ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় ইথিলিন সংকট, জাপানে খাবার টেবিল থেকে ‘হারিয়ে যেতে পারে’ কলা
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার ফলে জাপানে কলা সরবরাহ ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে সংকট তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশটিতে কলার বাজারে প্রভাব পড়তে পারে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, জাপান উষ্ণমণ্ডলীয় এই ফল সবুজ অবস্থায় আমদানি করে এবং পরে ইথিলিন গ্যাসে ভরা কক্ষে রেখে পাকিয়ে বাজারে সরবরাহ করে। কিন্তু ন্যাফথা-নির্ভর ইথিলিন গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই প্রক্রিয়ায় চাপ তৈরি হচ্ছে।
উল্লেখ্য, জাপানের অর্থনীতি ৯০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
গত বছর জাপান প্রায় ১০ লাখ টন কলা আমদানি করেছিল, যা দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্য। জাপান বানানা ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ইইজি আকাশি জানান, চলতি বছরে ন্যাফথার মজুত প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে, কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়েছে।
তার ভাষ্যমতে, এটি গত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর ঘাটতি।
আকাশি বলেন, 'দাম বাড়তে পারে, তবে আমরা সরবরাহ সংকট এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। পুরো কলা শিল্প স্থিতিশীল সরবরাহ বজায় রাখতে একযোগে কাজ করছে।'
তবে বর্তমানে এখনও জাপানের দোকানগুলোতে কলা পৌঁছাচ্ছে এবং কিছু আমদানিকারক দুই থেকে তিন মাসের মতো ইথিলিন মজুত নিশ্চিত করতে পেরেছেন বলে জানান আকাশি। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাদের ওপর জ্বালানিসংক্রান্ত বাড়তি খরচ—যেমন পরিবহন, প্যাকেজিং ও শিপিং—গ্রাহকদের ওপর চাপানোরও চাপ রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জাপানে গড়ে একটি পরিবার ২০২৫ সালে প্রায় ৫,২০০ ইয়েন (প্রায় ৩৩ মার্কিন ডলার) কলার পেছনে ব্যয় করেছে। টোকিওতে খুচরা বাজারে গত বছর কলার দাম ৪.৪ শতাংশ বেড়েছে এবং ২০২২ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাটা কলা পাকানোর জন্য ইথিলিন অপরিহার্য; এটি ছাড়া কলা নরম বা মিষ্টি হয় না এবং শেষ পর্যন্ত পচে যেতে পারে। অ্যাভোকাডো ও কিউই ফলও ইথিলিন দিয়ে পাকানো হয়। তবে সেগুলোর ক্ষেত্রে গ্যাসের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম।
ইথিলিন সরবরাহ সংকটের বাইরেও ন্যাফথার ঘাটতির প্রভাব জাপানের বিভিন্ন শিল্পে ছড়িয়ে পড়ছে। স্ন্যাকস কোম্পানি 'ক্যালবি' আলু চিপসসহ অন্যান্য পণ্যের প্যাকেজিংয়ে সাদা-কালো নকশা ব্যবহার শুরু করেছে, কারণ ন্যাফথা থেকে উৎপন্ন রেজিন-নির্ভর কালি সরবরাহ কমে গেছে।
জাপানের এই দুর্বলতার মূল কারণ হিসেবে দেশটির নিজস্ব তেল সম্পদের অভাব এবং আন্তর্জাতিক পাইপলাইনের অনুপস্থিতিকে দায়ী করা হচ্ছে। সমুদ্রপথে বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ায় হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দ্বীপদেশটির বিশেষায়িত পেট্রোকেমিক্যাল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে দূরবর্তী একটি ভূরাজনৈতিক সংঘাত এখন সাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
তবে জাপান সরকার উৎপাদক ও ভোক্তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, আগামী বছর পর্যন্ত দেশীয় চাহিদা মেটাতে জাপানের পর্যাপ্ত ন্যাফথা মজুত রয়েছে।
এই সংকটের কারণে ফল পাকানোর কোম্পানিগুলো বিকল্প ইথিলিন উৎসের সন্ধান করছে। ভার্জিনিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ক্যাটালিটিক জেনারেটরস' ইতোমধ্যে কর্নসহ বিভিন্ন ফিডস্টক থেকে ইথিলিন উৎপাদনকারী যন্ত্র জাপানের বিভিন্ন ব্যবসায় পাঠানো শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন জাপানে একজন পরিবেশক খুঁজছে।
'ফার্মইন্ড' জানিয়েছে, তাদের ইথিলিন মজুত দ্রুত কমে আসছে এবং তারা নতুন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীর সন্ধান করছে। কোম্পানিটির এক মুখপাত্র জানান, সংশ্লিষ্ট খরচ কিছু ক্ষেত্রে প্রায় দশগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, 'এভাবে চলতে থাকলে জাপানের খাবার টেবিল থেকে কলা হয়তো হারিয়ে যেতে পারে।'
