঙার এক মানুষকে ভালোবাসে, কিন্তু মানুষের মতো হাঁটার জন্য তার পা নেই।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারসহ বাংলা সাহিত্যের অনুবাদক ও শিশুসাহিত্যিকেরা বিদেশি এসব গল্প বাঙালি পাঠকের ঘরে পৌঁছে দেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সময়েও তা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সমস্যা ছিল নাম নিয়ে। আমাদের জলপরী বা জলকন্যারা তো দেখতে মানুষের মতো। মাছের লেজওয়ালা এই মেয়েটিকে কী বলা হবে? সেখান থেকেই এল 'মৎস্যকন্যা' নামটি।
পরে ডিজনির চলচ্চিত্র অ্যান্ডারসনের করুণ গল্পকে অনেকটাই বদলে সুখের সমাপ্তি দেয়। মৎস্যকন্যাও বিশ্বজুড়ে আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু পশ্চিমা দুনিয়ায় এই মৎস্যকন্যার ধারণা এল কোথা থেকে? উত্তর খুঁজতে হলে যেতে হবে মানুষের সাংস্কৃতিক বিকাশ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের একেবারে গোড়ার দিকে।
মানুষ ও প্রাণীর দেহের বিভিন্ন অংশ মিলিয়ে তৈরি হয় কল্পিত প্রাণীর ইতিহাস প্রাচীন প্রস্তর যুগ, ২.৬ মিলিয়ন থেকে ১২ হাজার বছর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। জার্মানির হোহলেনস্টাইন-স্টাডেল গুহায় পাওয়া 'সিংহ-মানব' এবং দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের ত্রোয়া-ফ্রের গুহার 'জাদুকর' তার পুরোনো নিদর্শন। প্রথমটির সময়কাল প্রায় ৩৩-৩৮ হাজার বছর আগে, দ্বিতীয়টি প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের।
এসব কল্পিত প্রাণীতে মানুষের বুদ্ধি ও প্রাণীর শক্তিকে একসাথে দেখানো হয়েছিল। চারপাশের ভয়ংকর ও দুর্বোধ্য পরিবেশকে বোঝার চেষ্টায় তৎপর ছিল আদি মানুষ। সেখান থেকেই এমন কল্পনা জন্মেছিল বলে ধারণা করা হয়। এগুলো কখনো রক্ষাকবচ, কখনো আবার ধ্বংসাত্মক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
কৌতূহলের বিষয় হলো, খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২,২০০ সালের আগের টিকে থাকা সংকর প্রাণীর ছবিতে মানুষের শরীরের সাথে মাছের দেহের অংশ দেখা যায় না। মাছের চেয়ে সিংহ, হরিণ বা ইগলকে বেশি শক্তিশালী মনে করা হতো। হয়তো এ কারণেই তখনকার মানুষ মাছকে নিয়ে এমন সংকর প্রাণী কল্পনা করেনি।
মাছের লেজওয়ালা প্রাণীর সবচেয়ে পুরোনো সংরক্ষিত ছবিগুলোর সন্ধান পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়ার পুরাণ ও শিল্পে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৫৫০ সালের মধ্যকার ব্রোঞ্জ যুগের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে এর চিহ্ন রয়েছে। প্রথম দিকের কিছু ছবি উর তৃতীয় রাজবংশ বা নব্য-সুমেরীয় সাম্রাজ্যের সময়কার বলে মনে করা হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকের একটি সিলমোহরের ছাপে মাছের লেজওয়ালা নারী ও পুরুষের ছবি আছে। পাশে মাছের পোশাক পরা এক ব্যক্তি, হাতে বালতি। মাঝখানে একটি খেজুরগাছ, সম্ভবত পবিত্রতার প্রতীক।
