৬ নম্বর বাস: হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের শেষ স্মৃতি
ছয় নম্বর বাসের বয়স ষাটের বেশি। ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় বাস ছিল এই ৬ নম্বর। এর সমসাময়িক বেশিরভাগ বাস বিলুপ্ত হয়ে গেছে; যেমন–আজিমপুর থেকে আব্দুল্লাপুর রুটের ৫ নং বাস, মতিঝিল থেকে বালুঘাট রুটের ৪ নং বাস ইত্যাদি।
ঢাকায় এখন সচল রুট ৯০টি। আগের মতো রুট নম্বর ধরে বাস চেনার চল নেই, বরং নাম দিয়ে বাস চেনার চল হয়েছে; যেমন–শিকড়, ইতিহাস, প্রজাপতি, আজমেরি, মিডলাইন, বিহঙ্গ, বসুমতি, আকাশ, ভিক্টর, আলিফ ইত্যাদি। নাম যেমন এদের, চেহারাও বাহারি। তবু এর মধ্যেই বয়স্ক, পুরোনো, একলা এক ছয় নম্বর আছে, চলছে ধুকে ধুকে। একটি মাত্র বাস সচল আছে এই রুটে এখন। চলাচল করে কেবল কমলাপুর থেকে গুলিস্তান।
অথচ সোনালি অতীতে ৬ নম্বর চলত পীরজঙ্গি মাজার (কমলাপুর) থেকে গুলশান। এই পথেরই দুটি শাখা রুট ছিল যার একটি কমলাপুর-মতিঝিল-গুলিস্তান-জিপিও-কাকরাইল-শান্তিনগর-মালিবাগ-মগবাজার-কারওয়ানবাজার-ফার্মগেট-জাহাঙ্গীরগেট-মহাখালী-গুলশান ১ হয়ে গুলশান ২; দ্বিতীয়টি কমলাপুর-গুলিস্তান-কাকরাইল-মগবাজার-সাতরাস্তা-মহাখালী-গুলশান ১ হয়ে নতুন বাজার।
এ,বি নামে পরিচিত ছিল এসব রুট। তের বা চৌদ্দ কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল রুটগুলোর।
'লাইন দিয়া লোক উঠত'
মো. পেয়ারু মিয়া জন্মেছেন ১৯৫৩ সালে। ছয় নম্বর বাসে কাজ শুরু করেছিলেন ১৯৬৮ সালে। তার মামা ছিলেন সুপারভাইজার।
"প্রথম ১০-১৫ দিন আইছি আর গেছি। তারপর জিলানী ওস্তাদের বাসে ঢুকায়া দিল মামা। পিছনের দরজার হেলপার। সামনের দরজার হেলপাররে পাকা হইতে হয়। তার ডাইন-বাম হিসাব রাখতে হয়। পিছনের হেলপারের কাজ হইল চিল্লানি—এই গুলিস্তান, ফার্মগেট, গুলশান," বললেন পেয়ারু।
পেয়ারু মিয়া পেছনের দরজায় হেলপার ছিলেন ৩ বছর। তারপর গেছেন সামনের দরজায়, তারপর হয়েছিলেন কন্ডাক্টর, তারপর হয়েছিলেন ড্রাইভার। মাঝে কেটে গেছে ১৪ বছর।
কমলাপুরে ৬ নম্বরের স্ট্যান্ড হওয়ার আগে বাসগুলো ছাড়ত আরামবাগ থেকে। ১৯৬৮ সালে রেলস্টেশন চালু হওয়ার পর স্ট্যান্ড চলে আসে কমলাপুরে। দূর-দুরান্তের মানুষের শহরে প্রবেশের প্রধান বাহনে পরিণত হয় ৬ নম্বর বাস।
পেয়ারু মিয়া বলছিলেন, "আশিটা বাস ছিল তখন। শহীদ সাব, খালেক সাবের মতো জাদরেল লোকেরা ছিল বাস মালিক। নায়ক খসরুদেরও বাস ছিল। ড্রাইভার ছিল সব মাউরা (বিহারি)। টাইম টেবিলের গাড়ি ছিল ৬ নম্বর। ২ মিনিট পর পর গাড়ি ছাড়ত।"
"গাড়ি সিরিয়াল দেওয়ামাত্র ভরতে দেরি হইত না। মানুষ লাইন দিয়া গাড়িতে উঠত। মহিলাদের জন্য আলাদা লাইন, পুরুষদের জন্য আলাদা। মহিলাদের জন্য সামনের নয় সিট রিজার্ভ ছিল। কমলাপুর থেকা গুলশানের ভাড়া ছিল ১২ আনা। এক ট্রিপে তিনশ-চারশ যাত্রী পাইতাম," যোগ করেন পিয়ারু।
