ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বেপরোয়া’ খরচ, এ অর্থ বাঁচাতে পারত ৮ কোটি ৭০ লাখ প্রাণ: জাতিসংঘ
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার 'বেপরোয়া' যুদ্ধে প্রতি সপ্তাহে যে ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করছেন, তা দিয়ে বিশ্বের ৮ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব ছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সংস্থার প্রধান টম ফ্লেচার।
সোমবার (২০ এপ্রিল) লন্ডনের চ্যাথাম হাউস-এ এক বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন।
ফ্লেচার সতর্ক করে বলেন, ইরানকে বোমা মেরে 'প্রস্তর যুগে' পাঠিয়ে দেওয়ার মতো সহিংস ভাষার ব্যবহার এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। তার মতে, এ ধরনের ভাষা বিশ্বের 'স্বৈরাচারী' শাসকদের একই ধরনের হুমকি ও কৌশল ব্যবহারে উৎসাহিত করে, যার মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামো ধ্বংসের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
সাবেক ব্রিটিশ কূটনীতিক টম ফ্লেচার একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিরও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশটির রাজনীতিকরা নিজেদের মধ্যে বিভাজনে জড়িয়ে পড়েছেন, যা যুক্তরাজ্যকে একটি 'রক্ষণাত্মক অবস্থানে' ঠেলে দিয়েছে।
ফ্লেচার বলেন, যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক বৈদেশিক ত্রাণ সহায়তায় কাটছাঁট এতই প্রকট যে, এই বিষয়ে দেশটির বিশ্বনেতৃত্ব দেওয়ার দাবি এখন হাস্যকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা ও জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী হিসেবে ফ্লেচার বর্তমানে এক ভয়াবহ তহবিল সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, তার দপ্তরের বাজেট প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এর পেছনে কেবল যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক সহায়তায় কাটছাঁট এবং প্রতিরক্ষা বাজেটের বাড়তি চাহিদাও বড় কারণ।
ফ্লেচার বলেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যে মূল্যস্ফীতি ২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোর ফলে সাহারা-নিম্ন আফ্রিকা ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোতে এর প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে অনুভূত হবে এবং আরও বিপুলসংখ্যক মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেবে।
তিনি বলেন, "এই সংঘাতের পেছনে প্রতিদিন ২০০ কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে। অথচ ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য আমার তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি পরিকল্পনার পুরো লক্ষ্যমাত্রা হলো ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। এই বেপরোয়া যুদ্ধের মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের খরচ দিয়ে আমরা এই অর্থের জোগান দিতে পারতাম। এখন নিশ্চিতভাবেই আমরা তা পারছি না।"
বর্তমানে ফ্লেচারের দপ্তরে ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারের তহবিল ঘাটতি রয়েছে।
টম ফ্লেচার ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্ককে 'রোলারকোস্টার রাইড' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের দলকে তিনি কিছুটা বোঝাতে পেরেছেন যে জাতিসংঘ 'কেবল একদল অযোগ্য, অকেজো ও ক্লান্ত আমলাদের আস্তানা নয়'।
তিনি বলেন, "রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রিয়েল এস্টেট পরিচালনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের যাদের সঙ্গে আমি কাজ করছি, তাঁদের বেশিরভাগেরই রিয়েল এস্টেট ব্যবসার পটভূমি রয়েছে। বিশ্বের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।"
ফ্লেচার আরও বলেন, "রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ ব্যক্তিদের কাছে সমঝোতা আসে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সব কাজ শেষ করার পর। অন্যদিকে রিয়েল এস্টেট জগতের মানুষেরা শুরুতেই হাত মেলায় এবং ভাবে 'আমি কি এই ব্যক্তিকে বিশ্বাস করতে পারি?' এরপর তারা চুক্তির দিকে এগোয়। এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর অনেক বেশি জোর দেওয়া হয় এবং দেখা হয় যে সামনের ব্যক্তিটির সঙ্গে কাজ করা যাবে কি না। তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতি কম আগ্রহী, তাই হাতে জাতিসংঘের পতাকা নিয়ে সেখানে যাওয়া খুব একটা কাজে দেয় না।"
তিনি বলেন, "রাষ্ট্র পরিচালনায় অভ্যস্ত ব্যক্তিরা নিশ্চয়তা, স্থিতিশীলতা এবং সঠিক প্রক্রিয়া পছন্দ করেন—প্রটোকল, মানচিত্র কিংবা পতাকার ক্ষেত্রে আমাদের তৈরি করা নিয়মগুলোর দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। আমরা এই শৃঙ্খলা পছন্দ করি। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে বিশৃঙ্খলা বা অনিয়ম বেশি কার্যকর। অনিশ্চয়তা তৈরি করা কিংবা বন্ধু ও প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত করে দেওয়ার মাধ্যমে তারা মনে করেন আরও ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব। দেখা যাক কী হয়।"
ফ্লেচার বলেন, "তিনি [ট্রাম্প] যদি ১৪টি যুদ্ধের অবসান ঘটান, তবে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হোক। কিন্তু যুদ্ধ শেষ করার কথা না বলে বাস্তবে তা শেষ করা প্রয়োজন।"
