ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার পর গরুক, কেশম দ্বীপে মার্কিন হামলা; জবাবে আঞ্চলিক ‘শত্রু ঘাঁটিতে’ হামলার দাবি আইআরজিসির
ইরান থেকে হরমুজ প্রণালির দিকে ছোড়া বেশ কিছু ড্রোন ভূপাতিত করার পর শনিবার দেশটির উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। এই নতুন উত্তেজনার ফলে দুই দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।
রয়টার্সকে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ধারণা অনুযায়ী ওই চারটি ইরানি ড্রোন এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ জানিয়েছে, এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের গরুক এবং কেশম দ্বীপের নজরদারি কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হেনেছে।
এদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মার্কিন হামলার জবাবে 'অঞ্চলের শত্রু ঘাঁটিগুলোতে' হামলা চালিয়েছে।
দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এসব ঘাঁটিতে তাদের 'অ্যারোস্পেস ক্ষেপণাস্ত্র' দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।
তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বর্তমানে মূলত পরোক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সম্ভাব্য চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলোকে আপাতত সরিয়ে রেখে পরবর্তী আলোচনার জন্য রাখা হচ্ছে।
যেকোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে তেহরান চায় তাদের তেল রপ্তানি থেকে জমে থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের রাজস্বে প্রবেশাধিকার, তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া।
এছাড়া হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় রাখার বিষয়টিও তাদের অন্যতম দাবি। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হতো, যা এখন ইরানের কারণে প্রায় বন্ধ হয়ে আছে।
এদিকে, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ বন্ধের জন্য নিজ দেশে প্রবল রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এনবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির বেশিরভাগ কারখানা ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, তেহরানের মোট ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনও সচল অবস্থায় রয়েছে।
এনবিসি নিউজের 'মিট দ্য প্রেস' অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন। 'তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্র আছে, কিছু ড্রোন আছে। আমি বলব, শতাংশের হিসাবে হয়তো তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ২১–২২ শতাংশ এখনো রয়েছে। এটি অনেক বড় সংখ্যা হলেও, আমরা যখন প্রথম আক্রমণ শুরু করেছিলাম তখনকার তুলনায় এটি তেমন কিছুই নয়।'
ইরানের নেতারা কেন চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও বেশি আগ্রহী হচ্ছেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, 'কারণ তারা শক্তিশালী এবং গর্বিত জাতি। এমন অনেক কাজ এখন তাদের করতে হচ্ছে যা তারা আগে কখনও ভাবেনি। এখন তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই, তাই বিষয়টি চূড়ান্ত হতে কিছুটা সময় লাগছে।'
এদিকে, লেবাননের মিত্র হিজবুল্লাহর প্রতি পুনরায় নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে ইরান। সেই সঙ্গে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে দেশটি। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বৃহত্তর সংঘাত অবসানে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির পথে নতুন জটিলতা দেখা দিয়েছে।
তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো শান্তি চুক্তি এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরুর জন্য ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি একটি প্রধান শর্ত। গত মার্চের শুরুতে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হয়।
লেবাননের টেলিভিশন চ্যানেল আল মায়াদিনকে বৃহস্পতিবার রাতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, 'এই যুদ্ধ কেবল তখনই শেষ হবে, যখন লেবাননের সংঘাতও থামবে।' তিনি আরও বলেন, 'লেবাননে যুদ্ধ অবসানের সাথে অবশ্যই অধিকৃত অঞ্চলগুলো থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।'
হিজবুল্লাহ নেতা নাঈম কাসেম ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের একটি মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর এই মন্তব্য এল। ওই চুক্তিতে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো শর্ত ছিল না এবং হিজবুল্লাহ সেই আলোচনার অংশও ছিল না।
