মার্কিন নৌ অবরোধে যেভাবে তেল থেকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে ইরান
চলতি বছরের মে মাসে ইরানের ক্রুড তেল রপ্তানি অন্তত গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তেহরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎসকে এমন এক সময়ে চাপে ফেলেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।
গত ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যে অবরোধ শুরু করে, তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই প্রচেষ্টার অংশ, যার লক্ষ্য ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে শান্তিচুক্তিতে সম্মত হতে বাধ্য করা। তেহরান এ পদক্ষেপকে অবৈধ বলে নিন্দা করেছে এবং তাদের বন্দরসংলগ্ন এলাকায় মার্কিন বাহিনীর জাহাজ আটক করার ঘটনাকে 'জলদস্যুতা' বলে আখ্যা দিয়েছে।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়ে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে ওই সময়ে ইরান তুলনামূলকভাবে নিজেদের তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে থাকে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে অন্য দেশগুলোর পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিযোগিতা কমে যায়। ফলে মার্চ এবং এপ্রিলের কিছু সময় পর্যন্ত ইরানের রপ্তানি শক্ত অবস্থানে ছিল। একই সঙ্গে তেলের উচ্চমূল্যের ফলে দেশটির আয়ও বাড়ে।
তবে এখন দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি ইরানের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ। সর্বশেষ তথ্য বলছে, মার্কিন অবরোধের ফলে বিদেশে, বিশেষ করে ইরানের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীনে তেল বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবরোধ এখন ইরানের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে এবং দেশটি কতদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
মার্কিন অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
বাণিজ্যের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের মতে, ইরানের ক্রুড তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল থেকে মে মাসে ৩ লাখ ব্যারেলেরও নিচে নেমে এসেছে।
যুদ্ধের শুরুতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার কারণে যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল, তার কিছুটা সুবিধাও ইরান পেয়েছিল। তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। আর অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়ায় ইরান উচ্চমূল্যে নিজের তেল বিক্রি করতে পেরেছিল।
অবরোধের আগে মার্চ ও এপ্রিলের বেশিরভাগ সময়ে ইরানের রপ্তানির পরিমাণ বেশ ভালো অবস্থানে ছিল। তখন দেশটির ক্রুড তেল সাধারণত ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি দামে বিক্রি হতো এবং কখনও কখনও এই মূল্য ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেত।
যদি ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ধরা হয়, তাহলে দৈনিক ৩ লাখ ব্যারেল রপ্তানি থেকে আয় দাঁড়ায় প্রায় ২৭ মিলিয়ন ডলার। পুরো মে মাসে এই আয় প্রায় ৮৩৭ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
তবে এটি বছরের শুরুর তুলনায় বড় ধরনের পতন। মার্চে দৈনিক গড় রপ্তানি ছিল ১.৮৪ মিলিয়ন ব্যারেল, যা থেকে প্রতিদিন আনুমানিক ১৬৫.৬ লাখ ডলার এবং পুরো মাসে প্রায় ৫.১৩ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছিল।
এপ্রিল মাসে দৈনিক গড় রপ্তানি ছিল ১.৩৪ মিলিয়ন ব্যারেল। এতে প্রতিদিন প্রায় ১২০.৬ মিলিয়ন ডলার এবং পুরো মাসে আনুমানিক ৩.৬২ বিলিয়ন ডলার আয় হয়।
তথ্য অনুযায়ী, মার্চের তুলনায় মে মাসে ইরানের তেল আয় প্রায় ৮৪ শতাংশ কমে গেছে। সামুদ্রিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান লয়েড'স লিস্টের মতে, এটি অবরোধের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
আর যদি ইরান মার্চের মতো মাসিক আয়ের প্রত্যাশা করে থাকে, তাহলে এপ্রিল ও মে এই দুই মাসে দেশটির সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫.৮ বিলিয়ন ডলার।
কেপলারের তথ্যমতে, অবরোধের ফলে ইরান থেকে নতুন তেল রপ্তানি কমে গেলেও প্রকৃতপক্ষে কত তেল শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তার পুরো চিত্র তথ্যগুলোতে ধরা নাও পড়তে পারে। কারণ, ইরানি জলসীমা ছাড়ার পর কিছু তেলবাহী কার্গো মালয়েশিয়ার কাছে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
ইরান কি এখনও তেল উৎপাদন করছে?
হ্যাঁ, এখনও উৎপাদন করছে। তবে বিক্রি করতে না পারা ক্রুড তেল মজুত করতে ক্রমশ বাধ্য হচ্ছে ইরান।
জ্বালানি নীতি গবেষক ও পরামর্শক মার্ক আইউব আলজাজিরাকে বলেন, 'ইরান এখনও তার অবশিষ্ট মজুত সক্ষমতাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। তথ্য বলছে, অবরোধ কার্যকর হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত চাপ শুরু হবে তখনই, যখন এই মজুত সুবিধাগুলো পূর্ণ হয়ে যাবে।'
এই মজুত তেলের বড় অংশই সমুদ্রে ভাসমান ট্যাংকারে রাখা হয়েছে। কেপলারের হিসাব মতে, বর্তমানে প্রায় ১৪৭ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি ক্রুড তেল ও কনডেনসেট ভাসমান গুদামে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৭ মিলিয়ন ব্যারেল উপসাগর ও ওমান উপসাগরের ভেতরেই আটকে আছে এবং মার্কিন অবরোধ অতিক্রম করতে পারছে না।
ফলে ইরান ক্রমশ তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে অস্থায়ী গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। তেল জাহাজে তুলে সেগুলোকে উপকূলের বাইরে নোঙর করে রাখা হচ্ছে। আর ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানোর নতুন উপায় খোঁজা হচ্ছে।