মেসোপটেমিয়ার এসব সিলমোহর ছিল ছোট নলাকার বস্তু। গায়ে লেখা ও নানা দৃশ্য খোদাই করা থাকত। মাটির ফলকের লেখাকে সত্যায়িত করতে এ বস্তু কাজে লাগত। ভেজা মাটির ওপর এগুলো গড়িয়ে ছাপ দেওয়া হতো। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৩৫০০ সালে দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় এ বস্তুর ব্যবহার শুরু হয়। প্রশাসনিক কাজে স্বাক্ষরের মতো ব্যবহারের পাশাপাশি এগুলো গয়না ও তাবিজ হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। অর্থাৎ ছোট এই বস্তুগুলোতে শুধু পরিচয় বা হিসাবের চিহ্নই থাকত না; ধর্মীয় বিশ্বাস ও কল্পনার ছবিও জায়গা করে নিয়েছিল।
সেই সিলমোহরের মাছের পোশাক পরা ব্যক্তিকে অ্যাপক্যালু, অর্থাৎ 'জ্ঞানী', বলে মনে করা হয়। সাধারণভাবে তাকে পুরোহিত ও অর্ধদেবতা আদাপার সাথে সম্পর্কযুক্ত করা হয়। আদাপা ছিলেন মেসোপটেমিয়ার সাত জ্ঞানীর অন্যতম। সুমেরীয় পুরাণ অনুযায়ী, তিনিই মানুষের কাছে সভ্যতার শিল্পকলাসহ নানা কলাকৌশল নিয়ে এসেছিলেন।
অ্যাপক্যালুর ছোট মূর্তি রক্ষাকবচ হিসেবেও ব্যবহারের চল ছিল। তবে আদাপা নিজে অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক মাছ ছিলেন না; তিনি মাছের পোশাক পরতেন। এক সিলমোহরে মাছের লেজওয়ালা দাড়িওয়ালা পুরুষটির নাম কুলুল্লু—'মৎস্য-মানুষ'। নারীটির নাম কুল্লিতু—'মৎস্য-নারী'। ব্যাবিলনীয় ও এসিরীয় শিল্পে কুল্লর ছবি পরিচিত হলেও কুল্লিতুর ছবি অত্যন্ত বিরল। তাই এই নারীকে এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত মৎস্যকন্যাসদৃশ প্রাণীর সবচেয়ে পুরোনো ছবিগুলোর অন্যতম মনে করা হয়। আরামীয় শিল্পেও মৎস্যমানবের ছবির দেখা মেলে।
সিলমোহরের ওই দৃশ্যের আরেকটি ব্যাখ্যাও রয়েছে। অ্যাপক্যালু হয়তো মৎস্যমানব ও মৎস্যনারীকে শিক্ষা বা পরামর্শ দিচ্ছেন। দৃশ্যটি আদম-ইভ ও জ্ঞানবৃক্ষের কাহিনির কথাও মনে করিয়ে দেয়।
এই মৎস্যমানবের ধারণা শুধু শিল্পেই ছিল না, মেসোপটেমিয়ার পুরাণেও তার উপস্থিতি ছিল। ব্যাবিলনীয় সৃষ্টিতত্ত্বের মহাকাব্য 'এনুমা এলিশ'-এ কুলুল্লুকে আদিম সমুদ্রদেবী তিয়ামাতের বাহিনীর পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করতে দেখা যায়। তিয়ামাত ছিলেন আদিম সমুদ্র ও বিশৃঙ্খলার প্রতীক। পুরাণে তাকে ড্রাগনের মতো শক্তিশালী এক দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কুল্লু ও অ্যাপক্যালুর কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন শহর এরিদুর নামও। সুমেরীয় মন্দিরের স্তোত্রে বলা হয়েছে, সাত জ্ঞানী এসেছিলেন এরিদু থেকে। বর্তমান ইরাকের তেল আবু শাহরাইনই সেই এরিদু, মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন শহরগুলোর একটি। এই শহরের প্রধান দেবতা ছিলেন এয়া। তিনি অ্যাপক্যালুদের সৃষ্টি করেছিলেন। আদাপা ছিলেন তাদেরই একজন।
