শান্তিতে নোবেল পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী নাভি পিল্লাই
আন্তর্জাতিক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লাই।
আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ও বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় নরওয়ের রাজধানী অসলোর নোবেল ইনস্টিটিউট থেকে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হয়।
নোবেল কমিটি ফেসবুক পোস্টে জানায়, বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে বৈশ্বিক আইনি শৃঙ্খলাকে আরও সুদৃঢ় করতে অসাধারণ সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন নাভি পিল্লাই।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে বর্ণবাদী শাসনের আমলে এক ভারতীয় তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে তিনি আইন পেশায় এক অগ্রদূত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কর্মজীবনের শুরুতে নেলসন ম্যান্ডেলাসহ বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর এই যাত্রা পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আদালতের ঐতিহাসিক বিচারের কাঠগড়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
নাভি পিল্লাই আন্তর্জাতিক আইনের পরিধি ও প্রভাবকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করেছেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডা বিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটিআর) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন এবং সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডসংক্রান্ত জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রধান ছিলেন। বর্তমানে তিনি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিবৃতিতে নোবেল কমিটি উল্লেখ করে, ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে আইনের শাসনহীন একটি পৃথিবী অন্যায়, অবিবেচক ও অমানবিক। সমাজে শান্তি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যবর্তী রেখাটি রক্ষা করা বিচারকেরা সবসময়ই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বর্তমান সময়ে যখন আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তখন নাভি পিল্লাইয়ের মতো সাহসী, দূরদর্শী ও দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বের ভূমিকা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নাভি পিল্লাই বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় এনেছেন এবং সংঘাতের শিকার মানুষদের মনে আশার সঞ্চার করেছেন। রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে যখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার উপাদান হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, তখন তাঁর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ওই মামলায় তিনি আরেকটি ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছিলেন—যেখানে প্রথমবারের মতো কেবল বিদ্বেষমূলক প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর দায়ে একজন আসামির বিরুদ্ধে গণহত্যার উসকানির অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাদের ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করে, নাভি পিল্লাই আমাদের সময়ের আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিভাবক। তাঁর অনন্য কর্মজীবন বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন রক্ষা ও সম্প্রসারণের গুরুত্বকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তাঁর এই আজীবন অঙ্গীকার একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়তে চাওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য আশা ও অনুপ্রেরণার উৎস।
উল্লেখ্য, নোবেল পুরস্কার প্রবর্তিত হয়েছে সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেল (১৮৩৩–১৮৯৬)-এর নামে। এই রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও শিল্পপতি মূলত ডিনামাইট আবিষ্কারের জন্যই সর্বাধিক পরিচিত। তার এই আবিষ্কার নির্মাণ ও খননক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেও যুদ্ধের ময়দানে এটি বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল।
নিজের সম্পদ মানবকল্যাণে ব্যবহারের ইচ্ছা থেকেই নোবেল তার সম্পত্তি উইল করে যান এমনভাবে যাতে প্রতিবছর মানবজাতির কল্যাণে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের নোবেল পুরস্কার প্রদান করা যায়।
