কাগুজে প্রতিষ্ঠান ও ঋণ: এভাবেই ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার হাতিয়ে নেয় এস আলম
এস আলম গ্রুপ নিজের টাকায় ইসলামী ব্যাংক কেনেনি, বরং ব্যাংকটির নিজস্ব টাকাই এটি দখলে ব্যবহার করেছে।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) এক তদন্ত প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণ এটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে শিল্পগোষ্ঠীটি মূলত ঋণের টাকা ব্যবহার করেছে, যার বড় অংশই এসেছে খোদ ইসলামী ব্যাংক এবং গ্রুপটির আগে থেকে দখলে নেওয়া অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে।
এর প্রক্রিয়াটি ছিল বেশ সহজ ও সুনির্দিষ্ট। একদল কাগুজে বা ভুয়া প্রতিষ্ঠানের (শেল কোম্পানি) নামে বিপুল অংকের ঋণ নেওয়া হয়। এরপর সেই অর্থ দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার কিনে ব্যাংকের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আর একবার নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর, এই পাইপলাইন বা অর্থপ্রবাহ উল্টো দিকে চলতে শুরু করে। অর্থাৎ, ব্যাংকের মালিকানা ব্যবহার করে গ্রুপটি আরও ব্যাপক ঋণ সুবিধা নিতে থাকে এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে।
বিএফআইইউ-র প্রতিবেদনে যা বর্ণনা করা হয়েছে, তা কেবল একটি সাধারণ করপোরেট অধিগ্রহণ নয়। এটি 'রেগুলেটরি ক্যাপচার' বা নিয়ামক সংস্থাকে কবজা করার একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। যেখানে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপ ব্যাংকিং ব্যবস্থার নিজস্ব মূলধন ব্যবহার করে একটি ব্যাংক কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে সেই ব্যাংকটিকে তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বিস্তারের বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল বা চোখ বন্ধ করে রেখেছিল।
বিএফআইইউ-র তদন্তে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে চট্টগ্রামভিত্তিক এই শিল্পগোষ্ঠী ২২ জন প্রক্সি (বেনামি) শেয়ারহোল্ডার এবং সন্দেহভাজন কিছু কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে—ধীরে ধীরে ইসলামী ব্যাংকের ৭২ শতাংশ শেয়ার কুক্ষিগত করে।
শেয়ার কেনার জন্য ব্যবহৃত অর্থের একটি বড় অংশ এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আনা হয়। এই অর্থ মূলত ইসলামী ব্যাংক থেকেই নেওয়া ঋণের মাধ্যমে জোগান দেওয়া হয়।
এছাড়া, ব্যাংকের শেয়ার কেনা দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের এক লেনদেনে এস আলম গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি সচিবের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বিএফআইইউ।
এই সব তথ্যের ভিত্তিতে বিএফআইইউ সন্দেহ করছে যে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার কেনার পেছনেও এস আলমের যোগসূত্র থাকতে পারে। এটি নিশ্চিত হলে, ব্যাংকটিতে গ্রুপটির প্রকৃত মালিকানা দাঁড়াবে প্রায় ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ। তাই এস আলমের এই সম্পৃক্ততার পূর্ণ চিত্র উন্মোচনে আরও ব্যাপক ও গভীর তদন্তের সুপারিশ করেছে বিএফআইইউ।
এ ঘটনায় হাইকোর্ট ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন। আদালত জানতে চেয়েছেন, কীভাবে ২৪টি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ৮১.৯২ শতাংশ শেয়ারকে বৈধ বলা যায় এবং কেন সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা হবে না। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ক্রোক, ভোটাধিকার স্থগিত ও পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা অবরুদ্ধের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টে জমা দেওয়া ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বিএফআইইউ জানিয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের শেয়ার কেনার সাথে সম্পর্কিত নথিপত্র ও তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।
এসব নথির মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (সাবেক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক), ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, মার্চেন্ট সিকিউরিটিজ, নিউ এরা সিকিউরিটিজসহ বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত জমা ও ঋণ হিসাবের রেকর্ড, ভাউচার, অনুমোদনের চিঠি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য।
বিএফআইইউ জানিয়েছে, তারা ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পর্ষদ সদস্যদের শেয়ার কেনার এই রেকর্ডগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী: "বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ব্যাংকটির ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশ শেয়ারই এস আলম গ্রুপের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টের সাথে সংশ্লিষ্ট।"
শুরুতে সাতটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার ক্রয়
শুরুর দিকে ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কিনে একীভূত করার জন্য সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছিল, যার প্রতিটিই এস আলম গ্রুপের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।
