ক্যানসার চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি, নতুন ইনজেকশনে টিউমার নির্মূলের প্রমাণ পেলেন গবেষকরা
ক্যানসারের বিরুদ্ধে নতুন ধরনের এক ইনজেকশনের পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পেয়েছেন চিকিৎসকেরা। তারা বলছেন, ত্রিমুখী কার্যক্ষমতাসম্পন্ন এই ইনজেকশন কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পুরো টিউমারই দূর করে দিতে সক্ষম হয়েছে, যা 'অভূতপূর্ব' সাফল্য।
১১টি দেশে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় এমন রোগীদের এই ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাদের শরীরের অন্যান্য অংশেও ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছিল কিংবা চিকিৎসার পর আবারও ফিরে এসেছিল। এছাড়া প্রচলিত অন্যান্য চিকিৎসাতেও তাদের রোগের উন্নতি হচ্ছিল না।
গবেষণায় ব্যবহৃত অ্যামিভ্যান্টাম্যাব নামের এই ইনজেকশনটি এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগীর টিউমারের আকার কমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানান, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব দেখা গেছে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে বলেও জানান তারা।
লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চ-এর বায়োলজিক্যাল ক্যানসার থেরাপিবিষয়ক অধ্যাপক এবং রয়্যাল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের ক্যানসারবিষয়ক পরামর্শক কেভিন হ্যারিংটন বলেন, "যেসব রোগীর ক্যানসার কেমোথেরাপি ও রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাভিত্তিক চিকিৎসা—কোনোটির প্রতিই আর সাড়া দিচ্ছিল না, তাদের ক্ষেত্রে এমন শক্তিশালী ফলাফল সত্যিই নজিরবিহীন।"
তিনি বলেন, এমন একদল রোগীর ওপর এ পরীক্ষা চালানো হয়েছে, যাদের জন্য চিকিৎসার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। তাই এ ধরনের ইতিবাচক ফলাফল সত্যিই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কেভিন হ্যারিংটন আরও বলেন, "এই চিকিৎসা পদ্ধতি প্রতি বছর হাজার হাজার রোগীর উপকারে আসতে পারে।"
গবেষণার সম্পূর্ণ ফলাফল আজ রোববার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসারবিষয়ক সম্মেলন 'আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজি'র (অ্যাসকো) বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হবে।
ট্রায়ালে মাথা ও গলার ক্যানসারে আক্রান্ত ১০২ জন রোগীকে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়। মাথা ও গলার ক্যানসার বিশ্বে ষষ্ঠ সর্বাধিক সাধারণ ক্যানসার হিসেবে পরিচিত। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৩ জন রোগীর টিউমার হয় ছোট হয়ে যায়, নয়তো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমারের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং ১৫ জনের টিউমার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়।
গবেষকেরা জানান, ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও এই ইনজেকশন একই ধরনের আশাব্যঞ্জক ফল দেখিয়েছে।
জনসন অ্যান্ড জনসন উদ্ভাবিত অ্যামিভ্যান্টাম্যাব বর্তমানে প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে। এর বেশিরভাগই ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে হলেও বৃহদান্ত্র, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে।
নতুন এই ইনজেকশনটি ক্যানসারের বিরুদ্ধে মূলত তিনটি উপায়ে কাজ করে। এটি প্রথমত ইজিএফআর (এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর) নামের একটি প্রোটিনের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করে—যা টিউমারের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করে। দ্বিতীয়ত, এটি এমইটি নামের একটি জৈবিক পথকে প্রতিরোধ করে—যে পথের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ প্রায়ই চিকিৎসার প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারে। তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে।
গবেষকেরা আরও জানান, এই পরীক্ষায় এমন মাথা ও গলার ক্যানসারে রোগীদের ওপর চালানো হয়েছিল, যাদের ক্যানসার হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি)–সম্পর্কিত ওরোফ্যারিঞ্জিয়াল স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তাদের মতে, বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এইচপিভি-জনিত নয় এমন মাথা ও গলার ক্যানসারের চিকিৎসা করা সাধারণত আরও কঠিন। ফলে এই রোগীদের ক্ষেত্রে এমন অগ্রগতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যামিভ্যান্টাম্যাব গ্রহণকারী রোগীরা চিকিৎসা শুরু করার পর গড়ে ১২ দশমিক ৫ মাস বেঁচে ছিলেন। অথচ তাদের ক্যানসারের ধরন এমন ছিল, যেখানে প্রচলিত চিকিৎসা আর কাজ না করলে রোগীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সাধারণত খুবই কম থাকে। সেই প্রেক্ষাপটে এই সময়কালকে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
