ইরানের ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত কোথায়? কার নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে?
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। ইরান দাবি করছে, পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া তাদের সার্বভৌম অধিকার। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরানকে এই কর্মসূচি চিরতরে ত্যাগ করতে হবে এবং তাদের হাতে থাকা ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে।
ইরানের কাছে কতটুকু ইউরেনিয়াম আছে?
ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুত রয়েছে। যদিও এটি এখনো সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির স্তরে পৌঁছায়নি। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম থাকলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই একে সেই স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তেহরান অবশ্য দীর্ঘকাল ধরে দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত এবং তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ বিস্তৃত মূল্যায়ন অনুযায়ী, তেহরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪০০ কেজিরও বেশি এবং ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ প্রায় ৩০০ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল। এছাড়া, দেশটির কাছে ৫ শতাংশ সমৃদ্ধ প্রায় ৫.৫ টন এবং ২ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ২.২ টন ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ইরানের এই মজুত আসলে কোথায় আছে?
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের সঠিক অবস্থান এবং বর্তমান অবস্থা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এই মজুত সম্পর্কে কোনো স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য তথ্য এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। আইএইএ জানিয়েছে, ২০২২ সালের জুন মাসে তেহরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নজরদারি ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে এই মজুত সম্পর্কে তাদের তথ্যের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সংস্থাটি তাদের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে স্বীকার করেছে, তথ্যের এই বিশাল ঘাটতি আর পূরণ করা সম্ভব নয়।
মার্কিন দাবি অনুযায়ী, ইরানের 'পারমাণবিক ধুলো' (ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নাম) এখনও ২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ফোরদো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে 'বাঙ্কার বাস্টার' বোমা এবং 'টমাহক' ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছিল।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনাগুলো 'পুরোপুরি ও সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস' হয়ে গেছে। তবে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে পেন্টাগনের এক মূল্যায়নে বলা হয় যে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বড়জোর দুই বছর পিছিয়ে গেছে। অন্যদিকে, তেহরান ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বা ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে স্পষ্ট কিছু না বললেও স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষতির কথা স্বীকার করেছে।
ফরাসি সংবাদপত্র ল্য মঁদ-এর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে হামলার ঠিক আগমুহূর্তে ইরান সম্ভবত তাদের সব উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইসফাহানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সরিয়ে নিয়েছিল। ২০২৫ সালের ৯ জুন তোলা একটি উপগ্রহ চিত্রের ওপর ভিত্তি করে এই ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে একটি বড় ট্রাকে ১৮টি নীল রঙের কন্টেইনার দেখা গেছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে উচ্চ-তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবহনে ব্যবহৃত বিশেষ আধারের মতো।
বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, ওই কন্টেইনারগুলোতে ৫৪০ কেজি পর্যন্ত ইউরেনিয়াম থাকা সম্ভব। তবে হামলার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো গোয়েন্দা তথ্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ইউরেনিয়াম ইস্যুতে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান
ইউরেনিয়াম ইস্যুটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তির পথে একটি প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানকে তাদের সমস্ত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে হবে এবং একই সঙ্গে পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করে এই কর্মসূচি চিরতরে ত্যাগ করতে হবে।
১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা কোনো বড় অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে। এই আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই প্রস্তাব জনসমক্ষে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং বলেছেন, এই স্থগিতাদেশের সময়কাল যথেষ্ট দীর্ঘ নয়।
তেহরান বারবার তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এর পরিবর্তে তারা তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ঘনত্ব কমিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছে। ইসলামাবাদে আলোচনার সময় ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর পাঁচ বছরের স্থগিতাদেশের প্রস্তাবও দিয়েছিল বলে জানা গেছে।
ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তারা তাদের ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তর করবেন না। তাদের মতে, দেশের পারমাণবিক অর্জন জাতীয় গর্বের বিষয় এবং এটি নিয়ে কোনো আলোচনা বা আপস হতে পারে না।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই একই কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানো 'আমাদের জন্য আলোচনার কোনো বিকল্প হতে পারে না।'
রাশিয়ার প্রস্তাব
মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনে একটি মধ্যপন্থা হিসেবে মস্কো বেশ কয়েকবার ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিজেদের কাছে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, রাশিয়া 'অনেক আগে' এই প্রস্তাব দিয়েছিল এবং তেহরান তখন তাতে 'রাজি' ছিল।
পেসকভ এই পরিকল্পনাকে 'একটি অত্যন্ত ভালো সমাধান' হিসেবে বর্ণনা করেন, তবে বলেন যে ওয়াশিংটন এটি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রুশ কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাদের এই প্রস্তাবটি এখনও বহাল আছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা 'রোসাটম'-এর প্রধান আলেক্সি লিখাচেভ গত সপ্তাহের শেষে বলেছেন, কোম্পানিটি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে সাহায্য করতে প্রস্তুত।
তিনি বলেন, 'ইরানের সাথে গঠনমূলক কাজের অভিজ্ঞতা কেবল রাশিয়ারই রয়েছে। ২০১৫ সালে ইরানের অনুরোধে আমরা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিয়েছিলাম... আজও আমরা এই বিষয়ে সহায়তা দিতে প্রস্তুত।'
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির অধীনে ইরান প্রায় ১১ টন নিম্ন-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল। তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে তেহরানের বিরুদ্ধে চুক্তির নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে সেই সমঝোতা ভেঙে যায়।
