নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে, ১২ সদস্যের সাপোর্ট টিম গঠন
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-এর সঙ্গে আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই নেগোসিয়েশন কমিটিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিম গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)।
গত রোববার (২১ জুন) সিপিএ সচিবের সই করা এক অফিস আদেশে জানানো হয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ শাখার গত ১৮ জুনের এক নির্দেশনার পর এই সাপোর্ট টিম গঠন করা হয়েছে।
পিপিপির অধীনে বেসরকারি টার্মিনাল অপারেটর দ্বারা ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডসহ (ওসিওয়াই) সিপিএ-র নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ শীর্ষক প্রকল্পটির নেগোসিয়েশন কমিটিকে কারিগরি, পরিচালন ও প্রশাসনিক সহায়তা দেবে নবগঠিত এই টিম।
সাপোর্ট টিমটিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা, প্রশাসন, হাইড্রোগ্রাফি, মেরিন, প্রকৌশল, ট্রাফিক, অর্থ, নিরাপত্তা এবং যান্ত্রিক বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোর কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. মাহবুব মোর্শেদ চৌধুরী, আইন কর্মকর্তা শাহনেওয়াজ মনির, চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মো. ওবায়দুর রহমান, অ্যাসিস্ট্যান্ট হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মুস্তাহিদুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (নিরাপত্তা ও প্রশাসন) মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী এবং উপ-প্রধান প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) ও প্ল্যান্ট ম্যানেজার মোস্তফা ইকবাল।
অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল ওয়ার্কস) লেফট্যানেন্ট কমান্ডার সৈয়দ সাজ্জাদুর রহমান, সহকারী টার্মিনাল ম্যানেজার (শিপ অ্যান্ড ইয়ার্ড, সিসিটি-এনসিটি) মিজানুর রহমান সরকার, সিনিয়র ফাইন্যান্স অফিসার জাহিদুল ইমাম, সহকারী ট্রাফিক ম্যানেজার রাজীব চৌধুরী, সহকারী ব্যবস্থাপক (এস্টেট-২) মো. সাইফুল আলম এবং মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন। অফিস আদেশে বলা হয়েছে, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমেই এই সাপোর্ট টিম গঠন করা হয়েছে।
গতি পাচ্ছে আলোচনা
দেশের বৃহত্তম ও ব্যস্ততম কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটির ভবিষ্যৎ পরিচালনার বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
চলতি মাসের শুরুর দিকে একই দিনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা দুটি ভিন্ন চিঠিতে প্রস্তাবিত ছাড়পত্র চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে পরস্পরবিরোধী সংকেত মেলায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। একটি চিঠিতে মন্ত্রণালয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে অথবা তা বাতিল করার নির্দেশ দেয়। তবে একই দিনে ইস্যু করা দ্বিতীয় চিঠিতে সিপিএ-কে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক এই অপারেটরের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই বৈপরীত্যপূর্ণ নির্দেশনা বন্দর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দেয় এবং প্রস্তাবিত লিজের বিষয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে পরবর্তীতে নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া স্পষ্ট করেন যে, নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বার্তার পর, আলোচনা সম্পন্ন করতে একটি সাত সদস্যের মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদন চেয়ে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেয় সিপিএ। বন্দর কর্মকর্তারা বলছেন, এই সাপোর্ট টিম গঠনের মাধ্যমে এটিই স্পষ্ট হচ্ছে যে—কয়েক মাসের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আলোচনা এখন একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে।
এনসিটির কৌশলগত গুরুত্ব
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড় এবং এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কনটেইনার বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিবাহিত মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশই এই টার্মিনালে হ্যান্ডলিং হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল) এই টার্মিনালটি পরিচালনা করে আসছে। সিডিডিএল-এর ব্যবস্থাপনায় এনসিটি বারবার কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েছে। চলতি বছরের মে মাসে টার্মিনালটি প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টিইউএস (২০ ফুট দৈর্ঘ্যের সমমানের) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে, যা এর ইতিহাসের সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড।
পিপিপি এবং জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) কাঠামোর আওতায় এনসিটির কার্যক্রম ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাবটি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে এই প্রক্রিয়াটি বেশ দূর এগোলেও নেগোসিয়েশন কমিটির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরোধিতার কারণে অগ্রগতি থমকে যায়। পরবর্তীতে গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই প্রক্রিয়াটি স্থগিত করেছিল।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রস্তাবটি আবার সামনে আসে। বিশেষ করে গত এপ্রিলে বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের চতুর্থ বৈঠকে ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটির পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনালও (সিসিটি) একটি সমন্বিত টার্মিনাল কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করে।
এনসিটির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিনির্ধারক, বন্দর ব্যবহারকারী এবং শিল্প খাতের অংশীজনদের মধ্যে এখনো বিতর্ক চলছে। সমর্থকদের যুক্তি, ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগ বন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে এবং আঞ্চলিক সরবরাহ চেইনে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।
অন্যদিকে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় যে লাভজনক টার্মিনালটি ইতোমধ্যেই রেকর্ড পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে, তা বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু।
আপাতত, এই সাপোর্ট টিম গঠনের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় যে—সরকার এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ এমন একটি আলোচনার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
