বিশ্বের ইউরেনিয়াম সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করছে যারা
বিশ্বজুড়ে এখন স্থিতিশীল বিদ্যুৎ এবং কম কার্বনযুক্ত জ্বালানির খোঁজে চলছে নানা তৎপরতা। এর ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ পুনরায় তার হারানো গতি ফিরে পাচ্ছে। আর এ কারণেই পারমাণবিক চুল্লির প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম আবার সবার আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি পরিসংখ্যানে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের বার্ষিক ইউরেনিয়াম উৎপাদনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বিশাল ব্যবধানে শীর্ষ সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে কাজাখস্তান। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কানাডা ও নামিবিয়ার মতো দেশগুলো দ্রুত তাদের উৎপাদন বাড়িয়েছে।
বৈশ্বিক ইউরেনিয়াম সরবরাহে কাজাখস্তানের আধিপত্য
২০২৪ সালে কাজাখস্তান ২৩ হাজার ২৭০ টন ইউরেনিয়াম উৎপাদন করেছে। এটি বৈশ্বিক উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি। দেশটিতে বেলেপাথরের বড় ইউরেনিয়াম খনির পাশাপাশি অল্প খরচের 'ইন-সিটু রিকভারি' নামের খনন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সাধারণ খনন কাজের তুলনায় এই পদ্ধতি সস্তা এবং এতে শ্রমিকের প্রয়োজনও কম হয়।
রাষ্ট্র-সমর্থিত উৎপাদক কোম্পানি 'কাজাটমপ্রম' গত এক দশকে খুব দক্ষতার সঙ্গে এই উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করেছে। শুধু তাই নয়, ইউরেনিয়াম মজুতের দিক দিয়েও কাজাখস্তান বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
মহামারির সময় কাজাখস্তানের উৎপাদনে ভাটা পড়লেও, ইউরেনিয়ামের চাহিদা এবং দাম বাড়ার কারণে ২০২৪ সাল নাগাদ তাদের উৎপাদন আবারও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
কানাডা ও নামিবিয়ার উৎপাদন বৃদ্ধি
২০২৪ সালে কানাডা বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এ বছর তাদের উৎপাদন বেড়ে ১৪ হাজার ৩০৯ টনে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে খনি বন্ধ হওয়া এবং দুর্বল বাজার পরিস্থিতির কারণে ২০২০ সালে তাদের উৎপাদনে ধস নেমেছিল। কিন্তু 'সিগার লেক' এবং 'ম্যাকআর্থার রিভার'-এর মতো বড় প্রকল্পগুলো পুনরায় চালু হওয়ায় তাদের উৎপাদন দ্রুতগতিতে ঘুরে দাঁড়ায়।
নামিবিয়াও ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৩৩৩ টন ইউরেনিয়াম উৎপাদন করে বড় সরবরাহকারী হিসেবে তাদের অবস্থান শক্ত করেছে। বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল ইউরেনিয়াম সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নামিবিয়া। বিশাল উন্মুক্ত খনি এবং পারমাণবিক জ্বালানির বাড়তি চাহিদার কারণে বৃদ্ধি পাওয়া বিদেশি বিনিয়োগই তাদের এই উত্থানে সহায়তা করেছে।
ঘুরে দাঁড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরেনিয়াম উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ইউরেনিয়ামের দাম কমে যাওয়ায় দেশীয় খননকাজ আর্থিকভাবে অলাভজনক হয়ে পড়ে। ফলে সে বছর তাদের উৎপাদন নেমে গিয়েছিল মাত্র ৬ টনে।
তবে ইউরেনিয়ামের বাড়তি দাম এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে তৈরি হওয়া ভূরাজনৈতিক উদ্বেগের কারণে এই খাত আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। এছাড়া রাশিয়ান ইউরেনিয়াম আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞাও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা পুনর্গঠনে তাদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
২০২০ সালের প্রায় শূন্য উৎপাদন থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরও, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ২৬০ টন ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পেরেছে। এর বিপরীতে কাজাখস্তান উৎপাদন করেছে ২৩ হাজার টনেরও বেশি। এই বিপুল ব্যবধান চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বৈশ্বিক পারমাণবিক জ্বালানির বাজার এখনও অল্প কয়েকটি সরবরাহকারী দেশের ওপর ঠিক কতটা নির্ভরশীল।
