জ্বালানি বাজারে চীনের নতুন চাল: বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের অন্যতম উৎস এখন কয়লা
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায়— নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় জয়ী পক্ষগুলোর একটি হলো কয়লা। গ্যাসের প্রাপ্যতা কঠিন এবং দাম চড়া হয়ে ওঠায় – বিশ্বজুড়ে কয়লার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কার্বন নিঃসরণ সংক্রান্ত সমস্ত উদ্বেগ বা চিন্তাকে ছাড়িয়ে এখন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিরাপত্তাই প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। তবে কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনেই যে কয়লা তার হারিয়ে যাওয়া জনপ্রিয়তা ফিরে পেয়েছে, তা নয়। বিভিন্ন রাসায়নিক এবং বিশেষত সার তৈরির কাঁচামাল বা ফিডস্টক হিসেবেও কয়লার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।
সম্প্রতি চীনের প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ এই কয়লা ব্যবহারকারী দেশে বছরের প্রথম চার মাসে কয়লা উৎপাদন কিছুটা কমেছে। একই সাথে আমদানি এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে, যা মূলত ২০২৫ সালে শুরু হওয়া একটি প্রবণতারই ধারাবাহিকতা। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখে মনে হতে পারে চীন হয়তো কয়লার ব্যবহার কমিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে এশিয়ার এই পরাশক্তিতে কয়লার ব্যবহার এখনো পুরোদমে চলছে। আসলে এই জ্বালানিটি এখন কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ধাতব শিল্পেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। চীন এখন গ্যাস থেকে শুরু করে পেট্রোকেমিক্যাল—সবকিছু তৈরিতেই কয়লা ব্যবহার করছে। আর এখন ভারতও একই পথ অনুসরণের পরিকল্পনা করছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানায়, 'পেট্রোচায়না' কয়লা পাথর (কোল রক) থেকে গ্যাস উত্তোলনের একটি প্রকল্প তৈরি করছে, যার লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩ হাজার কোটি (৩০ বিলিয়ন) ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদন করা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই উত্তোলন প্রযুক্তিটি মূলত শেল ফর্মেশনে ব্যবহৃত প্রযুক্তির মতোই। এতে আরও বলা হয়, চীনই একমাত্র দেশ যেখানে তথাকথিত 'রক গ্যাস' বা পাথর থেকে গ্যাস উত্তোলনের জন্য 'হাইড্রোলিক ফ্র্যাকচারিং' প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভিন্ন এক খবরে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে চীনের 'কয়লা থেকে রাসায়নিক' (কোল-টু-কেমিক্যালস) শিল্পখাত বড় ধরনের প্রণোদনা পেয়েছে। রয়টার্সের তৎকালীন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এই খাতের শেয়ারদরে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উল্লম্ফন হয়েছে। পেট্রোলিয়াম বা খনিজ তেল ব্যবহার না করেই সার এবং অন্যান্য পেট্রোরাসায়নিক পণ্য উৎপাদনে—কয়লা ব্যবহারের সক্ষমতাকে বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করায় এই খাতের শেয়ারের দাম বাড়ে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায়—তেলের দাম এখন চড়া। এই অবস্থায়, কয়লা এখন একটি মূল্যবান বিকল্প হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, বিশ্ববাজারে কয়লার দাম বাড়া সত্ত্বেও তরল জ্বালানির (তেল) চেয়ে এটি এখনো অনেক সাশ্রয়ী। তাছাড়া রয়টার্স মার্চের মাঝামাঝি সময়ে জানিয়েছিল যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীনের বাজারে কয়লার দাম আসলে উল্টো কমেছে। তাই ভারত যে কয়লা থেকে রাসায়নিক তৈরির এই চীনা সাফল্য নিজেদের দেশেও আনতে চাইবে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।
