অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অগ্রাধিকার: মে মাসে ভারতের জ্বালানি রপ্তানিতে বড় ধস
চলমান ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিত করার মরিয়া প্রচেষ্টা এবং জ্বালানি পরিশোধনাগারগুলোর (রিফাইনারি) নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের কারণে গেল মে মাসে ভারতের জ্বালানি রপ্তানি গত প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে।
জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ভারত থেকে ডিজেল, পেট্রল এবং জেট ফুয়েলসহ বিভিন্ন পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি – দৈনিক গড়ে প্রায় ৮ লাখ ৭৮ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে। এটি ২০২২ সালের অক্টোবরের পর থেকে সর্বনিম্ন এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩১ শতাংশ কম।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমূজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে ভারতসহ বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানির স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তাদের রপ্তানি সাময়িকভাবে সীমিত করার মাধ্যমে এই যুদ্ধের কারণে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা যেন উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে।
ভারতের এই রপ্তানি হ্রাসের একটি বড় কারণ হলো— অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া। ভারতে এলপিজি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জ্বালানি, যা দেশের কোটি কোটি মানুষ রান্নার কাজে ব্যবহার করেন। যুদ্ধের আগে ভারত তার প্রয়োজনীয় এলপিজির প্রায় ৯০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করত।
কেপলারের মডেলিং এবং রিফাইনিং ম্যানেজার সুমিত রিতোলিয়া বলেন, "উৎপাদনের এই পরিবর্তনের ফলে রপ্তানিযোগ্য তেলের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যার মধ্যে পেট্রল এবং গ্যাসঅয়েল (ডিজেল) রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে।"
ভারতের তেল মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা গত সপ্তাহে জানিয়েছেন, দেশটির শোধনাগারগুলো গত মাসে এলপিজি উৎপাদন বাড়িয়ে দৈনিক রেকর্ড ৫২ হাজার টনে উন্নীত করেছে, যা গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি নয়াদিল্লি গত চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গ্যাসোলিন রপ্তানির ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে, যা সামগ্রিক জ্বালানি রপ্তানির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
ভারতের বৃহত্তম জ্বালানি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, মে মাসের মাঝামাঝিতে দেশের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত তাদের শোধনাগারের একটি ইউনিট বন্ধ করার পর, সাধারণত বিদেশে রপ্তানি করা হতো এমন কিছু জ্বালানি ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। এই বিশাল শিল্প স্থাপনাটি মূলত স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যেই এখন কাজ করছে।
এদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এবং থাইল্যান্ডের মতো এশিয়ার অন্য দেশগুলো নিজেদের জ্বালানি সংকট সামাল দিতে শুরুর দিকে রপ্তানি সীমিত করার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তার ফলে তাদের নিজস্ব মজুদ অনেক বেড়ে গেছে। এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর সেসব দেশের সরকার পুনরায় কিছু আন্তর্জাতিক বিক্রির অনুমতি দিতে শুরু করেছে, যা ভারতীয় জ্বালানি পণ্যের ওপর বৈশ্বিক চাহিদা কিছুটা কমাতে সাহায্য করেছে।
