১২.৫ বিলিয়ন ডলারে ইথিওপিয়ায় গড়ে উঠছে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর
আফ্রিকার এক শহর থেকে আরেক শহরে আকাশপথে যাওয়ার সময় অনেক যাত্রীকে বাধ্য হয়েই মহাদেশের বাইরের কোনো শহর, যেমন লন্ডন, প্যারিস বা দুবাই হয়ে ঘুরে যেতে হয়। তবে ইথিওপিয়ায় নির্মাণাধীন ১২.৫ বিলিয়ন (১ হাজার ২৫০ কোটি) ডলারের একটি নতুন বিমানবন্দর এই পরিস্থিতি পাল্টে দিতে পারে।
গত জানুয়ারিতে রাজধানী আদ্দিস আবাবার প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে এই বিমানবন্দরের কাজ শুরু হয়েছে। ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলী এই উদ্যোগকে 'আফ্রিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এভিয়েশন বা বিমান চলাচল অবকাঠামো প্রকল্প' হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দুটি রানওয়ে নিয়ে ২০৩০ সালে চালু হতে যাওয়া 'বিশফতু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর'-এর বার্ষিক যাত্রী ধারণক্ষমতা হবে ৬ কোটি। পরবর্তীতে এটিকে ১১ কোটিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর আটলান্টার 'হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন'-এর চেয়েও বেশি। ২০২৫ সালে আটলান্টার ওই বিমানবন্দরটি প্রায় ১০.৬ কোটি যাত্রী সামলেছে।
বিমান বহরের আকার, মোট যাত্রী এবং রাজস্ব আয়ের দিক থেকে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় বিমান সংস্থা রাষ্ট্রায়ত্ত 'ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স' এই প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংস্থাটির সিইও মেসফিন তাসেউ সিএনএনকে জানিয়েছেন, ১২.৫ বিলিয়ন ডলার খরচের এই প্রকল্পের সরাসরি খরচ মেটাতে এয়ারলাইন্সটি 'তাদের ইক্যুইটির ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ করবে।' বাকি ৮ বিলিয়ন ডলারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং সবশেষ ইতালির সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আফ্রিকার আকাশপথে জোড়া লাগানো
আদ্দিস আবাবা এমনিতেই আফ্রিকার অন্যতম প্রধান এভিয়েশন হাব বা বিমান চলাচলের কেন্দ্র। কিন্তু ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের প্রধান ঘাঁটি 'বোলে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের' ধারণক্ষমতা এরই মধ্যে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে এবং এটি সম্প্রসারণেরও কোনো জায়গা নেই।
নতুন এই বিমানবন্দরটি মূলত ট্রানজিট যাত্রীদের সুবিধার্থে তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল এভিয়েশন বাজার আফ্রিকার আকাশপথে ফ্লাইট সংযোগ বাড়ানোর দৌড়ে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পাবে।
এই বিমানবন্দর আফ্রিকার অব্যবহৃত কার্গো বা পণ্য পরিবহনের ক্ষমতাকেও কাজে লাগাতে পারে। বছরে প্রায় ৩৭ লাখ ৩০ হাজার টন কার্গো সামলানোর মতো অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে এটি 'আফ্রিকান কন্টিনেন্টাল ফ্রি ট্রেড এরিয়া' বা মহাদেশটির ঐতিহাসিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে আরও জোরালো করবে।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির থান্ডারবার্ড স্কুল অফ গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সিনিয়র ফেলো ল্যান্ড্রি সিগনে বলেন, 'বর্তমানে আফ্রিকান এয়ারলাইন্সগুলো সারাবিশ্বে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, যা বছরে প্রায় ১৫-১৬ শতাংশ। অন্যদিকে বৈশ্বিক গড় প্রবৃদ্ধি মাত্র ৫.৫ শতাংশ।' তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশফতু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এই সম্ভাবনার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে হলে এর চারপাশের সড়ক, রেল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং কাস্টমসের মতো আনুষঙ্গিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
তহবিলের বিষয়ে সিগনে সিএনএনকে বলেন, 'এখন পর্যন্ত সব সংকেত ইতিবাচক। তবে এক বছরের মধ্যে ৮ বিলিয়ন ডলারের তহবিল জোগাড় করাটা বেশ উচ্চাভিলাষী এক সময়সীমা।' তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থ সংগ্রহে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগলে ২০৩০ সালের মধ্যে এর প্রথম ধাপের কাজ শেষ করাটা 'অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।'
'ইথিওপিয়ার এক টুকরো প্রতিচ্ছবি'
চীনের বেইজিং ড্যাক্সিং এয়ারপোর্টের ভবিষ্যৎমুখী 'স্টারফিশ' টার্মিনাল এবং মুম্বাইয়ের পদ্ম আকৃতির বিমানবন্দরের নকশা করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জাহা হাদিদ আর্কিটেক্টস (জেডএইচএ) এই নতুন টার্মিনালের নকশার কাজ করছে।
ইথিওপিয়ার বিখ্যাত 'গ্রেট রিফ্ট ভ্যালি' থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো টার্মিনালটি একটি মূল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, যা চারটি পিয়ার বা অংশে বিভক্ত হবে। এর ভেতরের সাজসজ্জা এবং বাগানগুলো ইথিওপিয়ার বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি তুলে ধরবে।
জেডএইচএ-এর এভিয়েশন ডিরেক্টর ক্রিশ্চিয়ানো সেকাটো বলেন, 'ট্রানজিটে থাকা মানুষ যেন ইথিওপিয়ার সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি ধারণা পায়, তারা যেন আফ্রিকাকে অনুভব করতে পারে, সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।'