বিশালদেহী বাস ছিল ৬ নম্বর। ৫২ সিটের বাস। এক পাশে তিনটি সিট, অন্যপাশে দুইটি। সবমিলিয়ে এক সারিতে পাঁচটি সিট। ষাট ও সত্তর দুই দশক ছিল বেডফোর্ড কোম্পানির বাস। আশির দশকে আসে সুপিরিয়ার বাস, যা চলেছিল নব্বই দশক পর্যন্ত। তারপর টাটা, হিনো আর অশোক লিল্যান্ড।
বাসগুলোতে স্টাফ থাকত পাঁচ জন। তাদের মধ্যে দুইজন হেলপার, কন্ডাক্টর দুইজন এবং একজন ড্রাইভার। কন্ডাক্টররা সিট ভাগাভাগি করে ভাড়া কাটতেন। ড্রাইভারের সঙ্গে পিছনের হেলপারের যোগাযোগের মাধ্যম ছিল একটি ঘণ্টা। হেলপার যাত্রী দেখতে পেলে ঘণ্টায় টান দিত, যাত্রী ওঠানো শেষ হলেও ঘণ্টায় টান দিত। দুইবার ঘণ্টা বাজলে বাস চলত, একবার বাজলে বাস থামত।
টিকেট ছিল ১০ রংয়ের
ভোর পাঁচটায় বাসের চলাচল শুরু হতো। টাইম টেবিলের বাস, তাই নির্দিষ্ট সময়ে স্টপেজে না পৌঁছাতে পারলে জরিমানা গুনতে হতো। ষাট ও সত্তরের দশকে ঢাকার রাস্তায় চলত বাস, রিকশা, প্রাইভেট কার আর বেবিটেক্সি; তবে সংখ্যায় খুব বেশি নয়।
পেয়ারু মিয়া স্মৃতি খুঁড়ে বের করলেন, "গুলিস্তান, মগবাজার, ফার্মগেট আর মহাখালীতে ছিল ট্রাফিক পোস্ট। যানজট ছিল না। দিনে ৭-৮টা ট্রিপ দিতাম। যাত্রীরা ভদ্র ব্যবহার করতেন। ড্রাইভার সাব, কন্ডাক্টর সাব বইলা ডাকতেন। গাড়ি কম ছিল, যাত্রীর চাপ ছিল বেশি। খাওয়ার সময়ও পাইতাম না। গুলিস্তানে তারা মিয়ার হোটেল ছিল। সুনাম ছিল তার তেহারির, লইয়া মুখে দিয়াই আবার ছুট।"
৬ নং মতিঝিল-বনানী ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের (স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত) বর্তমান সভাপতি ইউসুফ খান রনি। তিনি জানালেন, বাসটির বয়স ৬৭। তবে ঢাকা গবেষক হাসেম সূফীর মতে, ৬ নং বাসের চলাচল শুরু ১৯৬৫ সালে । কারণ তার আগে গুলশানে ঘর-বাড়ি কম ছিল, যার প্রায় সবই ছিল একতলা।
হাসেম সূফী প্রথম ৬ নং বাসে চড়েছেন ১৯৭২ সালে। সম্ভবত গুলশানে কোনো বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলেন। ভাড়া মনে করতে পারলেন দেড় টাকা। বাস কন্ডাক্টরের কাঁধে একটি চামড়ার ব্যাগ ঝুলত, সেটি তার স্পষ্ট মনে আছে। কন্ডাক্টর সেটিতে খুচরা বা ভাংতি পয়সা রাখতেন।
পেয়ারু মিয়া বললেন, "রেজগির (খুচরা) জন্য তখন রেজগিওয়ালাও ছিল। তারা খুতিতে (পাটের ব্যাগ) করে রেজগি নিয়ে ঘুরে বেড়াত। কন্ডাক্টররা তার কাছ থেকে চার আনা, আট আনা ভাঙিয়ে নিতেন, বিনিময়ে রেজগিওয়ালা কিছু কমিশন পেতেন।"
"প্রতিটি স্টপেজের জন্য আলাদা আলাদা টিকেট ছিল। হলুদ, লাল বা কমলা রং হতো টিকেটগুলোর। এমন টিকেট ছিল ১০ থেকে ১২ রকমের। কন্ডাক্টররা এত এক্সপার্ট ছিলেন যে না দেখেও সঠিক টিকেট বের করে দিতে পারতেন," যোগ করেন পিয়ারু।
'সেরা লাইন ভদ্রলোকের বাস'
