ট্রাম্পের হুমকির মুখে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল ছাড়ছে জি-৭
বিশ্বজুড়ে জ্বালানির সরবরাহ সংকট নিরসন এবং আকাশচুম্বী মূল্যের লাগাম টানতে ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭। যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতির এই জোট জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতে এর আওতায় 'উল্লেখযোগ্য পরিমাণ' ডিজেল বাজারে ছাড়া হবে।
এর আগে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; যা বিশ্ববাজারে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
এক যৌথ বিবৃতিতে জি-৭ জানিয়েছে, সদস্য দেশগুলো এখন থেকে পরস্পরের ওপর 'জ্বালানি ও জ্বালানি পণ্যে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকতে' সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ইতালি এবং ফ্রান্স নিয়ে এই জোট গঠিত; যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়নও (ইইউ) প্রতিনিধিত্ব করে।
ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের জরুরি মজুত থেকে বাড়তি তেল বাজারে ছাড়তে রাজি না হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সমঝোতার পর শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, 'ইউরোপ তাদের ভারী মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল তেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু হবে।'
এর আগে মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট যুক্তি দিয়েছিলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে মার্কিন 'কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে এই বোঝা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।' পরিবহন ও কৃষি খাতে ডিজেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় এই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব খাদ্যসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর সরাসরি পড়ে।
তবে জি-৭ নেতাদের জরুরি বৈঠকের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানান, জোটটি ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সমন্বয়ে চার মাসের মধ্যে '১০ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত' জরুরি মজুত বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে।
বৈঠকে যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, এই পদক্ষেপগুলো 'জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করবে, সরবরাহ শৃঙ্খলে সক্ষমতা বাড়াবে এবং সাধারণ পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি থেকে রক্ষা করবে।'
মাখোঁ বলেন, এই সমন্বিত পদক্ষেপ 'পেট্রোলিয়াম পণ্যের, বিশেষ করে ডিজেলের দাম কমিয়ে আনবে।' রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার চুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, 'বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট ছিলেন।' পরবর্তীতে হোয়াইট হাউসে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি 'কখনোই চূড়ান্ত বিবেচনায় ছিল না।'
যৌথ বিবৃতিতে জি-৭ নেতারা বলেন, 'আইইএর মাধ্যমে সমন্বিতভাবে চার মাস ধরে অবিলম্বে ১০ কোটি ব্যারেল মজুত ছাড়ার প্রতিশ্রুতি আমরা বাস্তবায়ন করব। যার মধ্যে জি-৭ সদস্য ও অংশীদারদের মাধ্যমে প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই তাৎক্ষণিকভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।'
তবে কোন অংশীদার দেশ কতটা এবং কত দ্রুত এই মজুত ছাড়বে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই ১০ কোটি ব্যারেল তেলের মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল উভয়ই থাকবে।
ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে এলেও শুক্রবার সন্ধ্যায় তা আবার বেড়ে প্রায় ১০২ ডলারে পৌঁছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন চালানোর আগে এই তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলার।
বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর পণ্য গবেষণা পরিচালক ম্যাট স্মিথ জানান, ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর খবরের কারণে তেলের দাম আবারও বেড়েছে। তিনি বলেন, 'ইউরোপে কৌশলগত মজুত ছাড়ার ঘোষণার কারণে তেলের দাম দ্রুত কমছিল। কিন্তু বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে নিরাপদ রুট নিশ্চিত করতে সৌদি আরব ইয়েমেনে নতুন অভিযানের পরিকল্পনা করছে—এমন গুঞ্জনে তেলের বাজার আবার উল্টো দিকে ঘুরে গেছে।'
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও চীনের সরবরাহ হ্রাসের প্রেক্ষাপটে মার্কিন ডিজেল বন্ধ করার হুমকির মুখে কড়া প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল ইউরোপীয় দেশগুলো। তবে সমঝোতায় পৌঁছানোর পর জি-৭ নেতারা জানিয়েছেন, একসঙ্গে একাধিক শোধনাগার যাতে বন্ধ না হয়, সে জন্য তারা সংস্কারকাজের সময়সূচি সমন্বয় করবেন। একই সঙ্গে যাদের সক্ষমতা রয়েছে, তাদের বিশেষ করে ডিজেল পরিশোধন বাড়ানোর জন্য উৎসাহিত করা হবে।
মার্কিন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এড়ানো আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বড় স্বস্তি বয়ে এনেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের জন্য, যেখানে শুক্রবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাম্পে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ২ পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি ডিজেল আমদানি করা হয়, যার ৩১ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ডিজেল সরবরাহকারীদের একটি। সেখানকার অভ্যন্তরীণ শোধনাগারগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল ডিজেল উৎপাদন করে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল যুক্তরাষ্ট্রেই ব্যবহৃত হয়। বাকি ১২ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল তারা প্রতিদিন রপ্তানি করে থাকে, যা বিশ্ববাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেলের প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আরেক শীর্ষ উৎপাদক রাশিয়া তাদের শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার পর ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় সরবরাহ সংকট আরও বেড়েছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন জি-৭ নেতারা। পেট্রলের চেয়ে ডিজেল পরিশোধন করা তুলনামূলক জটিল এবং পরিবহন ও কৃষি খাতে ব্যবহারের কারণে এর বিকল্প বা চাহিদা তাৎক্ষণিকভাবে কমানো কঠিন।
