সংঘাতময় এলাকায় যৌন সহিংসতার জন্য ইসরায়েলকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করল জাতিসংঘ
সংঘাতময় এলাকায় যৌন সহিংসতার জন্য দায়ী রাষ্ট্রগুলোর 'কালো তালিকা'য় ইসরায়েলের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে জাতিসংঘ। এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে তেল আবিব।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন গুতেরেসের কার্যালয় থেকে প্রকাশিতব্য এই বার্ষিক প্রতিবেদনের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, 'এই মহাসচিবের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শেষ।'
কালো তালিকায় ইসরায়েলের নাম যুক্ত করার বিষয়টিকে 'অযৌক্তিক' দাবি করে ড্যানন বলেন, 'আমাদের কালো তালিকাভুক্ত করার এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে যৌন সহিংসতাকে ব্যবহারের অভিযোগ তোলার এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত আপত্তিকর। মহাসচিব এবং তাঁর দল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিথ্যা ছড়াচ্ছে। আমাদের এবং হামাসকে একই তালিকায় রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।'
জাতিসংঘে ইসরায়েলের মিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যতদিন আন্তোনিও গুতেরেস এই সংস্থার প্রধান পদে থাকবেন, ততদিন তার কার্যালয়ের সঙ্গে ইসরায়েল কোনো যোগাযোগ রাখবে না।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওরেেন মারমোরস্টাইন এক্সে লিখেছেন, 'সিআরএসভি প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংস্থাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার লজ্জাজনক ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তটি জাতিসংঘের প্রকৃত চরিত্রের আরেকটি প্রমাণ: এটি একটি রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা যা তার নিজের মূল নীতিগুলো ভুলে গেছে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইসরায়েলকে লক্ষ্যবস্তু বানানোই তাদের প্রধান কাজ।'
ইসরায়েলের এই কঠোর প্রতিক্রিয়ার জবাবে জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, 'আমাদের পক্ষ থেকে মহাসচিবের দরজা সব সময় খোলা রয়েছে।'
অন্যদিকে, নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত (স্পেশাল র্যাপোর্টার) রিম আলসালেম এই কালো তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, 'এই তালিকাভুক্তির সিদ্ধান্ত আরও অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।'
তিনি এক্সে লেখেন, 'আমি অতীতেও আমার হতাশা প্রকাশ করেছিলাম যে কেন ইসরায়েলকে এই তালিকায় রাখা হয়নি। কারণ ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ওপর ইসরায়েলের নিয়মতান্ত্রিক, ব্যাপক এবং ভয়াবহ যৌন সহিংসতার বিষয়টি বিভিন্ন স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত ও ভেরিফাইড হয়েছে।'
গত বছরের আগস্টে জাতিসংঘ জানিয়েছিল যে, ইসরায়েলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর পদ্ধতিগতভাবে যৌন সহিংসতা চালানো হচ্ছে বলে 'নির্ভরযোগ্য তথ্য' রয়েছে। কিন্তু তদন্তকারীদের সেসব কারাগারে ঢুকতে দেয়নি ইসরায়েল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা থেকে আটক হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর তীব্র নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার তথ্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা নথিবদ্ধ করেছে। এছাড়া গাজাগামী একটি ত্রাণবাহী জাহাজের আটককৃত কর্মীরা জানিয়েছেন, অন্তত ১৫টি ক্ষেত্রে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।
চলতি মাসের শুরুতে 'নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ ১৪ জন ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর ধর্ষণের লোমহর্ষক বিবরণ তুলে ধরেন। ইসরায়েল এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে পত্রিকাটির বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে জাতিসংঘ ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনে এ পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর আগে ২০২৪ সালে জাতিসংঘ প্রধান আন্তোনিও গুতেরেসকে ইসরায়েলে 'অবাঞ্ছিত' ঘোষণা করেছিল তেল আবিব।
