ইরানের ড্রোন হামলার ভয়ে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটি থেকে বোমারু বিমান সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ব্রিটেনের 'আরএএফ ফেয়ারফোর্ড' ঘাঁটিকে ঘিরে 'হুমকি' থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সেখান থেকে তাদের বোমারু বিমান সরিয়ে নিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর রোববার নিশ্চিত করেছে, তারা তাদের বি-১ মডেলের বোমারু বিমানগুলো—যার সংখ্যা প্রায় এক ডজন বলে ধারণা করা হচ্ছে—ঘাঁটি থেকে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত নিজ নিজ ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নিয়েছে।
সোমবার নেব্রাস্কার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি 'হুমকির' বিষয়ে জানত এবং এ কারণেই তারা বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নিয়েছে।
এর আগে সোমবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেছিলেন, আরএএফ ফেয়ারফোর্ড নিরাপদ রয়েছে। তিনি গত সপ্তাহে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন। ওই বক্তব্যে ট্রাম্প ঘাঁটিটিকে ঘিরে যুক্তরাজ্যের 'পুলিশ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীর' প্রশংসা করেছিলেন।
ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা পাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে, যেখানে বলা হয়েছিল, নতুন একটি হুমকির কারণে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর ওই বিমানঘাঁটির কাছে তিনটি 'সন্দেহজনক যানবাহন' দেখা যাওয়ার পর পুলিশকে সতর্ক করা হয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোনো 'নির্দিষ্ট হুমকির' কারণে যুক্তরাষ্ট্র ওই বিমানঘাঁটি থেকে তাদের বোমারু বিমান সরিয়ে নিয়েছে কি না।
ট্রাম্প জবাবে বলেন, 'হ্যাঁ, আমি মনে করি আমরা এটা বলতে পারি। তারা দুর্ঘটনাবশত সেখান থেকে উড়ে যায়নি।'
তিনি বলেন, 'কিছু হুমকি ছিল। আর শত্রুকে প্রলুব্ধ করার পরিবর্তে আমরা শত্রুকে ধরব এবং পরাজিত করব। তাহলে তাদের সেখানে রেখে আমরা ঝুঁকি নেবই বা কেন? তাই আমরা তাদের একটু অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়েছি। খুব বেশি দূরে নয়।'
তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন 'আসলে যারা এই হুমকি দিয়েছে, তাদের চেনে', তবে তারা কারা তা তিনি নিশ্চিত করেননি।
আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার পেছনে ঠিক কী ধরনের হুমকি কাজ করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ওয়াশিংটনের কয়েকটি সূত্র বিবিসিকে ধারণা দিয়েছে, বিষয়টি নাশকতার চেষ্টা অথবা ইরানের সঙ্গে আবার সংঘাত শুরু হলে সংবেদনশীল ও ব্যয়বহুল ওই বিমানগুলোতে হামলার চেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র ইউক্রেনের 'অপারেশন স্পাইডারওয়েব'-এর উদাহরণ তুলে ধরেছে। গত বছরের জুনে ইউক্রেন গোপন একটি ড্রোন হামলা চালিয়ে রাশিয়ার পাঁচটি বিমানঘাঁটিতে হামলা করেছিল। শত্রুপক্ষ কীভাবে দূরবর্তী অবস্থান থেকেও এ ধরনের হামলা চালাতে পারে, সেটিই ওই উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে।
ওই সূত্রটি বলেছে, 'তারা যে বিষয়টিই মনে করে থাকুক না কেন, সেটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল।'
ট্রাম্প ও তার আগে ভ্যান্সের মন্তব্যের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্যের স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
ট্রাম্প ও ভ্যান্স দুজনেই একটি নির্দিষ্ট করে না বলা হুমকির কথা উল্লেখ করলেও রুবিও তার বক্তব্যে অনেক বেশি সতর্ক ছিলেন। তিনি বলেন, সামরিক ইউনিট ও সামরিক সরঞ্জাম বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় নিয়মিতভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়, তাই এ ধরনের পদক্ষেপ 'অস্বাভাবিক নয়'।