এয়া বাস করতেন অ্যাপসুতে, ভূগর্ভস্থ মিঠা পানির আধারে। সেই পানি উর্বরতা দানকারী শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো। ফলে সাত জ্ঞানীর সাথে পানি ও মাছের সম্পর্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।
গ্রিক নামে ওআন্নেস হিসেবে পরিচিত আদাপার কথাও লিখেছেন বেরোসাস। তার 'ব্যাবিলোনিয়াকা' গ্রন্থটি খ্রিষ্টপূর্ব ২৮১ সালে প্রকাশিত তিন খণ্ডের ব্যাবিলনের ইতিহাস। বেরোসাসের বর্ণনায়, আদাপা ইরিথ্রিয়ান সাগর থেকে উঠে এসে এরিদুতে মানুষকে সভ্যতার নানা শিক্ষা দেন। রাতে তিনি পানিতে থাকতেন, দিনে উঠে এসে লেখা শেখানো থেকে শুরু করে শিল্প, বিজ্ঞান, শহর ও মন্দির নির্মাণ, আইন, জমির পরিমাপ, বীজ ও ফসলের জ্ঞান শেখাতেন। তার আগে মানুষ অজ্ঞ ও বর্বর ছিল বলে বর্ণনায় করা হয়েছে।
মেসোপটেমিয়ার এই মৎস্যমানবের ধারার পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের দেখা মেলে আরামীয় ধর্মবিশ্বাসে। তিনি ছিলেন আতরগাতিস। আরামীয়দের প্রধান দেবী হিসেবে তাকে কিছু ছবিতে মাছের লেজসহ দেখানো হয়েছে।
আরামীয়রা ছিল উত্তর-সেমিটিক ভাষাভাষী আধা-যাযাবর বিভিন্ন গোত্রের মানুষ। বর্তমান সিরিয়ায় ছিল তাদের প্রধান বসতি। খিষ্টপূর্ব দশম শতকে তাদের বড় দল দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় চলে যায় এবং স্থানীয়দের সাথে মিশে যায়। পরে তারা ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত শক্তিতে পরিণত হয়।
বর্তমান সিরিয়ার মানবিজ শহরের প্রাচীন হিয়েরাপোলিস বামবিস ছিল আতরগাতিসের প্রধান উপাসনাকেন্দ্র। সেখানে অন্তত খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ সাল থেকে আতরগাতিস ও হাদাদের পূজা হতো। বর্তমান তুরস্কের শানলিউরফা, বর্তমান সিরিয়ার আল-শায়খ সাদ এবং লেবাননের নিহায়ও তার মন্দির ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মধ্যে সিরীয় ব্যবসায়ী, ভাড়াটে সৈন্য ও দাসদের মাধ্যমে তার উপাসনা এশিয়া মাইনর, গ্রিস, মিসর, রোম ও সিসিলিতে ছড়িয়ে পড়ে। রোমে তিনি 'দেয়া সিরিয়া' এবং গ্রিসে দেরকেতো নামে পরিচিত ছিলেন।
আতরগাতিসকে ব্রোঞ্জ যুগের আতীরাত, আনাত ও আত্তার্তের মিলিত রূপ এবং মেসোপটেমিয়ার দেবী ইশতারের সাথে সম্পর্কিত দেবী বলে মনে করা হয়। তিনি ছিলেন সৃষ্টি ও উর্বরতার দেবী। মাছ, কবুতর ও সাপ ছিল তার পবিত্র প্রাণী।
তার জন্ম নিয়েও নানা কাহিনি আছে। হাইজিনাসের কাহিনিতে আকাশ থেকে ইউফ্রেটিসে পড়া একটি ডিম থেকে আতরগাতিসের জন্ম। মাছেরা ডিমটি তীরে নিয়ে আসে, একটি কবুতর তার ওপর বসে এবং পরে আতরগাতিস বেরিয়ে আসেন। ডিওডোরাস সিকুলাসের বর্ণনায়, এক তরুণের সাথে সম্পর্কের পর অবৈধ সন্তান জন্ম দেয়ার লজ্জায় আতরগাতিস আশকালনের কাছে একটি হ্রদে নিজেকে ছুড়ে দেন। তখন তার শরীর মাছের মতো হয়ে যায়, মাথা থাকে মানুষের মতো।
