যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রকে কি টেক্কা দিতে পারবে চীনের নতুন ‘পিএল-১৬’? বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘হয়তো পারবে’
শত্রুর যুদ্ধবিমান ধবংসে চীনের সর্বাধুনিক আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র 'পিএল-১৬' মার্কিন বিমান বাহিনীর সমকক্ষ ক্ষেপণাস্ত্রের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বর্ধিত পাল্লার এবং মাঝ-আকাশে গতি বাড়ানোর বিশেষ প্রযুক্তির কারণে, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতে এটি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ারফোর্সকে (পিএলএ-এএফ) বাড়তি সুবিধা দেবে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রতিরক্ষা খাত সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমে এই 'পিএল-১৬' ক্ষেপণাস্ত্রের যে বিবরণ পাওয়া গেছে, তা থেকে বিশ্লেষকরা মনে করছেন—এটি মূলত মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য লকহিড মার্টিনের তৈরি 'এআইএম-২৬০ জয়েন্ট অ্যাডভান্সড ট্যাক্টিক্যাল মিসাইল' (জেএটিএম)-এর জবাবে চীনের একটি বড় পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে চীন তাদের আগের প্রজন্মের এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রযুক্তিতে-ও বড় ধরনের উন্নয়ন ঘটিয়েছে।
গত ৩ জুন ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিষয়ক নিউজ পোর্টাল 'ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিসার্চ উইং'-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা বা আঘাত হানার দূরত্ব আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার (১২৪ থেকে ১৮৬ মাইল)। এতে 'ডুয়াল-পালস' বা পরিবর্তনশীল থ্রাস্ট রকেট মোটর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা ক্ষেপণাস্ত্রটিকে তার যাত্রাপথের শেষভাগে নতুন করে গতিবেগ বা প্রপালশন বাড়াতে সাহায্য করে।
অন্যদিকে লকহিড মার্টিনের তৈরি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মধ্যেও দৃষ্টিসীমার বাইরের (বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য বাড়তি প্রপালশন প্রযুক্তি থাকবে, এবং এটি অন্তত ২০০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রতিরক্ষা কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ম্যালকম ডেভিস বলেন, পিএল-১৬-ও এই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের কারণে বড় আকৃতির এবং ধীরগতির বিমানগুলোকে সহজেই তাড়া করতে পারবে। আর এই তাড়া করার ক্ষমতাই যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
ডেভিস বলেন, "এত দূরপাল্লার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষেপণাস্ত্রটির যাত্রাপথের শেষ ধাপে (টার্মিনাল ফেজ) দিক পরিবর্তনের সক্ষমতা (ম্যানুভারেবিলিটি) এবং এর নিখুঁত গাইডেন্স বা দিকনির্দেশনা ব্যবস্থা।" তিনি জানান, পিএল-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল (এওয়াক্স) বিমান, মাঝ-আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার এবং নজরদারি বিমানগুলোকে আঘাত হানার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। ফলে অনেক দূর থেকেও এর মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
তিনি বলেন, "এখানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি এয়ার ফোর্সের কৌশলটি একদম পরিষ্কার। তারা মার্কিন বিমান বাহিনী, নৌবাহিনীর বিমান এবং তাদের মিত্র শক্তির মূল যুদ্ধ সহায়তাকারী ব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করতে চায়। আর এগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে তাদের বিমান ও নৌ শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে না।"
তিনি আরও যোগ করেন, "মূলত চীনের পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্রের জবাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জেএটিএম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিল। ফলে দৃষ্টিসীমার বাইরের আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে চীন ও আমেরিকার মধ্যে এখন এক আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা চলছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো যুক্তরাষ্ট্র কত দ্রুত এই জেএটিএম উৎপাদন করতে পারে, কারণ চীনারা পিএল-১৬ উৎপাদনে খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাবে।"
তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগরের মতো দীর্ঘদিনের ফ্ল্যাশপয়েন্ট বা বিরোধপূর্ণ অঞ্চল নিয়ে—বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটন সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়াবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার চুক্তিবদ্ধ মিত্র ফিলিপাইন ছোট ছোট দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত রয়েছে। তবে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনী গুয়াম, হাওয়াই এবং জাপানের মতো কাছাকাছি এলাকাগুলোতে নিজেদের ঘাঁটি বজায় রেখেছে।
তাইওয়ান স্ট্র্যাটেজি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন থিঙ্ক ট্যাংকের সহযোগী গবেষক এনরিকো কাউ বলেন, "আমি নিশ্চিত যে পিএল-১৬ ক্ষেপণাস্ত্রটি বি-৫২-এর মতো বড় আকারের বোমারু বিমানের জন্য মাথাব্যথার কারণ হবে, যদি সেগুলো এর সীমানার মধ্যে আসে। তবে তুলনামূলক ছোট, চটপটে এবং দ্রুতগতির যুদ্ধবিমানগুলোর বিরুদ্ধে এটি কতটা কার্যকর হবে, সে বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই।"
ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রিসার্চ উইং-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চীনের জে-২০ এবং আগামীতে আসতে যাওয়া জে-৩৫ এর মতো স্টিলথ (রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম) ফাইটার জেটের অভ্যন্তরীণ সমরাস্ত্র কক্ষে (উইপনস বে) সহজেই ফিট করে যাবে।
তাইপের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি রিসার্চের সহযোগী গবেষক হুয়াং চুং-তিং বলেন, একটি জে-২০ যুদ্ধবিমান যেখানে আগের প্রজন্মের পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র সর্বোচ্চ চারটি বহন করতে পারত, সেখানে এটি নতুন পিএল-১৬ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৬টি বহন করতে পারবে।
তিনি বলেন, "এর অর্থ হলো একটি জে-২০ যুদ্ধবিমান কেবল অতিরিক্ত এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানতে পারবে না, বরং প্রাথমিক আক্রমণের পর ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে দ্রুত পিছু হটার পরিবর্তে— দীর্ঘসময় ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করার বাড়তি সক্ষমতা অর্জন করবে।"
পিএল-১৬-এর উন্নয়ন বা প্রস্তুতির বিষয়ে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। ফলে বিশ্লেষক এবং গণমাধ্যমগুলো মূলত ফাঁস হওয়া এবং পরোক্ষ কিছু তথ্যের ওপর নির্ভর করছে, যার মধ্যে চীনের একটি সামরিক বিমান চালনা সেমিনারে প্রদর্শিত কিছু প্রেজেন্টেশন স্লাইডও রয়েছে।
ছবি শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম 'ইমগুর ডটকম'-এ প্রকাশিত একটি পোস্ট অনুযায়ী, চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো চার মিটার লম্বা, ২০৩ মিলিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট এবং ওজনে প্রায় ২০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্রের নামের শুরুতে থাকা 'পিএল' (PL) মূলত 'পি লি' (Pi Li) শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ, যার চীনা অর্থ হলো 'বজ্রপাত' বা 'থান্ডারবোল্ট'।
ফাঁস হওয়া প্রেজেন্টেশন স্লাইড অনুযায়ী, পিএল-১৬-এর পূর্বসূরি— তথা ১০ বছর আগে সার্ভিসে আসা 'পিএল-১৫' ক্ষেপণাস্ত্রটি ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে, যা তার আগের 'পিএল-১২'-এর চেয়ে দ্বিগুণ এবং সবচেয়ে পুরোনো মডেল 'পিএল-১১'-এর সর্বোচ্চ পাল্লার চেয়ে তিন গুণেরও বেশি।
হুয়াং চুং-তিং বলেন, "চীন প্রকৃতপক্ষে এমন একটি নতুন আকাশ যুদ্ধের অস্ত্র তৈরি করতে পারে, যা যুদ্ধবিমানের অভ্যন্তরীণ সমরাস্ত্র কক্ষের জায়গা বাঁচাবে এবং জে-২০-কে আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সুযোগ দেবে—এই সাধারণ ধারণার একটি সুনির্দিষ্ট নির্ভরযোগ্যতা রয়েছে।"
তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, বর্তমানে অনলাইনে পাওয়া তথ্যগুলো পিএল-১৬-এর সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য, যেমন এর পাল্লা এবং প্রপালশন প্রযুক্তির ধরনকে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করে না। হুয়াং আরও বলেন, অনলাইনে বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত থেকে এটিও নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, পিএল-১৬ ইতিমধ্যেই ব্যাপক আকারে উৎপাদনে বা সার্ভিসে আনা হয়েছে কি না।
