যেভাবে এক ভয়াবহ সাইক্লোনে বিশ্বের সবচেয়ে বিরল প্রজাতির ওরাংওটাংদের ৭% নির্মূল হয়ে গেল
ইন্দোনেশিয়ায় আঘাত হানা একটি প্রলয়ংকরী সাইক্লোন ও এর ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ ভূমিধস ও বন্যায় বিশ্বের সবচেয়ে বিরল প্রজাতির ওরাংওটাংয়ের ৭ শতাংশের বেশি নির্মূল হয়ে গেছে। নতুন এক গবেষণায় এই মর্মান্তিক তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি মাসে 'কারেন্ট বায়োলজি' জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণা অনুযায়ী, গত নভেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে সাইক্লোন 'সেনিয়ার' আঘাত হানলে প্রকৃতিতে টিকে থাকা মাত্র ৮০০ 'তাপানুলি ওরাংওটাং'-এর মধ্যে প্রায় ৬০টিই মারা যায়।
গবেষকেরা বলছেন, এই সাইক্লোন চরম বিপন্ন এই ওরাংওটাংগুলোকে বিলুপ্তির আরও কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে। রাস্তাঘাট, কৃষিকাজ ও শিল্পের জন্য বন উজাড় হওয়ার কারণে ওরাংওটাংরা এমনিতেই ঝুঁকির মধ্যে ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট চরম বৈরী আবহাওয়া সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সুনামি ও দুর্যোগ প্রশমন এবং গবেষণা কেন্দ্রের মতে, সাইক্লোন সেনিয়ারের কারণে ইন্দোনেশিয়ায় ১৬ ইঞ্চির বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওই অঞ্চলের সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিপাতের একটি।
এই সাইক্লোনে এক হাজারের বেশি মানুষ মারা যায় এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। সুমাত্রা দ্বীপে ওরাংওটাংদের প্রধান আবাসস্থল—উত্তর সুমাত্রার বাতাং তোরু ইকোসিস্টেমের পশ্চিম ব্লকেও এটি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
ভূমিধসের ভয়াবহতা
গবেষকেরা স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে ২০ হাজার একরের বেশি এলাকায় ভূমিধসের ভয়াবহতা (পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষের দৃশ্যমান দাগ) শনাক্ত করেছেন, যা ওই অঞ্চলের প্রায় ১২ শতাংশ বনভূমি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, অতি বৃষ্টির কারণে মাটি অতিরিক্ত ভিজে যাওয়ায় পাহাড়ের একাংশ হঠাৎ ধসে পড়ে। এ ধরনের ধস সাধারণত কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই ঘটে। ফলে ওরাংওটাংদের পালানোর জন্য খুব সামান্যই সময় ছিল।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৫৮টি তাপানুলি ওরাংওটাং মারা গেছে, যা ওই নির্দিষ্ট এলাকার জনসংখ্যার ১১ শতাংশ এবং পুরো বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭ শতাংশ।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এটি একটি রক্ষণশীল হিসাব হতে পারে, কারণ তারা জনসংখ্যার ঘনত্বের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এই হিসাব করেছেন। এ ছাড়া সাইক্লোনের কারণে বেঁচে থাকা ওরাংওটাংদের খাদ্যাভাব বা অন্যান্য বিষয়গুলো এই গবেষণায় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
এই গবেষণার প্রধান রচয়িতা এবং ব্রুনাইয়ের 'বোর্নিও ফিউচারস'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এরিক মেইজার্ড বলেন, 'ভূমিধসের ঘটনাগুলোতে হয়তো ১২০টি পর্যন্ত প্রাণী মারা গিয়ে থাকতে পারে।' তবে সংখ্যাটি ৫৮-এর কমও হতে পারে বলে তিনি জানান।
বিলুপ্তির ঝুঁকি
তাপানুলি ওরাংওটাংদের বংশবৃদ্ধির হার খুবই ধীর। স্ত্রী ওরাংওটাংরা সাধারণত ছয় থেকে নয় বছরে মাত্র একবার বাচ্চা দেয়, যার ফলে জনসংখ্যা কমে গেলে তা আবার বাড়ানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এরা সুমাত্রাজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে। তাই একটি সাইক্লোন বা ভূমিধসও তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, দুর্যোগের পর বেঁচে থাকা ওরাংওটাংদের বংশবৃদ্ধির হার কমে গেলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
মেইজার্ড বলেন, তাপানুলি ওরাংওটাং মৃত্যুহারের সামান্য বৃদ্ধিও সহ্য করতে পারে না। প্রতিবছর ১ শতাংশের বেশি প্রাণী মারা গেলে প্রজাতিটি নিশ্চিতভাবেই বিলুপ্তির পথে এগোবে।
এই গবেষণার পর বিপন্ন এই প্রজাতি রক্ষায় ইন্দোনেশিয়া সরকারকে আরও কঠোর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রিডেরিক অটো সিএনএনকে বলেন, 'এই ওরাংওটাংগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে এর পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তার ওপর।'
তিনি বলেন, 'এই ট্র্যাজেডি যদি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে এবং সত্যিই বন উজাড় বন্ধ করা হয়, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া বনের আবাসস্থলগুলো যেখানে সম্ভব জোড়া লাগানো হয় এবং সরকার, স্থানীয় সম্প্রদায় ও শিল্প খাতকে এই প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য একজোট করা যায়—তবে হয়তো তারা এখনো বেঁচে যাওয়ার একটি সুযোগ পাবে।'
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে ফের ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে, যা তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বিশাল ঝুঁকি তৈরি করবে।
ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির প্রাইমাটোলজিস্ট আদ্রিয়ানো লামেইরা, যিনি সুমাত্রার ওরাংওটাং নিয়ে গবেষণা করেন কিন্তু এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, বলেন—ইন্দোনেশিয়া সরকারকে অবশ্যই মানুষ এবং শিল্প উভয় থেকেই ওরাংওটাংদের আবাসস্থলকে আরও ভালোভাবে রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, 'কয়েক দশক ধরে সংরক্ষণের চেষ্টা চালানোর পরও এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান ব্যবস্থা কাজ করছে না এবং এটি দেশের অনন্য প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।'
তিনি আরও বলেন, মানুষের সম্পর্কে আমাদের বোঝাপড়া বাড়ানোসহ বিভিন্ন কারণে এই ওরাংওটাংগুলোর বিশাল মূল্য রয়েছে। তিনি বলেন, 'টিকে থাকা হাতে গোনা কয়েকটি গ্রেট এপ প্রজাতির একটি হিসেবে, তাপানুলি ওরাংওটাং প্রাচীন মানব পূর্বপুরুষদের জীবন এবং মানুষ কেন ও কীভাবে আজকের এই অবস্থায় এসেছে, সে সম্পর্কে ধারণা দেয়।'