নিজেদের ব্যবহৃত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল ভারত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই জ্বালানি সংকটের মধ্যে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে পড়েছে। তবে ভারতের রয়েছে প্রচুর কয়লার মজুত, যা দেশটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়েও আরও বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারে। আর ভারত এখন ঠিক সেই কাজটিই করছে বলে এই সপ্তাহে ব্লুমবার্গের কলামিস্ট হাভিয়ের ব্লাস তাঁর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনের অনেক 'নেট-জিরো' বা কার্বনমুক্ত বিশ্ব গড়ার প্রচারক প্রায়ই বলে থাকেন যে, নিজস্ব বা দেশীয় জ্বালানি হলো জ্বালানি নিরাপত্তার গ্যারান্টি। এই বিষয়ে তারা সঠিক, যদিও তারা যখন 'দেশীয় জ্বালানি' বলেন, তখন আসলে তারা অন্য দেশের (যেমন চীন) কাছ থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি দিয়ে উৎপাদিত জ্বালানিকে বোঝান। আর চীন এই সমস্ত যন্ত্রপাতি তৈরি করতেও কয়লাই ব্যবহার করে। তবে বাস্তবতা হলো, দাম বা সরবরাহের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই—এমন একটি আমদানিনির্ভর বাজারের ওপর নির্ভর করার চেয়ে বিদ্যুৎ, সার এবং অন্যান্য রাসায়নিক উৎপাদনে নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে অনেক ভালো বিকল্প।
চীনের কয়লা থেকে রাসায়নিক তৈরির এই শিল্পটি বেশ অনন্য, যা ব্লুমবার্গের কলামিস্ট ব্লাস তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। এর মানে হলো ভারতের পক্ষে চীনের এই সাফল্য অনুলিপি বা রেপ্লিকেট করা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। এর একটি কারণ হলো ভারতের কয়লার বৈশিষ্ট্য ভিন্ন এবং এই কয়লাকে রাসায়নিকে রূপান্তর করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হবে বলে এই জ্বালানি কলামিস্ট জানিয়েছেন।
অন্য কারণটি হলো, চীন এই উত্তোলন প্রযুক্তি উন্নত করতে প্রায় ২০ বছর সময় ব্যয় করেছে। ভারত এই কয়লা থেকে রাসায়নিক শিল্প চালুর জন্য ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে, তবে ব্লাসের মতে তা পর্যাপ্ত নাও হতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শেষ হয়ে যখন প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম আবার যুদ্ধপূর্ব স্তরে নেমে আসবে—তা যখনই হোক না কেন—তখন এই খাতের কোম্পানিগুলোকে তাদের পণ্য প্রতিযোগিতামূলক রাখতে – আরও অনেক বেশি সহায়তার প্রয়োজন হবে।
তা সত্ত্বেও, মোদি সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সাড়ে ৭ কোটি টন কয়লাকে সার, অন্যান্য রাসায়নিক এবং প্লাস্টিকে রূপান্তর করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যাতে দেশীয় উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো যায় এবং আমদানির বিশাল ব্যয় কমানো সম্ভব হয়। সরকার এই প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোর জন্য অর্থায়ন করবে এবং কাঁচামালের স্থানীয় সরবরাহ নিশ্চিত করবে—যা যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট কয়লার বৈশ্বিক চাহিদাকে আরও বাড়িয়ে দেবে এবং কার্বনমুক্ত বা নেট-জিরো বিশ্ব গড়ার পরিকল্পনাকে আরও ধূলিসাৎ করবে।
ব্লুমবার্গের ব্লাস তাঁর প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, চীনের এই কয়লা থেকে রাসায়নিক শিল্পখাতে বছরে ৩৮ কোটি টন কয়লা ব্যবহৃত হয়। তিনি উল্লেখ করেন, এই শিল্পখাতটি যদি কোনো দেশ হতো, তবে তা হতো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কয়লা ব্যবহারকারী। আর এখন ভারতও নিজের দেশে কয়লা ব্যবহারের এমন একটি বিশাল শিল্প গড়ে তুলতে চাইছে।
গত বছর চীন ৪২০ কোটি ঘনমিটার রক গ্যাস উৎপাদন করেছে। উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে এটিকে কেবলমাত্র শুরু এটা বলাই যায়। কয়লা থেকে রাসায়নিক তৈরির এই শিল্পটি দিন দিন বড় হচ্ছে এবং স্পষ্টতই অন্যান্য দেশকেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের প্রভাবের কথা চিন্তা না করে—দেশীয় উৎসের দিকে ঝুঁকতে অনুপ্রাণিত করছে।
এশিয়ার এই কয়লা থেকে রাসায়নিক শিল্পের বিকাশ খুব স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, সংকটের সময়ে এবং চড়া দামের বাজারে জ্বালানির ক্ষেত্রে প্রধান অগ্রাধিকার সবসময় নির্ভরযোগ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্যই থাকবে। সেক্ষেত্রে কার্বন নিঃসরণের বিষয়টি অনেক পেছনে বা তৃতীয় সারিতে পড়ে থাকে।
