‘কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভালো খবর আসতে পারে’: ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কো রুবিওর আভাস
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত নিয়ে 'কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই' একটি বড় ঘোষণা আসতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
বর্তমানে ভারত সফরে থাকা রুবিও এই ঘোষণাকে বিশ্বের জন্য একটি 'ভালো খবর' বলে উল্লেখ করে ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ওয়াশিংটন একটি ৬০ দিনের বর্ধিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, 'আমি মনে করি, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্ব হয়তো একটি ভালো খবর পেতে যাচ্ছে।'
রুবিও জানান, সম্ভাব্য এই চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগগুলোর সমাধান করা হবে। গত ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান এই প্রণালিটি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছে।
প্রস্তাবিত এই শান্তি চুক্তিতে বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং ইরান তাদের তেল বিক্রি করতে পারবে।
গত শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ ট্রাম্প লেখেন, 'যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং আরও কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায়।'
অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে। আটকে থাকা বিদেশি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং তেল বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে দেশটি।
চুক্তি স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, তাতে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে, ইরান অবাধে তেল বিক্রি করতে পারবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
এই চুক্তি যুদ্ধের আরও বিস্তার ঠেকাবে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপর চাপ কমাবে। তবে, এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পারমাণবিক দাবিগুলোকে পূরণ করে এমন একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে কিনা তা এখনো অস্পষ্ট।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা খসড়া চুক্তিতে যা রয়েছে তার একটি বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেছেন, যার অনেকটাই আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অন্যান্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এই বিষয়গুলো এখনো ইরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। তবে তেহরানও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে।
চুক্তিতে কী রয়েছে
উভয় পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবে, যা ৬০ দিন কার্যকর থাকবে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে এর মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।
এই ৬০ দিনের সময়ে হরমুজ প্রণালি খোলা থাকবে এবং সেখানে কোনো ধরনের শুল্ক নেওয়া হবে না। পাশাপাশি ইরান প্রণালিতে স্থাপন করা মাইন সরিয়ে ফেলতে সম্মত হবে, যাতে জাহাজগুলো অবাধে চলাচল করতে পারে।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেবে এবং কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, যাতে ইরান অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, এটি ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় সুবিধা হবে। তবে তিনি বলেন, এতে বৈশ্বিক তেলের বাজারও উল্লেখযোগ্য স্বস্তি পাবে।
মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরান যত দ্রুত মাইন সরিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে, তত দ্রুত অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, এই চুক্তিতে ট্রাম্পের মূল নীতি হলো—'কাজের বিনিময়ে স্বস্তি'।
ইরান চেয়েছিল অবিলম্বে জব্দ অর্থ ছাড় এবং স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। কিন্তু মার্কিন পক্ষ জানিয়েছে, বাস্তব ছাড় না দেওয়া পর্যন্ত তা সম্ভব হবে না।
পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে এখনো আলোচনা বাকি
খসড়া সমঝোতা স্মারকে ইরানের পক্ষ থেকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা না করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত করা এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনায় বসার কথাও রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তা জানান।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে মৌখিকভাবে জানিয়েছে যে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করা এবং পারমাণবিক উপাদান ত্যাগের বিষয়ে কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের সময়কালে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ অর্থ ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি হবে। তবে এসব পদক্ষেপ কেবল একটি চূড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর কার্যকর হবে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনী ৬০ দিনের এই সময়জুড়ে অঞ্চলে অবস্থান করবে এবং কেবল চূড়ান্ত চুক্তি হলে সেগুলো প্রত্যাহার করা হবে।
চমকপ্রদ বিষয় হলো, খসড়া সমঝোতা স্মারকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ শেষ হবে।
শনিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই শর্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তিনি চুক্তির আরও কিছু বিষয় নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তবে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, তিনি অত্যন্ত সম্মানজনক ও সংযতভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, এটি কোনো 'একতরফা যুদ্ধবিরতি' হবে না। যদি হিজবুল্লাহ পুনরায় অস্ত্র সংগ্রহ বা হামলার চেষ্টা করে, তাহলে ইসরায়েলকে তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, 'হিজবুল্লাহ শান্ত থাকলে ইসরায়েলও শান্ত থাকবে।'
নেতানিয়াহুকে তার ডাকনাম ধরে উল্লেখ করে মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, 'বিবির নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির স্বার্থও বিবেচনা করতে হয়।'
