যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে চুক্তি ‘প্রায় চূড়ান্ত’, খুলবে হরমুজ, শিগগিরই ঘোষণা: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তি চুক্তির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক 'প্রায় চূড়ান্ত' হয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া এ চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে।
তবে চুক্তিতে আর কী কী অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তা তিনি বলেননি।
শনিবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, 'চুক্তির চূড়ান্ত দিক ও বিস্তারিত বিষয় বর্তমানে আলোচনা হচ্ছে এবং শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।'
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকে কয়েক মাসের যুদ্ধ বন্ধ, ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। ইরান জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে এ প্রণালি বন্ধ রেখেছিল।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা হবে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে তেহরানকে এই উচ্চাশা ছাড়ার জন্য তেহরানের ওপর চাপ দিয়ে আসছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে স্বস্তির আশা
ভারত সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, রোববার এ বিষয়ে আরও খবর আসতে পারে।
ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ সমঝোতা স্মারক অনুমোদন করলে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির কাছে পাঠানো হবে।
তবে ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, এক বা দুটি ধারা নিয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়েছে।
তাসনিম এক সূত্রের বরাতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বাধা সৃষ্টি অব্যাহত রাখলে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হবে না।
বর্তমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি স্থায়ী করতে চুক্তি হলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তাৎক্ষণিকভাবে কমবে না। এ সংকটের কারণে জ্বালানি, সার ও খাদ্যের দাম বেড়েছে।
ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বর্তমানে প্রায় ১০৩ দশমিক ৫০ ডলার, যা ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর সময়ের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।
গত সপ্তাহে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির প্রধান বলেন, যুদ্ধ এখনই শেষ হলেও ২০২৭ সালের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রান্তিকের আগে হরমুজ প্রণালিতে পূর্ণ মাত্রায় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হবে না।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস শনিবার রাতে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানি তেলের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, খসড়া চুক্তিতে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে না—এমন প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্য তুলে ধরলেও ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতেই যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে।
তবে ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না।
দেশটি বলছে, বেসামরিক প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার তাদের রয়েছে। যদিও তারা যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।
লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন
ইরানের ফার্স সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, খসড়া চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরান বা তাদের মিত্রদের ওপর হামলা চালাবে না। এর বিনিময়ে ইরানও তাদের বিরুদ্ধে আগাম হামলা চালাবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেবে।
তবে ইসরায়েলের প্রভাবশালী রাজনীতিক বেনি গান্টজ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়া ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত ভুল হবে। বর্তমানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লেবাননে অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী।
ইসরায়েলি গণমাধ্যম এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেছেন, লেবাননসহ সব ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার স্বাধীনতা ইসরায়েল বজায় রাখবে। এতে ট্রাম্প সম্মতি দিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
তবে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে শুধু লিখেছেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার ফোনালাপ 'খুব ভালো' হয়েছে।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন হতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি
রয়টার্সকে সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রস্তাবিত কাঠামোটি তিন ধাপে বাস্তবায়িত হবে—আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি, হরমুজ প্রণালির সংকট সমাধান এবং একটি বিস্তারিত ও স্থায়ী চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৩০ দিনের সময়সীমা সময়সীমা নির্ধারণ, যা প্রয়োজনে বাড়ানো যেতে পারে।
পাকিস্তানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ প্রত্যাহার করার পরপরই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।
মার্কো রুবিও বলেন, এ কাঠামোতে রাজি হলে প্রণালিটি 'সম্পূর্ণ উন্মুক্ত' হবে এবং সেখানে 'কোনো টোল থাকবে না'।
তবে ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।
একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার আওতায় বিশ্বজুড়ে জব্দ থাকা ইরানের কিছু অর্থ চুক্তির প্রথম ধাপেই ছাড় করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক গ্রহণ করলে শুক্রবার মুসলমানদের ঈদুল আজহার ছুটি শেষ হওয়ার পর আরও আলোচনা হতে পারে।
'কিছু বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করা প্রয়োজন', বলছে ইরান
যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় চাপের মুখে থাকা ট্রাম্প শুক্রবার বলেন, তিনি এ সপ্তাহান্তে অনুষ্ঠেয় ছেলের বিয়েতে যোগ দেবেন না।
ওয়াশিংটনে অবস্থানের কারণ হিসেবে তিনি ইরানের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, শনিবার ট্রাম্প সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, মিসর, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা ট্রাম্পকে এই সমঝোতা কাঠামোয় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই শনিবার বলেন, 'এই সপ্তাহে বিরোধ মীমাংসার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে, তবে এখনও কিছু বিষয় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা করা প্রয়োজন।'
বাঘাই বলেন, ইরানের জাহাজ চলাচলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তবে তাদের অগ্রাধিকার হলো নতুন মার্কিন হামলার হুমকি ও লেবাননের সংঘাতের অবসান।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, যুদ্ধবিরতির সময় ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তাদের সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার যুদ্ধ শুরু করলে এর পরিণতি সংঘাতের শুরুর সময়ের চেয়ে 'আরও শক্তিশালী ও তিক্ত' হবে।