বিশফতুর মনোরম আবহাওয়া কাজে লাগানোর জন্য আধা-আবদ্ধ জায়গা এবং আঙিনার নকশা করা হয়েছে। সেকাটো আরও বলেন, 'এখানে যাত্রীরা রীতিমতো খোলা আকাশের নিচে থাকতে পারবেন, যা একটি বিমানবন্দরের জন্য সত্যিই বেশ বিরল।'
নকশাকাররা জানিয়েছেন, প্রকল্পটিতে পরিবেশগত টেকসই বিষয়ের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার থেকে শুরু করে সৌরবিদ্যুৎ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নতুন জলাভূমি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এটিও মাথায় রাখতে হবে যে এভিয়েশন শিল্প এখনও বিশ্বের মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের ২-৩ শতাংশের জন্য দায়ী।
স্থানীয়দের ক্ষোভ
এই বিশাল নির্মাণকাজটি এরই মধ্যে বেশ কিছু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, ৯ হাজার একরেরও বেশি কৃষিজমি অধিগ্রহণ করায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং তাদের জীবনযাত্রার মান ফেরাতে তারা ৩৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করছে। এর আওতায় বিদ্যুৎ, পানি, স্কুল এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র সুবিধাসহ ১ হাজার ৪০০টি বাড়ি তৈরি করা হচ্ছে।
তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কিছু বাসিন্দা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা কোনো ক্ষতিপূরণ বা বিকল্প ঘরবাড়ি পাননি। যদিও শহর কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই বিষয়ে সিগনে সিএনএনকে বলেন, আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে বড় প্রকল্পগুলোতে বাস্তুচ্যুতির বিষয়টিকে প্রায়ই 'সুশাসনের সমস্যা হিসেবে না দেখে কেবল কতগুলো ঘর তৈরি হলো বা কতটা কাজ এগোলো—এমন লজিস্টিক বা হিসাবনিকাশের সমস্যা হিসেবে দেখা হয়।'
তিনি সতর্ক করে বলেন, ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের এই প্রতিশ্রুতি 'তুলনামূলক অনেক প্রকল্পের চেয়ে বড়' হলেও, 'স্থানীয়দের অসন্তোষ' মেটানো না গেলে প্রকল্পটি পিছিয়ে যেতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা
পুরো মহাদেশজুড়ে এখন বিমানবন্দরে বিনিয়োগের এক জোয়ার চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো এই বিশফতু। এর বাইরে রুয়ান্ডার ২ বিলিয়ন ডলারের বুগেসেরা এয়ারপোর্ট, বুরকিনা ফাসোর ওয়াগাদুগু-ডনসিন এয়ারপোর্ট এবং কাসাব্লাঙ্কা, কায়রো ও নাইরোবির বিমানবন্দরগুলোর ব্যাপক উন্নয়নের কাজ চলছে।
ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের সিইও তাসেউ সিএনএনকে বলেন, তারা চান এই নতুন বিমানবন্দরটি আফ্রিকার জন্য এমন কিছু হয়ে উঠুক, যেমনটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য দুবাই বা দোহা। অর্থাৎ এটি একটি বড় আঞ্চলিক হাব বা কেন্দ্র হবে, যার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের শক্তিশালী যোগাযোগ থাকবে।
তবে তিনি এ-ও স্বীকার করেন যে, এই বড় লক্ষ্য একা অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, 'আফ্রিকার আকাশপথের যোগাযোগ এখনও যে অবস্থায় থাকা উচিত ছিল, তার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। বাধাহীন সংযোগ দিতে আমাদের অন্যান্য আফ্রিকান এয়ারলাইন্সের সঙ্গেও অংশীদারত্ব করতে হবে।'
২০২৫ সালের 'এভিয়েশন আফ্রিকা সামিট'-এ আফ্রিকান পরিবহন মন্ত্রীরা 'সিঙ্গেল আফ্রিকান এয়ার ট্রান্সপোর্ট মার্কেট' (এসএএটিএম) বা একক আফ্রিকান আকাশ পরিবহন বাজার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই কাঠামোর আওতায় সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিমান সংস্থাগুলো অবাধে ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারবে।
২০১৮ সালে এটি চালু হওয়ার পর থেকে ৩৮টি দেশ এতে সই করেছে এবং আফ্রিকার ভেতরেই ১১০টিরও বেশি নতুন রুট চালু হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে আকাশপথে যাতায়াত ১৪১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং ভাড়াও ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
তবে ছোট এয়ারলাইন্স এবং দেশগুলোর ভয় হলো, এই মুক্ত নীতির ফলে বড় বিমান সংস্থাগুলোই সব সুবিধা লুফে নেবে এবং তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না।
বাজার বিশ্লেষক ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের রিজিওনাল ইনসাইট ম্যানেজার ক্রিস্টি তাউই বলেন, 'আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা জোরালো হলেও ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স এখনও বাজারের শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে।'
তাউই আরও বলেন, ইথিওপিয়ার এই মেগা-এয়ারপোর্ট যাত্রী সংখ্যা এবং বাণিজ্য বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, তবে 'আকাশপথে সত্যিকারের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ শুধু অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না।' এর পুরো সুবিধা পেতে হলে 'নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন, বিশেষ করে এসএএটিএম-এর অগ্রগতি, ভিসা নীতি সহজ করা এবং যাত্রী চাহিদার ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।'