কিন্তু আতরগাতিসকে মৎস্যকন্যার আদি রূপ হিসেবে দেখার বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। মাছের লেজওয়ালা আতরগাতিসের ছবি টিকে আছে কেবল খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতকের কিছু মুদ্রায়। এসব মুদ্রার পাঠ ও ব্যাখ্যা সঠিক হলে ছবিটাকে আতরগাতিসের বলেই মেনে নেয়া যায়। অন্যদিকে আতরগাতিসকে সাধারণত পুরোপুরি মানবী হিসেবেই দেখানো হয়েছে। তাই তাকে সরাসরি মৎস্যকন্যার আদি রূপ বলা কঠিন। তবে সমুদ্র, মাছ ও নারীত্বের সাথে আতরগাতিসের সম্পর্ক পরবর্তী কাহিনিকে প্রভাবিত করেছে।
মৎস্যকন্যার চিত্ররূপের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উৎস গ্রিক পুরাণ। গ্রিকরা এসিরীয়-ব্যাবিলনীয় ও ভূমধ্যসাগরীয় বহু কাহিনি নিজেদের পুরাণে গ্রহণ করেছিল। পুরোনো ও বিদেশি দেবতাদের নিজেদের দেবতার সাথে মিলিয়ে নেয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় 'ইন্টারপ্রেতাতিও গ্রেকা'। একই কাহিনির একাধিক সংস্করণ থাকায় গ্রিক পুরাণের ধারাটি সরল নয়। হেসিওডের 'থিওগনি', হোমারের 'ইলিয়াড' ও 'ওডিসি', হেরোডোটাস, ডিওডোরাস সিকুলাস এবং অ্যাপোলোনিয়াস রোডিয়াসসহ বহু লেখকের রচনায় এসব কাহিনি টিকে আছে। রোমান লেখকেরাও পরে গ্রিক পুরাণের বহু গল্প সংরক্ষণ করেন।
এই পুরাণের চরিত্রগুলোর মধ্যে কয়েকজনের চেহারা পরে মৎস্যকন্যার কল্পচিত্রের সাথে মিশে যায়। সমুদ্রদেবতা ওশিয়ানোস ও টেথিসের সন্তান ৩ হাজার ওশিয়ানিডের মধ্যে ইউরিনোমেকে কখনো মাছের লেজসহ দেখানো হয়েছে। পসানিয়াসের বর্ণনায়, আর্কাদিয়ার ফিগালিয়া শহরে ইউরিনোমের একটি কাঠের মূর্তি ছিল। ওপরের অংশ নারীর, নিচের অংশ মাছের। মূর্তিটি সোনার শিকলে বাঁধা ছিল। সেটি এখন আর নেই।
ইউরিনোমেকে তাই মৎস্যকন্যার শারীরিক পূর্বসূরি বলা যায়। কিন্তু তার চরিত্র পরবর্তী খ্রিষ্টীয় মৎস্যকন্যার মতো অন্ধকার বা ভয়ংকর ছিল না। ফলে মৎস্যকন্যার চূড়ান্ত চেহারা তৈরিতে তার প্রভাব সীমিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
ইউরিনোমের বোন ডরিস সমুদ্রদেবতা নেরেউসকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের ৫০ কন্যা ছিল, যাদের বলা হতো নেরেইড। তারা এজিয়ান সাগরে বাবার সাথে থাকত, নাবিকদের রক্ষা করত এবং গান গাইত। তাদের মধ্যে থেটিস ছিলেন অ্যাকিলিসের মা। আধুনিক গ্রিক লোককথায় নেরেইড শব্দটি সমুদ্রপরী বা মৎস্যকন্যার সমার্থক। কিন্তু প্রাচীন শিল্পে তারা মানবী। উনিশ শতকের রোমান্টিক ও প্রতীকবাদী শিল্পীরাই পরে তাদের মাছের লেজ দিতে শুরু করেন।
মিঠা পানির জলপরী নাইয়াডদেরও পরবর্তী মৎস্যকন্যার সাথে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। নদী, ঝরনা, প্রস্রবণ, হ্রদ ও জলাভূমির বিভিন্ন জলপরীর আলাদা নাম ছিল। প্রাচীন শিল্পে তাদেরও মানুষের মতোই দেখানো হয়েছে। প্রায় ১৮০০ সালের পর রোমান্টিক যুগে নাইয়াড শব্দটি মৎস্যকন্যার সমার্থক হয়ে ওঠে এবং কখনো মাছের লেজসহ তাদের আঁকা হয়।
