ইরান আলোচনার জন্য ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফর পিছিয়ে গেল
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন দফার আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার সেই সফর পেছানো হচ্ছে বলে বৃহস্পতিবার রাতে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
হোয়াইট হাউস জানায়, ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন মার্কিন দলটি রওনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল, কিন্তু আলোচনার লজিস্টিক বা কারিগরি জটিলতার কারণে তা স্থগিত করা হয়েছে।
লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত প্যান-আরব স্যাটেলাইট চ্যানেল 'আল-মায়াদিন'-এর এক খবরের পরই হোয়াইট হাউস এই ঘোষণা দেয়। ওই খবরে বলা হয়েছিল, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানের কারণে ইরান সুইজারল্যান্ডে তাদের প্রতিনিধিদল পাঠাতে বিলম্ব করছে।
ভ্যান্স প্রথমে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে সন্দিহান ছিলেন। কিন্তু তিনিই এখন ক্রমশ এই সংঘাতে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন এবং চুক্তির পক্ষে জোরালোভাবে কথা বলছেন।
বৃহস্পতিবার তিনি হোয়াইট হাউসে উপস্থিত হয়ে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং আলোচনার সুযোগ দেওয়া প্রাথমিক চুক্তির পক্ষে সাফাই গান। এটি একটি বেশ অস্বাভাবিক পদক্ষেপ ছিল। ভ্যান্স যুক্তি দেন যে এই চুক্তিতে ইরানকে কিছু ছাড় দেওয়া হলেও, তাদের প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো পূরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, 'তারা যখন তাদের ভালো আচরণ করবে, তখন আমরাও তাদের অর্থনৈতিক স্বস্তি দেব। আর যদি তারা ভালো আচরণ করা কমিয়ে দেয়, তবে আমরাও আমাদের সুবিধা বন্ধ করে দেব।'
তবে সেই বক্তব্যের সময় ভ্যান্স নিজেই নিশ্চিত ছিলেন না যে তিনি ঠিক কখন সুইজারল্যান্ড যাবেন বা এই সপ্তাহে আদৌ আলোচনা শুরু হবে কি না। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফর পেছানোয় বিষয়টি আরও অস্পষ্ট হয়ে গেল।
যুক্তরাষ্ট্র তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার পরই ভ্যান্সের এই সফর পেছানোর ঘটনা ঘটল। এই অবরোধ তুলে নেওয়ায় কয়েক মাস পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকারগুলো আবার অবাধে চলাচল শুরু করেছে।
তবে এই প্রাথমিক চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রে, বিশেষ করে কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার কাছ থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং পুনর্গঠনে সহায়তার জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য তহবিলের প্রস্তাব দিয়ে ওয়াশিংটন ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়েছে।
পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের অনুমতি
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের এক শীর্ষ দূত যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের একটি রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ে জানান, ইরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের জন্য জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থাকে (আইএইএ) আমন্ত্রণ জানাবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও তার কর্মকর্তাদের সরাসরি আলোচনার অনুমতি দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'ভবিষ্যতে যে সামনাসামনি আলোচনা হবে, তার মানে এই নয় যে শত্রুর মতামত মেনে নেওয়া হচ্ছে।'
এটি ছিল চুক্তির বিষয়ে খামেনির প্রথম প্রতিক্রিয়া এবং এটিকে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গির একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে খামেনির বাবা (সাবেক সর্বোচ্চ নেতা) এবং কট্টরপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি আলোচনার বিরোধিতা করে আসছিলেন। বিশেষ করে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পর এই বিরোধিতা আরও তীব্র হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর সময় এক হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে নতুন এই সর্বোচ্চ নেতাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ইরানের মজুত করা উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মাত্রা অন্তত কমাতে হবে। এ ছাড়া ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না বলেও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে।
ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ কংগ্রেস সদস্যদের জানান, ইরান আইএইএ-কে তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাবে। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থান শনাক্ত করার কাজও শুরু হবে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে 'লিখিতভাবে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।' তবে আইএইএ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
উইটকফ আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের এই চুক্তিতে কোনো গোপন বা 'সাইড ডিল' নেই। তবে আইএইএ-কে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানিয়ে একটি খসড়া চিঠি তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইএইএ-এর মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসির উদ্দেশে লেখা এই চিঠির ফলেই তিনি মার্কিন পারমাণবিক পরিদর্শকদের তেহরানে নিয়ে যেতে পারবেন।
ইসরায়েলকে ভ্যান্সের কড়া বার্তা
বুধবার ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে নৈশভোজের সময় ট্রাম্প এই প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি বড় বিষয়গুলোতে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে উভয় পক্ষকে ৬০ দিন সময় দেবে।
ভ্যান্স হোয়াইট হাউসে তার মন্তব্যে এই চুক্তির বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনা নিয়ে হওয়া সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, 'আমি মনে করি না যে জনগণের কাছে আমাদের বার্তাটি বিভ্রান্তিকর ছিল।'
এ ছাড়া তিনি ইসরায়েলকে একটি কড়া সতর্কবার্তা দেন। ইসরায়েল ইরানকে কড়া হাতে দমনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিয়ে আসছিল এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঠিক আগমুহূর্তেও লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালিয়েছিল। এসব হামলা ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছিল।
ভ্যান্স বলেন, 'এই মুহূর্তে পুরো বিশ্বে ট্রাম্পই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল।'
স্বাভাবিক হচ্ছে জাহাজ চলাচল
ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যাতে কোনো 'অর্থনৈতিক বিপর্যয়' না ঘটে, সে জন্যই তিনি এই চুক্তিতে সই করেছেন। চুক্তির ফলে ইতিমধ্যে গ্যাসের দাম কমতে শুরু করেছে এবং শেয়ারবাজার চাঙ্গা হয়েছে। তবে পরবর্তী দফার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করে বাজার আবারও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স জানান, বুধবার রাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১২.৫ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল পরিবহন করা হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শিথিল করার মানে হলো—'চুক্তির প্রাথমিক পর্যায়ে সামরিক দিক থেকে আমরা আমাদের কথা রাখছি।'
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো 'ওই সাধারণ এলাকায় অবস্থান করবে, যাতে চুক্তির সব দিক সঠিকভাবে মানা হয় এবং তা পুরোপুরি কার্যকর থাকে।'
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে জাহাজ চলাচল 'স্বাভাবিক' হয়েছে। তবে তারা এ-ও যোগ করেছে যে প্রণালিটি এখনো ইরানি সামরিক বাহিনীর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পারাপারের জন্য এখনো সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
মেরিটাইম ডেটা কোম্পানি লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, চুক্তি সই হওয়ার পর বড় বড় জাহাজমালিকেরা আবার এই প্রণালি দিয়ে তাদের জাহাজ পাঠানো শুরু করেছেন। তবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঠিক কতগুলো জাহাজ প্রণালি পার হয়েছে, তার কোনো তথ্য লয়েডস দেয়নি।
লয়েডস লিস্টের এডিটর-ইন-চিফ রিচার্ড মিড এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যত অবরুদ্ধ থাকার পর ১১০ দিনের মধ্যে প্রথমবারের মতো বড় কোম্পানিগুলোর জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে পার হচ্ছে। তিনি জানান, প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দিতে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এ ছাড়া বিকল্প দুটি রুটের ধারণক্ষমতাও এই প্রণালির মূল পথের মতো এতটা বেশি নয়।
