চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘অন্য পথে’ বোঝাপড়া করবে যুক্তরাষ্ট্র: মার্কো রুবিও
ইরানের সঙ্গে একটি কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আর তা না হলে দেশটির সঙ্গে 'অন্য পথে' বোঝাপড়া করা হবে। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রুবিও বলেন, বিকল্প পথ খোঁজার আগে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সফল হওয়ার সব রকম চেষ্টা চালাবে। এর আগে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি তার প্রতিনিধিদের ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে তাড়াহুড়ো না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
রুবিও বলেন, 'আলোচনার টেবিলে এখন বেশ শক্ত একটি প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক বিষয়ে একটি বাস্তবসম্মত, সময়ভিত্তিক আলোচনায় প্রবেশ করা। আমরা আশা করছি, এটি সফল হবে।'
এর আগের দিন ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছিলেন, 'একটি চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে ইরানি জাহাজের ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর থাকবে।'
এ বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে যুক্ত তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির কিছু অংশে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বাধা দিচ্ছে। এর মধ্যে আটকে থাকা তহবিল ছাড়ের বিষয়ে তেহরানের দাবিও রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি শান্তি চুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এমন আশায় সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৬ শতাংশ কমে দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এর আগে শনিবার একটি বক্তব্যে ট্রাম্প চুক্তির প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শান্তি চুক্তির একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
তবে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াসহ বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব ছেড়ে দেওয়ার দাবিগুলো উল্লেখযোগ্য।
আলোচনার মূল বাধা কোথায়?
ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলোচনাধীন বিষয়গুলোর একটি ধারণা দিয়েছেন।
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র নৌ-অবরোধ তুলে নিলে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে এবং তাদের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরাতে 'নীতিগতভাবে' রাজি হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা—ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি চুক্তির এই খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছেন।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই 'নীতিগত' চুক্তির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো নিশ্চিতকরণ বা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মার্কিন ওই কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটন চাইছে প্রথমেই প্রণালি খুলে দেওয়া হোক এবং মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হোক। পারমাণবিক পদক্ষেপের বিস্তারিত নিয়ে আলোচনা করতে আরও সময় লাগবে।
ইরান তাদের মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাতে রাজি হয়নি—এমন জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, 'প্রশ্নটা হলো কীভাবে সেটা করা হবে, তা নিয়ে।'
রোববার প্রশাসনের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচকেরা ৬০ দিন সময় পাবেন।
ইরানি সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে, আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলোতে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য 'বাস্তবসম্মত ফর্মুলা' খুঁজে বের করা হতে পারে। এর মধ্যে জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থার তত্ত্বাবধানে ইউরেনিয়ামের মাত্রা কমানোর বিষয়টিও থাকতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরেই পারমাণবিক অস্ত্র বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তারা বলে আসছে, বেসামরিক কাজের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে তারা যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
সমালোচকদের ওপর বিরক্ত ট্রাম্প
যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে। এমনকি তার যুদ্ধ বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমানোর জন্য কংগ্রেসও চেষ্টা চালিয়েছে। এসব কারণে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা এই যুদ্ধ শেষ করতে চুক্তির সম্ভাবনার কথা বারবার প্রচার করছেন ট্রাম্প।
শান্তি আলোচনা পরিচালনার বিষয়ে যারা ট্রাম্পের সমালোচনা করছেন, তাদের কড়া জবাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
রোববার ট্রাম্প লেখেন, 'আমি যদি ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি করি, তবে তা ভালো ও সঠিক চুক্তিই হবে... তাই ওই সব ব্যর্থ মানুষের কথা শুনবেন না, যারা এমন কিছু নিয়ে সমালোচনা করছে, যা সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না।'
বর্তমান যুদ্ধবিরতিকে মজবুত করে এমন কোনো চুক্তি হলে তা বিশ্ববাজারে স্বস্তি আনবে। তবে এটি তাৎক্ষণিকভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের সমাধান করবে না, যে সংকটের কারণে ইতিমধ্যেই জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে গেছে।
এপ্রিলের শুরুতে স্থগিত হওয়ার আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বোমা হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে।
ইসরায়েল লেবাননেও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে এবং কয়েক লাখ মানুষকে তাদের বাড়িঘর ছাড়তে বাধ্য করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছে।