মিউজদেরও পানির সাথে সম্পর্ক ছিল। তারা ছিলেন জিউস ও ম্নেমোসাইনের কন্যা, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শিল্পের অনুপ্রেরণার দেবী। হেলিকনের পবিত্র ঝরনার সাথে তাদের সম্পর্কের কারণে উনিশ শতকের মাঝামাঝি কিছু শিল্পকর্মে তাদের মাছের লেজসহ দেখানো হয়।
তবে মৎস্যকন্যার কাহিনিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে সাইরেন। ফোরসিস ও কেটোর বংশধারায় থাকা এই প্রাণীরা প্রথমে পাখিরূপী ছিল। একিডনা, স্কিলা ও সাইরেনদেরও এই সমুদ্রদানবের বংশের সাথে যুক্ত করা হয়।
একিডনার ওপরের অংশ ছিল সুন্দর নারীর মতো, নিচে সাপের লেজ। সে ছিল টাইফনের সঙ্গী। তাদের সন্তানদের মধ্যে ছিল সারবেরাস, লার্নিয়ান হাইড্রা, কাইমেরা, স্ফিংক্স ও নেমিয়ান সিংহ। প্রাচীন একিডনার কোনো ছবি টিকে নেই। তবে নারী ও সাপের এই মিশ্র রূপ পরবর্তী মৎস্যকন্যার কল্পচিত্রে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে।
সাইরেনের কাহিনি হোমারের 'ওডিসি'র মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ট্রয় থেকে ইথাকায় ফেরার পথে ওডিসিউসকে সাইরেনদের দ্বীপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। তাদের মোহময় গান শুনে নাবিকেরা আকৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেত। ওডিসিউস গান শুনতে চেয়েছিলেন বলে নিজেকে জাহাজের মাস্তুলের সাথে বাঁধেন এবং সঙ্গীদের কানে মোম ভরে দেন। ফলে তিনি গান শুনেও বেঁচে যান, আর তার সঙ্গীরাও সাইরেনদের ডাকে সাড়া দিতে পারেনি।
হোমার সাইরেনদের চেহারা বর্ণনা করেননি। পরে খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে অ্যাপোলোনিয়াস রোডিয়াস তাদের পাখির ডানা ও পা-ওয়ালা নারী হিসেবে বর্ণনা করেন। ওভিডের রচনাতেও তাদের ডানার কাহিনি আছে। প্রাচীন শিল্পে তারা নারীর মাথাওয়ালা পাখি। হেলেনীয় ও রোমান যুগে তারা মধুর গানে মানুষকে বিপথে নেয়া নারীর প্রতীক হয়ে ওঠে।
সাইরেনের সেই মোহময় গানই পরে মৎস্যকন্যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়। মধ্যযুগের শুরুতে, বিশেষ করে অষ্টম শতক থেকে, পাখির দেহের সাইরেন ধীরে ধীরে মাছের লেজওয়ালা মৎস্যকন্যার সাথে একাকার হতে থাকে। কে প্রথম এই পরিবর্তন ঘটিয়েছিল তা জানা যায় না। তবে অষ্টম শতকের একটি মাছের লেজওয়ালা সাইরেনের ছবি এর পুরোনো নিদর্শনগুলোর একটি।
'ফিজিওলোগাস' ও পরে 'লিবার মনস্ট্রোরুম'-এর মতো খ্রিষ্টীয় গ্রন্থেও সাইরেনের রূপ বদলানোর চিহ্ন পাওয়া যায়। 'ফিজিওলোগাস' ছিল প্রাণী ও কাল্পনিক প্রাণীদের নিয়ে লেখা একটি প্রাচীন খ্রিষ্টীয় গ্রন্থ, যেখানে এসব প্রাণীর কাহিনি থেকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আর 'লিবার মনস্ট্রোরুম' ছিল মধ্যযুগের শুরুর দিকের নানা অদ্ভুত ও কাল্পনিক প্রাণী নিয়ে লেখা একটি লাতিন গ্রন্থ। এতে সাইরেনকে নারীদেহের ওপরের অংশ এবং আঁশে ঢাকা মাছের লেজওয়ালা প্রাণী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। আল্পসের উত্তরে সাইরেনকে মাছের লেজওয়ালা মৎস্যকন্যার সমার্থক করার এটিই সবচেয়ে পুরোনো টিকে থাকা লিখিত উদাহরণগুলোর একটি।
