পাইপ দিয়ে পেটানো হয় ক্রিকেটার নাঈমকে, থানায় বাবাকেও হেনস্তার অভিযোগ; দুঃখ প্রকাশ সিএমপির
চট্টগ্রামে বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফেরার পথে জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হোসেনকে পুলিশের একটি টিম শারীরিকভাবে নির্যাতনের পর থানায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। ছেলের খোঁজে থানায় গেলে নাঈমের বাবাকেও হেনস্তা করা হয় বলে দাবি তাদের।
ঘটনার পর দুঃখ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এ ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে শনিবার ভোরে অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করে খুলশী থানায় মামলা করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে নিজ বাড়ি চট্টগ্রাম নগরীর চাঁদগাঁও-বহদ্দারহাট এলাকায় ফিরছিলেন নাঈম হোসেন। পথে লালখান বাজার এলাকায় তিন সদস্যের একটি পুলিশ টিম তার সিএনজি থামায়। পরে তাকে মারধর করে পুলিশের গাড়িতে না তুলে ভাড়ায় চালিত আরেকটি সিএনজিতে করে খুলশী থানায় নেওয়া হয়।
থানায় নেওয়ার পর নাঈম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন বলে জানায় পরিবার। সেখানে স্থানীয় একটি গণমাধ্যমের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
নাঈমের বড় ভাই কামরুল আলম সাব্বির অভিযোগ করে বলেন, শুরুতে পুলিশ সদস্যরা তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তল্লাশির কথা বলেন। এতে নাঈম সম্মতি দেন। কিন্তু এরপরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, "নাঈমকে সিএনজি থেকে নামিয়ে গলা চেপে ধরা হয়। পরে ডিবি পরিচয়ে থাকা একজন ব্যক্তি তাকে পাইপ দিয়ে মারধর করেন।"
সাব্বিরের দাবি, ওই সময় ডিবি পরিচয়ধারী আরও একজন ব্যক্তি সেখানে উপস্থিত ছিলেন, যা ঘটনাটিকে আরও সন্দেহজনক করে তোলে। পরে নাঈমকে আটক করে নগর পুলিশের খুলশী থানায় নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, "নাঈম বারবার তার ব্যাগ তল্লাশি করতে বললেও তাকে অমানবিকভাবে মারধর করা হয়। এতে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে এবং সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।"
পরিবার জানায়, ঘটনার পর নাঈম তার বাবাকে ফোন করে সাহায্য চান।
ছেলের আটকের খবর পেয়ে সাবেক কাউন্সিলর মাহবুবুর আলম থানায় যান। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং তাকে হেনস্তা করেন।
শনিবার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম নগরীর চাঁদগাঁও-বহদ্দারহাট এলাকায় নাঈম হোসেনের বাসায় পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে তার বাবা মাহবুবুর আলম ও বড় ভাই কামরুল আলম সাব্বির সাংবাদিকদের কাছে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
এদিকে একই দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী ক্রিকেটার নাঈম হোসেনের বাসায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় তিনি সিএমপির পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ঘটনার বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
সিএমপি কমিশনার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অপেশাদার আচরণের অভিযোগ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, খুলশী থানার এসআই (নিরস্ত্র) মো. শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং কনস্টেবল মো. রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ছাড়া ডিবি পরিচয় দিয়ে নাঈম হোসেনকে শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
সিএমপি কমিশনার আরও বলেন, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলে ডিবি পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি বা সোর্সের ভূমিকা নিয়েও আলাদা তদন্ত চলছে।
তিনি বলেন, "আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে অবশ্যই পেশাদার আচরণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।"
এ ঘটনায় ক্রীড়াঙ্গন ও স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। পরিবার জানিয়েছে, তারা ন্যায়বিচার চান এবং দোষীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে যাবেন।
এদিকে ঘটনার বিস্তারিত জানাতে শনিবার বিকেল ৪টার দিকে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার কথা রয়েছে ক্রিকেটার নাঈম হোসেনের।
