পদক তুলে দিয়েছিলেন ট্রাম্পের হাতে, ২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেলজয়ী নির্বাসিত মাচাদো কোথায় আছেন? দেশে ফিরতে পেরেছেন কি?
এক বছর আগের কথা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেছনে ফেলে ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মাতৃভূমি ছেড়ে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল মাচাদোকে। এরপর থেকেই ভেনেজুয়েলায় ফেরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
মাচাদোর ঘনিষ্ঠ ও অবগত একাধিক ওয়াকিবহাল সূত্র মিয়ামি হেরাল্ডকে জানিয়েছে, দেশে ফেরার জন্য পানামা থেকে গোপন নৌ-অভিযান ও চার্টার্ড বিমানের পাশাপাশি সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইটেও ওঠার চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে সেই প্রচেষ্টা।
মাচাদোর টিম বলছে, অন্তত সাতবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেছেন তিনি, প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন। এর পরেই জল্পনা শুরু হয়েছে—তবে কি বাইরের কোনো দেশের সরকার তার এই প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
গত জানুয়ারিতে নাটকীয় সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে তুলে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। তার জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয় ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজকে। অনেকেরই ধারণা ছিল, প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মাচাদোই হয়তো এখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করবেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাচাদোর দেশে ফেরা আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে তারা স্বীকার করেছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাকে দেশে না ফেরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
ডাচ-ক্যারিবীয় দ্বীপ কুরাসাওয়ের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ডাচ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষে মাচাদোকে বহনকারী একটি বিমান ভেনেজুয়েলার উদ্দেশে যাওয়ার পথে কুরাসাওয়ে অবতরণের অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু 'উপরমহলের অনুরোধে' সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি। কে ওই অনুরোধ করেছিলেন, তা অবশ্য জানাননি কুরাকাওয়ের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিসিএএ) প্রধান পিটার স্টেইনমেটজ।
মাচাদো নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন পানামায়। ২২ সেপ্টেম্বর সেখান থেকে কুরাসাওয়ের উদ্দেশে একটি ব্যক্তিগত উরজাহাজার যাওয়ার কথা ছিল তার। ওইদিনই তাকে আরুবায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও ভেস্তে যায়।
তা সত্ত্বেও দেশে ফিরতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মাচাদো। তার রাজনৈতিক দল ভেন্তে ভেনেজুয়েলা জানিয়েছে, চলতি মাসেই নতুন করে আবারও চেষ্টা করবেন তিনি। অক্টোবরের শুরুতে স্প্যানিশ দৈনিক এল পাইস-কে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক হেনরি আলভিয়ারেজ বলেন, 'আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই' দেশে পা রাখবেন তিনি।
ভেনেজুয়েলার আয়রন লেডি-খ্যাত এই রক্ষণশীল নেত্রী কয়েক দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয়। গত বছর নোবেল কমিটি তাকে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পেছনে 'গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অদম্য সংগ্রামকে' অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই শান্তিতে নোবেল পাওয়ার বাসনা ট্রাম্পের। একাধিক যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার মতো বেশ কিছু প্রশ্নবিদ্ধ দাবির ওপর ভর করে গত বছর এ পুরস্কার বগলদাবা করার স্বপ্নও দেখেছিলেন তিনি। চলতি বছরও বলেছেন, তিনিই শান্তিতে নোবেল প্রাপ্য।
গত বছর মার্কিন নেতার 'সাহস ও দূরদর্শিতা'র ভূয়সী প্রশংসা করে তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন মাচাদো। জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে সাক্ষাৎ করে নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদকটি তিনি ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন—যে পদকের জন্য ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে লালায়িত ছিলেন। মাচাদো বলেছিলেন, তার দেশের স্বাধীনতার প্রতি ট্রাম্পের দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিই হলো এই পদক।
ট্রাম্পের মন জুগিয়ে ভেনেজুয়েলায় নিজের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও দেশের নেতৃত্ব নিশ্চিত করাই যদি মাচাদোর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে বলতে হবে সেই কৌশল কাজে আসেনি।
উল্টো ট্রাম্প বলেছেন, মাচাদোর পক্ষে দেশের নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হবে। তার দাবি, 'দেশের ভেতরে মাচাদোর প্রতি মানুষের সমর্থন বা সম্মান নেই।'
যদিও মনে করা হয়, ২০২৪ সালের যে নির্বাচন মাদুরো বাতিল করে দিয়েছিলেন, তাতে মাচাদোর দলই জিতেছিল। তাছাড়া ভেনেজুয়েলাতেও অনেকে মাচাদোর ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছেন।
মাচাদোর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবিতে সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে শত শত সমর্থক রাস্তায় নামেন।
ওই উইকএন্ডেই দেশে পৌঁছান মাচাদোর সহযোগী। বিরোধীদলীয় নেত্রীর গণমাধ্যমবিষয়ক কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা ক্লদিয়া মাসেরো নির্বাসন শেষে কারাকাস বিমানবন্দরে পা রাখলে তাকে স্বাগত জানায় উচ্ছ্বসিত জনতা।
তবে মাচাদো কবে দেশে ফিরতে পারবেন, তা জানা নেই মাসেরোরও। তিনি বলেন, 'মারিয়া কোরিনা প্রতিদিন দেশে ফেরার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। স্পষ্টতই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। তবে এরও একটা শেষ আছে।'
বিরোধী কর্মীদের অভিযোগ, ভেনেজুয়েলা সরকারই তার প্রত্যাবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাচাদোকে লড়তে দেওয়া হয়নি। তবে তার বদলে দাঁড়ানো প্রার্থী এডমান্ডো গঞ্জালেস প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন বলে ধারণা করেন অনেকে।
কিন্তু ওই নির্বাচনে মাদুরো বিজয় দাবি করেন। এরপরই সরকারি ফলাফলের বিরুদ্ধে মুখ খোলা ভিন্নমতাবলম্বীদের ধরপাকড় শুরু হলে মাচাদোসহ অনেক বিরোধী রাজনীতিক আত্মগোপনে যান।