সাইরেন শব্দটি পরে পুরাণের বাইরেও নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সতর্কসংকেতের যন্ত্র থেকে শুরু করে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি বর্গ, এমনকি বিরল জন্মগত শারীরিক ত্রুটির নামেও 'সাইরেন' শব্দটি এসেছে। এই শেষটির নাম সাইরেনোমেলিয়া, যাকে অনেক সময় 'মৎস্যকন্যা সিনড্রোম' বলা হয়। এতে শিশুর দুই পা জোড়া লেগে মাছের লেজের মতো দেখায়। রোগটি অত্যন্ত বিরল এবং আক্রান্ত শিশুদের অনেকেই জন্মের পর অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যায়। ১৮৯১ সালে প্রকাশিত 'হিউম্যান মনস্ট্রোসিটিজ' গ্রন্থে এর সংক্ষিপ্ত উল্লেখ ছিল। এই শারীরিক ত্রুটির চিত্রও হয়তো মৎস্যকন্যার পুরোনো কল্পনাকে আরো শক্তিশালী করেছে।
আরেক ভয়ংকর পূর্বসূরি ছিল স্কিলা। হোমারের কাহিনিতে ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা মেসিনা প্রণালি পার হওয়ার সময় স্কিলা ও ক্যারিবডিসের মুখোমুখি হয়। ক্যারিবডিস ছিল ভয়ংকর জলঘূর্ণির মতো এক বিপদ, আর স্কিলা ছিল অন্য পাশে থাকা সমুদ্রদানব। সার্সি ওডিসিউসকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন—ক্যারিবডিসের দিকে গেলে পুরো জাহাজ হারাতে পারেন, আর স্কিলার দিক দিয়ে গেলে ছয়জন নাবিককে হারাতে হবে। ওডিসিউস তাই স্কিলার দিক দিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত স্কিলা তার ছয়জন নাবিককে তুলে নিয়ে হত্যা করে।
অ্যাপোলোনিয়াস রোডিয়াসের বর্ণনায় জেসনও এই দুই দানবের মাঝ দিয়ে আর্গো জাহাজ চালান। হেরা থেটিস ও নেরেইডদের সাহায্য করতে বলেছিলেন, তাই জেসন ও তার সঙ্গীরা বেঁচে যায়।
হোমারের মতে, স্কিলার ছয়টি মাথা ও ১২টি পা ছিল, আর তার ডাক ছিল ছোট কুকুরের ঘেউঘেউয়ের মতো। কিন্তু গ্রিক, রোমান ও এট্রুসকান শিল্পে তাকে অন্য রূপে দেখা যায়। প্রাচীন গ্রিক শিল্পে ছিল তরুণীর শরীর, লম্বা লেজ এবং কোমর থেকে বেরিয়ে থাকা দুই বা তিনটি কুকুরের সামনের অংশ। হেলেনীয় যুগে তাকে সামনে বা তিন-চতুর্থাংশ দিক থেকে দেখানো হতো। তখন দুটি লেজ, দুই পাশে কুকুর এবং হাতে পাথর দেখা যায়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০-২৮০ সালের হেরাক্লিয়ার মুদ্রা, লুভরের পোড়ামাটির পাত্র এবং বুলগেরিয়ায় পাওয়া হেলেনীয় হেলমেটেও স্কিলার এমন ছবি আছে। ইতালির স্পারলঙ্গার জাতীয় প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরে থাকা বিশাল ভাস্কর্যে ওডিসিউসের জাহাজে স্কিলার আক্রমণ দেখানো হয়েছে। ১৯৫৭ সালে রাস্তা তৈরির সময় হাজার হাজার টুকরোর মধ্যে এটি পাওয়া যায়। রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াসের গুহা সাজাতে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
