পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেলেন বেলজিয়ান-আমেরিকান বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন
এ বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলজিয়ান-আমেরিকান বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন। দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে মহাবিশ্বের অত্যন্ত রহস্যময় 'নিউট্রিনো' কণা শনাক্তের ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল পৌনে ৪টার দিকে নোবেল কমিটি এ পুরস্কার ঘোষণা করে। নোবেল কমিটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব লাইভে এই ঘোষণা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা ভূখণ্ডে বিশ্বের বৃহত্তম নিউট্রিনো ল্যাবরেটরি—'আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি' গঠনে অসামান্য নেতৃত্ব এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন নিউট্রিনো কণা আবিষ্কারে অবদানের জন্য তাকে এ বছরের জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলো।
এধরণের মহাজাগতিক কণার অবস্থান, তাদের প্রকৃত স্বরূপ এবং শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যেই ঘেরা ছিল। ফ্রান্সিস হ্যালজেন প্রথম উপলব্ধি করেন যে, মহাজাগতিক এই কণা শনাক্ত করতে অত্যন্ত কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে দক্ষিণ মেরুর জমাটবদ্ধ বরফ। তার দূরদর্শী বৈজ্ঞানিক চিন্তা থেকেই মূলত বাস্তবে রূপ নেয় আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।
দক্ষিণ মেরুর হিমবাহে বিশাল এলাকাজুড়ে স্থাপিত এই ভূগর্ভস্থ ল্যাবরেটরিতে সংবেদনশীল লাইট সেন্সর বসানো রয়েছে। এই প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের অতি-শক্তিশালী উৎস থেকে ছুটে আসা নিউট্রিনো কণা বন্দি করতে সমর্থ হন।
নিউট্রিনো হলো সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে থাকা ভরহীন বা প্রায় ভরহীন কণা। তবে পদার্থের সাথে এদের প্রায় কোনো মিথস্ক্রিয়া না থাকায় এরা নিজেদের উপস্থিতি একদমই টের পেতে দেয় না। কোটি কোটি নিউট্রিনো কণা কোনো বাঁধা ছাড়াই প্রতি মুহূর্তে আমাদের মানবদেহ এবং সমগ্র পৃথিবী ভেদ করে চলে যায়।
তবে অত্যন্ত বিরল কিছু মুহূর্তে একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে সচ্ছন্দে আঘাত করে। তখন সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে এই সংঘর্ষ শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন নিউট্রিনো কণা মহাবিশ্বের বিধ্বংসী পরিবেশ থেকেই তৈরি হয়। আলোর মতো মহাজাগতিক অন্যান্য কণা মহাকাশ পাড়ি দেওয়ার সময় দিক পরিবর্তন করে কিংবা নিজেদের শক্তি হারিয়ে ফেলে।
কিন্তু নিউট্রিনোর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—সোজা পথে কোনো দিক পরিবর্তন না করে এবং কোনো শক্তি না হারিয়ে এরা সরাসরি পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। ফলে মহাবিশ্বের অতিদূর সীমানা থেকে অন্য কোনো উপায়ে যে অধরা তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব নয়, নিউট্রিনো কণা আমাদের ঠিক সেই তথ্যগুলোই এনে দেয়।
১৯৮৮ সালে বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন দক্ষিণ মেরুর বরফকে কাজে লাগিয়ে নিউট্রিনো কণা বন্দি করার প্রথম বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। তার এই তত্ত্বের মূল ভিত্তি ছিল—স্বচ্ছ বরফের অভ্যন্তরে যখন একটি নিউট্রিনো কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করে, তখন এক ঝলক সূক্ষ্ম আলো উৎপন্ন হয়। হিমবাহের তলদেশে বসানো বিশেষ আলোক সেন্সরগুলো সেই আলোর ট্রেইল ধরে নিউট্রিনোর গতিপথ শনাক্ত করতে পারে।
মহাজাগতিক উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন নিউট্রিনো কণার আগমন অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তাই পর্যাপ্ত পরিমাণ নিউট্রিনোর সংঘর্ষ ধরা ফেলার জন্য একটি বিশাল আয়তনের বরফক্ষেত্রের প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনেই অ্যান্টার্কটিকার বরফে বিশাল জায়গা নিয়ে নির্মাণ করা হয় বিশাল 'আইসকিউব' প্রজেক্ট। ২০১১ সালে এটির পুরো নির্মাণকাজ শেষ হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আইসকিউব ল্যাবরেটরিতে প্রতিনিয়ত জমা হওয়া নিউট্রিনোর তথ্য-উপাত্ত ও ইন্টারঅ্যাকশন বিশ্লেষণ করে মহাবিশ্বের সেইসব ভয়াল ও উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন পরিবেশের নতুন অনেক রহস্য বের হয়ে আসবে।
