আড়াই মাস পর আজ আসছে ১ লাখ টন ক্রুড, ৮ মে ফের চালু হবে ইস্টার্ন রিফাইনারি
১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী (ক্রুড অয়েল) একটি জাহাজ আজ বুধবার (৬ মে) চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে পৌঁছানোর কথা থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) আগামী ৮ মে থেকে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত দেশের একমাত্র এই তেল শোধনাগারটি অপরিশোধিত তেলের অভাবে তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ ছিল।
ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ-মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও শিপিং) মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, আগামী ৮ মে সকাল থেকে পুনরায় কার্যক্রম শুরু করার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন সর্বোচ্চ তিনটি লাইটার জাহাজ অপরিশোধিত তেল খালাস করতে পারে, যার প্রতিটিতে প্রায় ৪ হাজার টন তেল ধরে। অন্তত ৮ হাজার টন তেল হাতে পাওয়ার পরপরই পরিশোধন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
'এমটি নিনেমিয়া' নামের একটি জাহাজে করে এই অপরিশোধিত তেল আনা হচ্ছে। জাহাজটি ২১ এপ্রিল লোহিত সাগর উপকূলে অবস্থিত সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি কেন্দ্র ইয়ানবু বন্দর থেকে রওনা দেয়। জাহাজটি আজ সকাল ১১টার দিকে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মহাব্যবস্থাপক (চার্টারিং অ্যান্ড ট্রাম্পিং) ক্যাপ্টেন মো. মুজিবুর রহমান বলেন, পৌঁছানোর সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে; তবে পৌঁছানোর পরপরই লাইটার জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাস শুরু হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ না থাকায় ১৪ এপ্রিল থেকে শোধনাগারটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল।
এর আগে সর্বশেষ তেলের চালান এসেছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি। এরপর ইরান যুদ্ধের কারণে আমদানি ব্যাহত হয় এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়ায় তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়।
গত ৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা থেকে নির্ধারিত এক লাখ টনের কার্গো আসার কথা থাকলেও সেটি বাতিল হয় এবং আবুধাবি থেকে দুটি নির্ধারিত চালান বাতিল হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়।
রিফাইনারির কর্মকর্তারা জানান, মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) পাইপলাইনের প্রায় ৫ হাজার টন এবং পাঁচটি স্টোরেজ ট্যাংকের তলানির অবশিষ্ট তেল দিয়ে তারা সীমিত পরিসরে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
সাধারণত ট্যাংকের নিচে ১.৫ মিটার তেল 'ডেড স্টক' হিসেবে থাকে, যার মধ্যে ১ মিটারের নিচের অংশ আর ব্যবহারযোগ্য থাকে না। মজুত এই সীমার নিচে নেমে যাওয়ায় ১৪ এপ্রিল উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
চলতি মাসেই আসছে আরও এক লাখ টন
কয়েক মাসের সরবরাহ ঘাটতির পর চলতি মাসেই আরও ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেলের দ্বিতীয় একটি চালান আসার কথা রয়েছে। এই তেল আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি থেকে আমদানি করা হবে এবং এটি 'মারবান ক্রুড'।
আগামী ১০-১১ মে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরে তেল বোঝাই করে জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন ইতোমধ্যে এই কাজের জন্য একটি ট্যাংকার পাঠিয়েছে।
ক্যাপ্টেন মুজিবুর রহমান বলেন, জাহাজটি আগামী ২২-২৩ মে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিপিসির তথ্যমতে, বাংলাদেশ বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে, যার বড় অংশই ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল।
প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয় এবং ইস্টার্ন রিফাইনারিতে তা প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এখানে এলপিজি, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলসহ ১৬ ধরনের পণ্য উৎপাদন করা হয়।
অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি বাংলাদেশ প্রতি বছর ভারত ও চীন থেকে প্রায় ৪৫ লাখ টন পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে। এই রিফাইনারিতে সাধারণত প্রতিদিন ৪,৫০০ টন তেল পরিশোধন করা হয়। তবে সংকটের কারণে গত মাসে তা কমিয়ে ৩,৫০০ টনে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
৪ মার্চ নাগাদ শোধনাগারে ব্যবহারযোগ্য তেলের মজুত ২,০০০ টনের নিচে নেমে এসেছিল। এখানে মূলত সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড প্রক্রিয়াজাত করা হয়; অন্যান্য গ্রেড প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা সীমিত।
সংকটের সময় মার্চে মালয়েশিয়াভিত্তিক আবির ট্রেড অ্যান্ড গ্লোবাল মার্কেটস মালয়েশিয়া থেকে ১ লাখ টন তেল কেনার একটি প্রস্তাব সরকার অনুমোদন করলেও সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তা চূড়ান্ত হয়নি।