মাছের লেজওয়ালা স্কিলার এই ছবিগুলো মধ্যযুগীয় মৎস্যকন্যার চেহারার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হোমারের বর্ণনার সাথে শিল্পের স্কিলার বড় পার্থক্য থাকায় বিষয়টি অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। অথচ শিল্পে দেখা সেই লম্বা লেজওয়ালা নারী ও কুকুরের রূপটি পরবর্তী মৎস্যকন্যার সাথে বেশ মিল।
মৎস্যকন্যার সৌন্দর্য, প্রেম ও প্রলোভনের সাথে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতিরও কিছু সম্পর্ক ছিল। এক পুরোনো কাহিনিতে ইউরেনাসের দেহের একটি অংশ সমুদ্রে পড়ার পর তৈরি ফেনা থেকে আফ্রোদিতির জন্ম। অন্য কাহিনিতে পন্টুস ও থালাসার সন্তান হিসেবে তার জন্মের কথা আছে। আতরগাতিসের সাথেও তার পুরাণের কিছু যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়।
আফ্রোদিতির দেহ পুরোপুরি মানবী হলেও সমুদ্রের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। পরে রোমানরা তাকে ভেনাস নামে গ্রহণ করে। আয়না ও মুক্তা—ভেনাসের সাথে যুক্ত এই দুই প্রতীক মধ্যযুগীয় মৎস্যকন্যার চিত্রেও দেখা যায়। আয়না ছিল অহংকারের প্রতীক; মুক্তা বোঝাত পবিত্রতা, জ্ঞান ও সম্পদ। মৎস্যকন্যার লম্বা, ঘন চুলও নারীর প্রাণশক্তি ও উর্বরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো।
তবে ভেনাস ও আফ্রোদিতির প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত। মৎস্যকন্যার চেহারা ও চরিত্র তৈরিতে মেসোপটেমিয়ার মাছ-নারী, পাখিরূপী সাইরেন, সমুদ্রদানব স্কিলা এবং সম্ভবত একিডনার প্রভাব ছিল বেশি।
শত শত বছরের সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ও পুরাণের রূপান্তরের মধ্য দিয়েই শেষ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে আজকের পরিচিত মৎস্যকন্যা—অর্ধেক নারী, অর্ধেক মাছ। তার মধ্যে মিশে আছে সৌন্দর্য, প্রেম, প্রলোভন ও বিপদের বহু পুরোনো গল্প। তাই মৎস্যকন্যার কাহিনি আসলে কোনো এক দেশ, এক ধর্ম বা এক যুগের গল্প নয়। মানুষের কল্পনায় মানুষ, দেবী, পাখি, সাপ, সমুদ্রদানব আর মাছের শরীর বারবার একে অন্যের সাথে মিশেছে। সেই দীর্ঘ যাত্রার শেষেই আমরা পেয়েছি রূপকথার সেই পরিচিত মৎস্যকন্যাকে।
কিন্তু সেই পরিচিত মৎস্যকন্যার আড়ালে যে পুরোনো গল্পটি হারিয়ে গেছে, সেটিও তো ফিরে আসতে পারে। ডিজনির মতো কেউ একদিন অ্যান্ডারসনের সেই আসল কাহিনিকে বদলে না দিয়ে পর্দায় তুলে ধরবেন—এমন আশা অনেকেরই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন ছবি ও চলচ্চিত্র তৈরির কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছে। তাই হয়তো সেই দিন খুব দূরে নয়। অ্যান্ডারসনের সেই করুণ মৎস্যকন্যা, যে ভালোবেসেও মানুষ হতে পারেনি, একদিন তার নিজের রূপেই পর্দায় ফিরে আসবে—সেই অপেক্ষায় অনেকের ভিড়ে আমিও আছি, আজও।