গ্লুচেস্টারশায়ারের কটসওল্ডস এলাকায় অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড এমন একটি ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যার তদন্ত করছে সন্ত্রাসবাদবিরোধী পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে পাঁচজনকে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর যুক্তরাজ্য ও ইরানের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ষষ্ঠ এক ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাকেও জামিনে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রথম পাঁচজনকে ছেড়ে দেওয়ার পর ট্রাম্প ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। একই সময়ে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন, ওই ঘটনায় ইরানের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
হোয়াইটহলের সূত্রগুলো অবশ্য অস্বীকার করেনি যে গ্লুচেস্টারশায়ারের বিমানঘাঁটিতে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনার প্রতিক্রিয়াতেই ওয়াশিংটন বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
সোমবার এর আগে রুবিও বলেন, ফেয়ারফোর্ডে গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে তিনি সরাসরি যুক্ত করবেন না।
তিনি আরও বলেন, 'অনুশীলন, পুনর্বিন্যাস, নতুন সদস্যদের আসা এবং পুরোনো সদস্যদের বদলি হওয়া, নতুন বিমান আসা এবং পুরোনো বিমান চলে যাওয়ার মতো কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।'
রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো তাদের সব ঘাঁটির নিরাপত্তা নিয়ে পূর্ণ আস্থা রাখে এবং ওই ঘটনার পর থেকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত সহযোগিতা করে আসছে।
পরে ভ্যান্স বলেন, 'অতিরিক্ত সতর্কতার' অংশ হিসেবে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ওয়াশিংটন মনে করে, ইরান গত ৪৯ বছর ধরে যে কাজ করে আসছে, সেটিই করছে—অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও অনেক দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে।
আরএএফ ফেয়ারফোর্ডে ওই ঘটনার কয়েক দিন পর প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম বলেন, ওই ঘটনায় ইরানের ভূমিকা থাকার 'জোরালো ইঙ্গিত' রয়েছে। তবে তিনি এর পক্ষে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। অন্যদিকে রুবিও বলেন, ওই ঘটনায় 'স্পষ্টতই কোনো বিদেশি পক্ষের হাত ছিল', তবে তিনিও বিস্তারিত কিছু জানাননি।
তেহরান ওই ঘটনায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।
জুলাই মাসে ইরান বলেছিল, 'ইরানের ভূখণ্ডের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের জন্য ব্যবহৃত যেকোনো ঘাঁটি আমাদের বাহিনীর জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু।'
উইলফোর্ড গ্রামের কাছে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ড কয়েক দশক ধরে মার্কিন বিমানবাহিনী অগ্রবর্তী পরিচালন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি অনুরোধ অনুমোদন করার পর, ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই ঘাঁটি থেকে বি-১ ও বি-৫২ বোমারু বিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিশ্লেষক ক্রিস্টোফ বার্গস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আরএএফ ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার ফলে ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বড় পরিসরে বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা কমে যাবে এবং এতে হুমকির মাত্রাও কিছুটা কমবে।
তবে তিনি বলেন, লন্ডনের শর্ত ছিল যে ঘাঁটিটি কেবল প্রতিরক্ষামূলক হামলার জন্য ব্যবহার করা যাবে। ফলে ঘাঁটির ব্যবহার এমনিতেই সীমিত ছিল।
বার্গস বলেন, বিমানগুলো সম্ভাব্যভাবে দিয়েগো গার্সিয়া অথবা উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটিতে পাঠানো হতে পারে। এতে আকাশে থাকা অবস্থায় অন্য বিমান থেকে জ্বালানি নেওয়ার প্রয়োজন কমবে। তবে এটি নির্ভর করবে ওই ঘাঁটিগুলোর সক্ষমতা, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর।