এর মধ্যে কেবল প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনাল ৭১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মূল্যের ২ লাখ ২৩ হাজার শেয়ার কেনে। তদন্ত অনুযায়ী, এই অর্থ প্রাথমিকভাবে এস আলম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান– এস আলম সুপার এডিবল অয়েল-এর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
এই অর্থায়নের একটি অংশ মোমেন্টাম বিজনেস সেন্টার, এপিক অ্যাবল ট্রেডার্স, ইনভেনশন ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আবদুল আউয়াল অ্যান্ড সন্স (পটিয়া), নবির ট্রেডিং এবং এক্সিস্টেন্স ট্রেড এজেন্সিসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে সমন্বয় করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাউন্ট ছিল এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোর চট্টগ্রাম শাখায়। বিএফআইইউ এগুলোকে গ্রুপটির সহযোগী বা ভুয়া (কাগুজে) প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের ভাইস চেয়ারম্যান ও মনোনীত পরিচালক তানভীর আহমেদ সম্পর্কে এস আলমের ভাগিনা।
প্রথম শেয়ার ধারণ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট— এক্সেল ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং-এর হিসাবের মাধ্যমে ৬ কোটি ৪৩ লাখ শেয়ার কেনে। এই লেনদেনের অর্থ সোনালী ট্রেডার্স, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের মাধ্যমে রাউটিং বা স্থানান্তর করা হয়। এক্সেল ডায়িংয়ের পরিচালক বদরুন্নেসা এবং ওয়াহিদুল আলম এস আলমের নিকটাত্মীয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। অর্থ জোগান দেওয়া বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আবার ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় রয়েছে, যা নির্দেশ করে যে একই ব্যাংকের ঋণ ব্যবহার করে সেই ব্যাংকেরই মালিকানা কেনা হয়েছিল।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডে আর্মাডা স্পিনিং মিলসের হিসাবের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এর ৩ কোটি ৩৭ লাখ শেয়ার ক্রয় করা হয়। এই অর্থ এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল এবং এস আলম রিফাইন্ড সুগার থেকে নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি 'গ্রিন এক্সপোজ ট্রেডার্স' নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকেও ঋণ নেওয়া হয়, যাকে বিএফআইইউ এস আলমের একটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর পরিচালক জেসমিন আরশাদ হলেন এস আলমের শ্যালক মো. আরশাদের স্ত্রী।
২০১৭ সালে ইউনিক্যাপ সিকিউরিটিজের মাধ্যমে গ্র্যান্ড বিজনেস ৩ কোটি ২৫ লাখ শেয়ার কেনে, যার অর্থ এসেছিল এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে এবিসি ভেঞ্চারস কেনে ২ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার, যার অর্থায়ন করে এস আলমের আরেক সহযোগী প্রতিষ্ঠান সোনালী ট্রেডার্স।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটালের মাধ্যমে প্লাটিনাম এনডেভারস ৩ কোটি ২২ লাখ শেয়ার কেনে। এই অর্থ এস আলম স্টিলস, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, জেনেসিস টেক্সটাইলস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস, এস আলম প্রপার্টিজ এবং এস আলম অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে রাউটিং করা হয়। অর্থের একটি অংশ প্যারাডাইস ইন্টারন্যাশনালের বিও অ্যাকাউন্ট থেকেও এসেছিল, যাকে বিএফআইইউ একটি কাগুজে বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর পরিচালক মোস্তান বিল্লাহ আদিল এস আলমের ভাতিজা।
প্রাথমিক পর্যায়ে শেয়ার ধারণ করা আরেকটি প্রতিষ্ঠান—ব্লু ইন্টারন্যাশনাল—ফার্স্ট সিকিউরিটি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমে ৩ কোটি ২৩ লাখ শেয়ার কেনে। এর অর্থ স্থানান্তর করা হয় সোনালী ট্রেডার্স, চেমন ইস্পাত, এস আলম স্টিলস, এস আলম অ্যান্ড কোম্পানি, এস আলম প্রপার্টিজ এবং জেনেসিস টেক্সটাইলসের হিসাবের মাধ্যমে। এই অর্থায়নের আরেকটি অংশের সন্ধান মিলেছে প্লাটিনাম এনডেভারসের অ্যাকাউন্টে, যা একটি কাগুজে বা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান।
যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) রেকর্ড অনুযায়ী, ব্লু ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশফিকুর রহমান এস আলমের আত্মীয় এবং তার জামাতার মালিকানাধীন ইউনিটেক্স গ্রুপের একজন কর্মকর্তা।
ব্যাংক ঋণে ব্যাংকের শেয়ার দখল
তদন্তে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, ২০১৭ সালে একটি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত সহায়তায় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয় এস আলম গ্রুপ। শুরুতে যে সাতটি প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শেয়ার কেনা হয়েছে, সেগুলো পরবর্তীতে এমন কিছু কোম্পানির সাথে যুক্ত হয়, যারা এই ব্যাংকের শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকে পরিণত হয়েছিল।
ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এরমধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপ ও গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় সাইফুল আলমের পাশাপাশি আছেন তার ছেলে আহসানুল আলম এবং জামাতা বেলাল আহমেদ। এছাড়া সাইফুল আলমের একাধিক ভাই এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরাও এসব কোম্পানির মালিকানায় রয়েছেন।
ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক থেকে সবচেয়ে বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের নামে। বর্তমানে ব্যাংকটিতে এ প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণেও শীর্ষে। ২০১৭ সালে ব্যাংকের শেয়ার কেনার সময় এই কোম্পানি থেকেও অর্থ গিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণ ১৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা।
এরপর এস আলম রিফাইন্ড সুগারের খেলাপি ঋণ ১০ হাজার ২৮১ কোটি টাকা, এস আলম ভেজিটেবল অয়েলের ১০ হাজার ১১৩ কোটি, সোনালী ট্রেডার্সের চার হাজার ৮৫৩ কোটি এবং এস আলমের মা চেমন আরার নামে করা কোম্পানি চেমন ইস্পাতের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৫৯২ কোটি টাকা। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের তিনটি থেকেই শেয়ার ক্রয়ের সময় অর্থ গিয়েছে।
এছাড়া শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের মধ্যে আরও রয়েছে আহসানুল আলমের মালিকানাধীন ইনফিনিয়া সিআর স্ট্রিপস, যার খেলাপি ঋণ দুই হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলসের খেলাপি ঋণ দুই হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, কর্ণফুলী ফুডসের এক হাজার ৭৮৩ কোটি এবং ইনহেরেন্ট ট্রেডিং অ্যান্ড ইমপেক্সের এক হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, যেটি এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলমের আত্মীয় আনসারুল আলম চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুল কাইয়ূম ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার কারসাজি নিয়ে দায়েরকৃত রিটের আইনজীবী। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি টিবিএসকে বলেন– আইন অনুযায়ী, কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া ৫% এবং অনুমতিসহ সর্বোচ্চ ১০% বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। "এস. আলম গ্রুপ ব্যাংক কোম্পানি আইনের ১৪ ও ১৫ ধারা লঙ্ঘন করে ব্যাংকের ৭২ শতাংশের বেশি শেয়ার নিজেদের দখলে নিয়েছে।"
কাইয়ূম জানান, রিটের পেক্ষিতে হাইকোর্ট এই শেয়ারগুলোর ক্রয়-বিক্রয় এবং সংশ্লিষ্ট শেয়ারহোল্ডারদের পরিচালনা পর্ষদে বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। শিগগিরই আদালতে বিষয়টি নিয়ে শুনানি রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য হলো, অবৈধভাবে অর্জিত এই শেয়ারগুলো বাজেয়াপ্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং বাজারে বিক্রির মাধ্যমে এই গ্রুপ থেকে ব্যাংকের পাওনা অর্থ উদ্ধার করা।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বলেন, ব্যাংকে কোন গ্রুপের কত শেয়ার ধারণ রয়েছে তার তদারকি করা মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব। বিএসইসির প্রধান কাজ হলো বড় অংকের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ তথ্য প্রকাশ বা ডিসক্লোজার নিশ্চিত করা।
তিনি আরো বলেন, কোন কোম্পানির বিনিয়োগের অর্থের উৎস বা মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখার দায়িত্ব বিএফআইইউ-এর। সিকিউরিটিজ আইনের সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে বিএসইসি অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর রুমী আলী বলেন, ইসলামী ব্যাংকের শেয়ারে সরাসরি যদি এস.আলমের নিজের নামে না থাকলেও যদি প্রমাণ করা যায় যে শেয়ার কেনার অর্থ এস. আলমের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে, তবেই আইনিভাবে মালিকানা চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, আদালতে 'অর্থের প্রকৃত উৎস ও সংযোগ" প্রমাণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার উদাহরণ দিয়ে বলেন, আদালতে শেয়ারের নামধারী মালিকদের তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। যদি তারা প্রকৃত মালিক সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেয়, তবে সেটি 'পার্জারি' বা মিথ্যা সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য হতে পারে, যার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসেন খান টিবিএসকে বলেন, "ইসলামী ব্যাংকের ধারণকৃত শেয়ারগুলো একক গ্রুপের ধারণ কেন অবৈধ হবে না—এটা নিয়ে আমরা আদালতে রিট করেছি। আদালত আমাদের রিট আমলে নিয়ে অধিকতর তদন্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে তার প্রমাণও পেয়েছে বলে জেনেছি। আদালতে খুবই শিগগিরিই এনিয়ে শুনানি হবে।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। তিনি বলেন, "যদি প্রতিবেদনে থাকে এস আলমের পরিবারের সদস্যদের (ভাই, বোন বা অন্যান্য আত্মীয়) সরাসরি বা পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে এবং ব্যাংকেরই ঋণের টাকা ঘুরিয়ে এই শেয়ারগুলো কেনা হয়েছে তা যদি আদালতে প্রমাণিত হয়। তবে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।"
