যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ফুটবলকে কেন ‘সকার’ বলা হয়?
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের কাছে ফুটবল মানেই জীবন। কিন্তু ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের দুই সহ-আয়োজক দেশে এই খেলাটির নাম একেবারেই ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এই খেলা পরিচিত 'সকার' নামে। কিন্তু কেন? আর এই শব্দটি কি ফুটবলপ্রেমী অন্য দেশগুলোর বিরক্তির কারণ?
স্টেফান সিমানস্কির ভাষায়, 'আমার শৈশব কেটেছে ইংল্যান্ডে, তখন "সকার" শব্দটার বেশ চল ছিল।'
১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে বেড়ে ওঠা মিশিগান ইউনিভার্সিটির এই ইমেরিটাস অধ্যাপক জানান, 'ফুটবল' বনাম 'সকার' বিতর্কটি তার কাছে সবসময়ই অদ্ভুত ঠেকেছে।
'আমি বন্ধুদের জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম—"তোমাদের কি মনে আছে? হয়তো আমার স্মৃতি প্রতারণা করছে। এই শব্দ নিয়ে কি কখনো কোনো সমস্যা ছিল?" এ নিয়ে আমি অনেকের সাথেই কথা বলি। সবাই-ই একমত হলো—১৯৭০-এর দশকে এই শব্দটি নিয়ে কোনো সমস্যাই ছিল না।'
সিমানস্কির এই কৌতূহল একসময় গবেষণায় রূপ নেয়।
তিনি জানান, শুরুর দিকে ফুটবল ছিল মূলত 'অভিজাতদের' (পশ) খেলা। '১৮৬৩ সালে ইংল্যান্ডে যারা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তারা সবাই ছিলেন অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট এবং অভিজাত পাবলিক স্কুলের ছাত্র।'
এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় জন এম কানিংহাম লিখেছেন, ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের নিয়মে খেলা এই ক্রীড়াটি সেসময় 'অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল' নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে।
এই নামটি আরেক জনপ্রিয় খেলা রাগবি থেকে একে আলাদা করতেও সাহায্য করেছিল।
সিমানস্কি বলেন, 'ততদিনে দুটি খেলার উদ্ভব হয়েছে। সে সময় একটির নাম ছিল রাগবি ফুটবল, অন্যটি অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল।'
ব্রেকার, রাগার, সকার
১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকে ধনী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে একটি প্রবণতা দেখা যায়। তারা বড় শব্দকে ছোট করে তার শেষে '-আর' (-er) যোগ করতেন। এক ধরনের 'স্ল্যাং' তৈরি করছিলেন তারা।
'তাই "ব্রেকফাস্ট" বলার বদলে তারা বলতেন "ব্রেকার" (brekker)।'
রাগবির ক্ষেত্রে এই সূত্র খাটিয়ে তারা খেলাটির নাম দিলেন 'রাগার' (rugger)।
তাহলে 'সকার' শব্দটার জন্ম হলো কীভাবে?
সিমানস্কি বলেন, এ নিয়ে একটি তত্ত্ব আছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, 'এ ব্যাপারে কেউই শতভাগ নিশ্চিত নয়।'
মনে করা হয়, সেই উদ্ভাবনী শিক্ষার্থীরা 'অ্যাসোসিয়েশন' (association) শব্দের মাঝখান থেকে 'soc' অংশটুকু নিয়ে এর শেষে '-er' বসিয়ে 'সকার' (soccer) শব্দটির জন্ম দেন।
'নিশ্চিত করে কেউ বলতে না পারলেও, সবাই অন্তত এটুকু নিশ্চিতভাবে জানে যে শব্দটির উৎপত্তি অক্সফোর্ড থেকে। শব্দটি যে সেখানকার ছাত্রদেরই বানানো, তার প্রমাণ হিসেবে অনেক নথিপত্র রয়েছে।'
কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে সকারের বিস্তার
ক্রীড়া ইতিহাসবিদ অ্যান্ডি মিচেল দেখিয়েছেন, ১৮৮৫ সালের শেষের দিকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্তের স্কুল ম্যাগাজিনগুলোতে অন্তত তিনবার 'সকার' (soccer বা socker) শব্দটি ছাপা হয়েছিল।
নিজের ব্লগ স্কটিশ স্পোর্ট হিস্ট্রি-তে মিচেল লিখেছেন, 'আমার ধারণা, "সকার" ও "রাগার" ততদিনে মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। এমনকি ওই একই বছর (১৮৮৫) অন্য কোনো অজানা প্রকাশনায় শব্দগুলো আগেই ছাপার অক্ষরে জায়গা করে নিয়েছিল।'
সময়ের পরিক্রমায় 'socker' বানানটি হারিয়ে যায়, টিকে থাকে কেবল 'soccer'।
খেলাটি যখন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন এই শব্দও অন্য মহাদেশে পাড়ি জমায়। এখন অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডায় হরহামেশাই 'সকার' শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে 'ফুটবল' বলতে বোঝায় আমেরিকান ফুটবলকে।
'সবকিছুই আসলে একই সুতোয় গাঁথা,' বলেন সিমানস্কি। 'আমেরিকান সংস্করণটি এসেছে রাগবি থেকে, কিন্তু এতে সকারেরও বেশ কিছু উপাদান রয়েছে।'
'খেলা দুটো কাজিনের মতো। ঠিক এ কারণেই ১৮৮০ ও ১৮৯০-এর দশকে যখন "সকার" শব্দটি তৈরি হয়, ঠিক সেই সময়েই আমেরিকান ফুটবলও জনপ্রিয়তা পায়।'
সিমানস্কি ও তার সহকর্মী সিলকে-মারিয়া ওয়াইনেকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলো 'ফুটবল' শব্দটি বেশি পছন্দ করলেও ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত তারা 'সকার' শব্দটিও দেদারসে ব্যবহার করেছে।
তবে কালের বিবর্তনে 'ফুটবল' শব্দটিই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।
সিমানস্কি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার সময়ও এই দুই শব্দের প্রসঙ্গ উঠে আসে। 'আমেরিকানদের একটা প্রবণতা হলো, "সকার" শব্দটি মুখে এলেই তারা ক্ষমা চেয়ে বলে—"দুঃখিত, আমি ফুটবল বোঝাতে চেয়েছি।" তাদের ধারণা, এই শব্দটা শুনলে ব্রিটিশদের আঁতে ঘা লাগে।'
'তাদের এই ধারণা একেবারে ভুল নয়। অনেকেই বিরক্ত হয়।'
'ক্ষমা চাওয়ার এই ভদ্রতাটুকু আমার বেশ ভালো লাগে। তবে আমি তাদের বলি—"এটা একটা নিখাদ ইংরেজি শব্দ, নিঃসঙ্কোচে ব্যবহার করো।'"
