চুক্তির খসড়া প্রকাশ: ৩০০ বিলিয়নের তহবিল, নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ বড় ছাড় পাচ্ছে ইরান
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর চুক্তি স্বাক্ষরের পর তা কার্যকর হয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দুজনেরই সমঝোতা স্মারকটিতে সই করেছেন।
সমঝোতা স্মারক হিসেবে পরিচিত ১৪ দফার এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হবে না। পাশাপাশি দেশটির 'পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের' জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে—যদিও এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অর্থ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই।
এই খসড়া চুক্তিতে তেহরানকে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত লঘু করার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, তবে স্থায়ীভাবে তুলে নেওয়া হবে না। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে প্রস্তুত করা এ সমঝোতা স্মারক পড়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
ট্রাম্প প্রশাসন একে 'পারফরম্যান্স-ভিত্তিক', অর্থাৎ শর্তসাপেক্ষ চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরান যদি তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করে, তবেই কেবল এর সুফল পাবে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রশাসন।
এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি দুই মাসের জন্য সম্পূর্ণ টোলমুক্ত করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার প্রতিশ্রুতিও নিশ্চিত করা হয়েছে চুক্তিতে।
কয়েকদিনের গোপনীয়তা শেষে বুধবার মার্কিন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের কাছে চুক্তির এই খসড়া পড়ে শোনান। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও প্রায় একই ধরনের একটি টেক্সট প্রকাশ করে।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, খসড়া চুক্তিতে ইরান স্পষ্ট সম্মতি দিয়েছে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। চুক্তিতে তেহরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের প্রসঙ্গটিও উঠে এসেছে; শর্ত দেওয়া হয়েছে—অন্তত ইরানের ভেতরেই এই ইউরেনিয়াম লঘু করতে হবে।
এর বিনিময়ে চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে ইরানের ওপর থেকে কিছু বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে তা পুরোপুরি বাতিল করা হবে না। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য ও ইরানের খসড়া অনুযায়ী, চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালিতে মাত্র ৬০ দিনের জন্য অবাধ জাহাজ চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে প্রণালিতে টোল আরোপ না করার কোনো নিশ্চয়তা এতে নেই।
লেবাননের ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধানও এই দলিলে রাখা হয়েছে। ইসরায়েল লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও চুক্তির প্রথম পয়েন্টেই জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই লেবাননে সব ধরনের সামরিক অভিযান অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।
ওবামা আমলের পারমাণবিক চুক্তিতেও ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে রাশ টানতে রাজি হয়েছিল; কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই চুক্তি থেকে বের করে নেন। অন্যদিকে ইরান বরাবরই বলে এসেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
ইরান বেশি সুবিধা পাচ্ছে?
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ চিরতরে বন্ধ করার কথা বলে ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল আমেরিকা ও ইসরায়েল। অবশ্য এই সংঘাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য বদলেছে বারবার।
কিন্তু চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের আগেই অন্তর্বর্তীকালীন এই চুক্তি যুদ্ধ থামিয়ে দিচ্ছে। তার বদলে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনার জন্য মিলছে দুই মাসের সময়।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, শুরুতেই ইরানকে বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যার বিপরীতে তেহরানের কাছ প্রাপ্তি সামান্যই।
চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ামাত্রই ইরানকে অবাধে তেল বিক্রির অনুমোদন দেওয়া এবং পরে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার মার্কিন আশ্বাস এক বিরাট ছাড়।
২০১৫ সালে বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, এই সুবিধাগুলো তার চেয়েও অনেক বড়। অথচ নিজের প্রথম মেয়াদে ওই চুক্তিকে 'ইতিহাসের নিকৃষ্টতম চুক্তি' আখ্যা দিয়ে তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনেছিলেন ট্রাম্প।
এই সমঝোতা খুব সম্ভব ওয়াশিংটনে তুমুল বিরোধিতার মুখে পড়তে চলেছে। সেইসঙ্গে এটি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় ধাক্কা। চুক্তির খুঁটিনাটি সামনে আসতেই দেশে সংবাদমাধ্যম, বিরোধী পক্ষ, এমনকি নিজের কিছু মিত্রদের থেকেও কড়া সমালোচনার শিকার হচ্ছেন তিনি।
যুদ্ধ থামবে, শুরু হবে বিস্তৃত আলোচনা
চুক্তির বেশিরভাগ শর্তই আসলে যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। সেসবের মধ্যে রয়েছে—সংঘাতের অবসান, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু এবং হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া। বিশ্বজুড়ে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ থাকায় ঐতিহাসিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল।
চুক্তির আওতায় লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী এবং ইরান-পৃষ্ঠপোষিত হিজবুল্লাহর মধ্যকার লড়াইও বন্ধ হবে। এটিই এই চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। কারণ ইসরায়েল বলেছে, তারা লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দখল অব্যাহত রাখবে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, চুক্তি মেনে ইসরায়েলকে অবশ্যই লেবাননের ভূখণ্ড ছাড়তে হবে।
বড় ছাড় পাচ্ছে ইরান
সমঝোতা স্মারকের ষষ্ঠ দফায় বলা হয়েছে, ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি 'চূড়ান্ত ও পারস্পরিক সম্মত পরিকল্পনা' প্রস্তুত করবে। চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে এর রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। এ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড় ও আইনি অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এই তহবিলে ওয়াশিংটনের কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতা থাকছে না।
একজন মার্কিন উদাহরণ দিয়ে বলেন, ইরান যদি 'ভালো আচরণ করে', তবে যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেত নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত চাইলে ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করে দিতে পারে।
এছাড়া ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশনসহ আমেরিকার নিজস্ব একতরফা সব নিষেধাজ্ঞাও বাতিল হবে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা ঠিক কবে থেকে, কীভাবে উঠবে, তার সময়সীমা নিয়ে অস্পষ্টতা এখনো কাটেনি।
১১তম দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর ইরানের অবরুদ্ধ তহবিলগুলো পুরোপুরি সচল করার দায়িত্ব নেবে আমেরিকা। বুধবার একজন মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর আলোচনা চলাকালীনই কিছু তহবিল ধাপে ধাপে ছাড় করা হবে।
এরইমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে, যাতে ইরান সহজে ও অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে।
২০২৪ সালে রপ্তানি থেকে ইরানের আয় ছিল ৪৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চীন বরাবরই ইরানের তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
৬০ দিনের আলোচনার শুরুতেই তেল বিক্রিতে ছাড় দিয়ে দরকষাকষির একটি বড় হাতিয়ার হাতছাড়া করেছে ওয়াশিংটন। ২০১৫ সালে মূল চুক্তির একদম শেষ পর্যায়ে গিয়ে ইরানের তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল।
দেশ পুনর্গঠনের জন্য ইরানকে যে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল দেওয়া হবে, তা তেহরানের জন্য বড় ভূরাজনৈতিক জয়।