পেয়ারু মিয়া যেদিন ড্রাইভার হন রথখোলার মরন চাঁদের দোকান থেকে মিষ্টি এনে সহকর্মীদের খাইয়েছিলেন। সেটা ১৯৮২ সাল। ড্রাইভার হওয়ার পর সাদা শার্ট আর লুঙ্গি পরতে শুরু করেন। চার-পাঁচ সেট শার্ট-লুঙ্গি ছিল তার। হেলপার থাকার সময় পরতেন হাফ শার্ট আর ইংলিশ প্যান্ট।
কেন ৬ নং ছেড়ে অন্য কোনো বাসে যাননি জানতে চাইলে বললেন, "এটি ছিল সেরা লাইন, ভদ্রলোকের বাস। এ লাইনে যেমন টাকা ছিল, আবার সম্মানও ছিল। আমরা পাঁচজন দিনে ৩০০ টাকা বেতন পাইতাম। ৬ নং বাসের স্টাফ শুনলে লোকে সম্মানও করত। পাস থাকলে পুলিশরা ফ্রিতে যাতায়াত করতে পারতেন, ছাত্রদের জন্য হাফ ভাড়া ছিল।"
হাসেম সূফী বললেন, "৬ নং বাসের চলাচল পথে তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজ, নটরডেম কলেজ, তিতুমীর কলেজের মতো বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় ছাত্রদের জন্য সুবিধা হয়েছিল অনেক। মতিঝিল হয়ে চলাচল করত বলে অফিস কর্মচারী এমনকি কর্মকর্তাদের জন্যও এ বাস ছিল আশির্বাদ। তাই এর স্টাফদের লোকেরা খাতির করত।"
রুটের শেষ বাসটির মালিক ইউসুফ খান রনি। কেন তিনি আজো বাসটি ধরে রেখেছেন জানতে চাইলাম। উত্তরে বললেন, "মায়ায় বাঁধা পড়ে গেছি। নইলে তেলের খরচ ওঠে না, স্টাফদের বেতন দেই ঘর থেকে এনে, কে তবে এই হাতি পোষে?"
রনি এ রুটের সঙ্গে যুক্ত হন ১৯৯৪ সালে। বাসের ব্যবসায় এসেছিলেন একরকম জেদের বশে। তার বাড়ি মুন্সিগঞ্জের হাসাড়া গ্রাম থেকে শ্রীনগর কলেজ ৫ কিলোমিটার দূরে। ভাড়া নিয়ে গোলমাল হয় বলে বাসওয়ালারা ছাত্রদের বাসে তুলতে চাইতেন না। রনি তাই ভেবেছিলেন বাসের ব্যবসা করবেন, আর ছাত্রদের বিশেষ সুবিধা দেবেন।
১৯৯২ সালে ডিগ্রি পাশ করে একদিন তিনি গুলিস্তান যান চাচাতো ভাইয়ের কাছে। ভাই ছিলেন বাস মালিক সমিতির নেতাদের একজন। বাস ব্যবসায় তখন ইনকামও ছিল অনেক, সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে হাজার টাকা আয় করা কোনো ব্যাপার ছিল না।
ছাত্ররাই উঠত বেশি
চাচাতো ভাইয়ের কাছে বাস লাইনে ব্যবসা করার মনো বাসনা খুলে বলেন রনি। দিন কয় পরে নরসিংদীর মনোহরদির একটি বাসের দরদাম করে ফেললেন ভাই। ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় গাড়িটি কিনেছিলেন রনি; রুট বদল করে চালিয়েছিলেন গুলিস্তান-পোস্তগোলা-ইকুরিয়া-নিমতলা-শ্রীনগর হয়ে মাওয়া।
রনি বললেন, "ছাদ, বাম্পার সব জায়গা হাউজফুল থাকত। তেল খরচ, খোরাকী, চাকার খরচ ছিল কম। প্রচুর কাঁচা টাকা বাস ব্যবসায়। তেরো বছর ব্যবসা করে ৮টি গাড়ি করেছিলাম। দূরপাল্লার গাড়ি 'পর্যটক' চালিয়েছিলাম খুলনা রুটে। সেটি একবার অ্যাকসিডেন্ট করায় বন্ধ করে দেই। শেষে ১৯৯৪ সালে একটি গাড়ি ছয় নম্বর রুটে ভাড়া দেই মাসে ২২ হাজার টাকা দরে। দিনে দিনে রুট মালিক ও স্টাফদের সঙ্গে চেনা-পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এক সময় অন্য রুটগুলো থেকে ব্যবসা গুটিয়ে এ রুটেই বেশি গাড়ি চালাতে থাকি।"
