শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ইরানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের বৈঠক
তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আলোচনার জন্য কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে বসেছেন ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সোমবার (২৫ মে) সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই দ্রুত কোনো বড় ধরনের অগ্রগতির সম্ভাবনাকে কিছুটা নাকচ করে দেওয়ার পর এই সফরটি অনুষ্ঠিত হলো।
এর আগে নয়াদিল্লিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, অন্য কোনো 'বিকল্প' পথে হাঁটার আগে যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিকে সফল হওয়ার সব সুযোগ দিতে চায়। তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক ইস্যুতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা শুরু করার বিষয়ে টেবিলে একটি "বেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব" রয়েছে। রুবিও বলেন, "আশা করি আমরা এটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারব।"
সোমবার ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ এক দীর্ঘ পোস্টে জানান, ইরানের সাথে আলোচনা "ভালোভাবে" এগোচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে নতুন করে হামলা চালানো হবে। তিনি লিখেন, "এটি হয় সবার জন্য একটি গ্রেট ডিল হবে, নতুবা কোনো চুক্তিই হবে না।" ওই পোস্টে তিনি আরও বেশি আরব ও মুসলিম দেশকে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এ সই করার আহ্বান জানান। ট্রাম্প বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতারকে অবিলম্বে এতে সই করার তাগিদ দেন এবং তার এই অনুরোধকে বাধ্যতামূলক বলে অভিহিত করেন। ট্রাম্পের এই পোস্টের বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার তেহরানে এক সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বলেন, অনেক বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে, তবে তার মানে এই নয় যে "আমরা চুক্তিতে সই করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।"
রয়টার্সকে ব্রিফ করা কর্মকর্তা জানান, দোহার আলোচনায় প্রধানত হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চুক্তির অংশ হিসেবে জব্দ করা ইরানি তহবিল ছাড়ের বিষয়ে আলোচনার জন্য ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও এই প্রতিনিধিদলে রয়েছেন।
বাঘাই জানান, সম্ভাব্য সমঝোতা স্মারকটি ১৪ দফার। এটি মূলত যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নৌ-অবরোধ শেষ করার ওপর আলোকপাত করছে, যার বিনিময়ে ইরান ওই কৌশলগত নৌপথে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেবে। তিনি আরও জানান, আলোচনায় এখনো পারমাণবিক ইস্যুটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদি প্রাথমিক রূপরেখা চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়, তবে পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ইরানের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি রোধ করা। তবে তেহরান বরাবরই এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে।
এদিকে শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও ইরান দাবি করেছে, তারা একটি নতুন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি "শত্রুভাবাপন্ন" স্টিলথ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ড্রোনটি কোত্থেকে এসেছিল তা উল্লেখ না করে ফার্স নিউজ এজেন্সি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, "এটি আমাদের পক্ষ থেকে একটি সংকেত যে পারস্য উপসাগরের আকাশে আর কোনো স্টিলথ ড্রোন প্রবেশ করতে পারবে না।"
অমীমাংসিত বিষয়সমূহ
মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বিবরণ নেই। তবে তিনি পরিষ্কার করেন যে ইরান কোনো জাহাজের কাছ থেকে 'টোল' নেবে না। তবে ওমানের সাথে স্বাক্ষরিত প্রোটোকল অনুযায়ী নেভিগেশনাল সুবিধা এবং পরিবেশ রক্ষার সেবার জন্য নির্দিষ্ট ব্যয় দিতে হতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজ যাতায়াত করলেও এখন হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ পার হতে পারছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি সোমবার জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আইআরজিসি-এর অনুমতি নিয়ে ৩২টি নৌযান ও ৫টি তেলের ট্যাঙ্কার প্রণালি অতিক্রম করেছে। তারা পুনরায় জানিয়েছে যে বিপ্লবী গার্ডের সাথে সমন্বয় ছাড়া কোনো জাহাজকে চলাচল করতে দেওয়া হবে না।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং জ্বালানি, সার ও খাদ্যের উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তির আশায় তেলের দাম ৪ শতাংশেরও বেশি কমে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
উভয় পক্ষ সমঝোতার কথা বললেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন দেশের ব্যাংকে জব্দ থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তেল বিক্রির অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে এখনো মতপার্থক্য কাটেনি।
অন্যদিকে ট্রাম্প, যার জনপ্রিয়তা তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যিনি নিজ দেশে যুদ্ধকালীন ক্ষমতা খর্ব করার চাপের মুখে রয়েছেন, তিনি বারবার যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনার কথা তুলে ধরছেন।
ভিন্ন দুটি সূত্রের তথ্য মতে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তার ঘনিষ্ঠদের বলেছেন, ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রভাব এখন খুব সামান্য।