আরও বললেন, "সেসময় ৭২টি গাড়ি ছিল এ রুটে। ব্যবসা ছিল ভরপুর। যাত্রীরা লাইন দিয়ে থাকত কখন ৬ নং আসবে! চুরানব্বই সালে মতিঝিল-গুলশান ভাড়া ১০ টাকা। ছাত্ররাই উঠত বেশি, তারা অনেক সময় ভাড়া না দিয়েও নেমে যেত।"
সাধারণত একটি বাসের নির্ধারিত স্টাফ ছিল ১০ জন। পাঁচ জন করে দুইটি দল। প্রথম দল একদিন দ্বিতীয় দল পরের দিন কাজ করত। এছাড়া স্পেয়ার বা অতিরিক্ত স্টাফ ছিলেন ৩০-৪০ জন। নির্ধারিত স্টাফরা কোনো ট্রিপে রেস্ট নিতে চাইলে অথবা স্টাফরা অসুস্থ হয়ে পড়লে স্পেয়ার স্টাফ বিকল্প হিসেবে কাজ করতেন।
১৯৯৪ সালে প্রতি রাউন্ড ট্রিপে স্টাফরা ২০০ টাকা পেতেন, খোরাকী পেতেন আলাদা। প্রতিটি রাউন্ড ট্রিপে সময় লাগত আড়াই ঘণ্টা। একেকটি বাস ৪-৫টি ট্রিপ দিতে পারত।
বিপদ আসে একের পর এক
প্রথম বড় আঘাত আসে ২০০১ সালে। সরকার সেবার নিয়ম করে ২০ বছরের অধিক বয়সী বাস আর রাস্তায় চলতে পারবে না (মডেল আউট)। তখন ৬ নং রুটের ৬২টি গাড়ি একসঙ্গে বাতিল হয়ে যায়। রুট তখনো জমজমাট ছিল বলে ২০০৩-২০০৪ সালে মালিকরা নতুন করে গাড়ি নামালেন, সবমিলিয়ে ১০২টি।
২০১০ সালের দিকে আবার কিছু গাড়ির মডেল আউট হয়ে গেল। ২০১১ সালে গাড়ির সংখ্যা দাঁড়াল ৬৫টিতে।
২০১৬ সালে আঘাত এলো সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক থেকে। ওই বছর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হয়। এই ঘটনাকে সামনে এনে ৬ নং গাড়ির গুলশান চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। নতুন রুট দেওয়া হয় প্রগতি সরণি দিয়ে নতুনবাজার।
কিন্তু নতুন রুট জমল না, মালিকরা মনমরা হয়ে গেলেন। এরপর যে গাড়ির মডেল আউট হয়, তার বিকল্প আর ফিরিয়ে আনা হয় না। ফলে বাস সংখ্যা কমতে থাকে।
মডেল আউট মানে বিরাট লোকসান। গাড়ি চলে যায় সোজা ভাঙারির দোকানে।
ইউসুফ খান বললেন, ভাঙারিওয়ালারা গাড়ি লোহার দরে কিনে নিয়ে গ্লাস, ইঞ্জিন, চাকা আলাদা আলাদা বিক্রি করেন। আমার নিজের ৩০ লাখ টাকার গাড়ি বিক্রি করেছি ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকায়।"
তবু আশা যায় না
২০১৬ সালের পর নতুন গাড়ি আর যোগ হয়নি রুটে। তারপর এলো করোনাকাল। ৬ নং গাড়ি পথে বসে গেল। মায়ায় বাঁধা পড়ে একটিমাত্র গাড়ি রাস্তায় রেখেছেন ইউসুফ খান রনি।
আশায় আছেন সুদিন আসবে। নতুন নতুন মালিকের সঙ্গে কথা বলছেন। পুরনোদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন।
বললেন, "কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছি যেন গুলশান রুটটা আবার চালু করা যায়, তেলের দামের সঙ্গে মিলিয়ে ভাড়াও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়। আশা করি, ৬ নং আবার জমজমাট হবে।"