ইরান যুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাসায়নিকের তীব্র সংকট: বিপাকে খাদ্য, ধাতু, কাগজ, কম্পিউটার চিপ খাত
পারস্য উপসাগরে যুদ্ধ এবং চীনের নতুন রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম হঠাৎ করেই আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে এবং এমন এক রাসায়নিকের প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার ওপর খাদ্য, ধাতু, কাগজ, কম্পিউটার চিপ এবং বিশুদ্ধ পানির জন্য পুরো বিশ্ব নির্ভরশীল।
সালফিউরিক অ্যাসিড পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাসায়নিক। এটি তামা ও নিকেলের মতো অ-লৌহজাত ধাতু গলানো ও পরিশোধনের সময় অথবা তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের উপজাত সালফার পোড়ানোর মাধ্যমে উৎপাদিত হয়।
এই অ্যাসিড এতটাই শক্তিশালী যে হার্ডওয়্যারের দোকানে বোতলজাত অবস্থায় অতিরিক্ত শক্তিশালী ড্রেন পরিষ্কারক হিসেবে বিক্রি হওয়া এই পদার্থ একটি ইস্পাতের তারকেও গলিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু এর চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে এটি ভারী শিল্পে ব্যবহৃত হয়, যেখানে অসংখ্য পণ্য ও উপাদান তৈরির সরবরাহ ব্যবস্থার উঁচু স্তরে এর ব্যবহার রয়েছে।
সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবহার করা হয় ফসফেট সার উৎপাদনে, পাথর থেকে তামা ও অন্যান্য ধাতু আলাদা করতে, কাঠের মণ্ড প্রস্তুত করতে, ইস্পাত পরিষ্কার করতে, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে এবং রাবারকে টেকসই করতে। পৌরসভাভিত্তিক পানি পরিশোধন ব্যবস্থাও সালফিউরিক অ্যাসিডের ওপর নির্ভরশীল, একইভাবে ব্যাটারি ও অর্ধপরিবাহী চিপ প্রস্তুতকারকরাও এর ওপর নির্ভর করে। মিষ্টি পানীয়তে টক স্বাদ যোগ করা সাইট্রিক অ্যাসিড এবং টুথপেস্টে খসখসে ভাব আনা সিলিকাও এটি ব্যবহার করেই তৈরি হয়।
সালফিউরিক অ্যাসিড অত্যন্ত ক্ষয়কারী হওয়ায় এটিকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল বলে জানান কুনাল সিনহা। তিনি আগে খনিশিল্প প্রতিষ্ঠান গ্লেনকোরে সালফিউরিক অ্যাসিড ব্যবসা পরিচালনা করতেন এবং বর্তমানে ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যালরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। সিনহা বলেন, ব্যবহারকারীরা সাধারণত খুব বেশি সালফিউরিক অ্যাসিড মজুত করে রাখেন না, কারণ এটি পরিচালনার জন্য বিশেষ সতর্কতা এবং সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ট্যাংকের প্রয়োজন হয়।
তিনি বলেন, 'তাদের পাইপলাইন ও মজুত ব্যবস্থায় সাধারণত কয়েক সপ্তাহের, ভাগ্য ভালো হলে হয়তো এক মাসের সরবরাহ পরিকল্পনা থাকে। রেল ধর্মঘট হোক বা হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাক—যেকোনো সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নই সমস্যা তৈরি করে।'
বিশ্বের সালফারের একটি বড় অংশ পারস্য উপসাগরের তেল শোধনাগার এবং গ্যাস কারখানা থেকে আসে এবং বর্তমানে প্রণালীতে তা অবরুদ্ধ হয়ে আছে। সালফার বাজারের খোঁজখবর রাখা প্রতিষ্ঠান একুইটি কমোডিটিজের পরিচালক ফ্রেডা গর্ডন বলেন, এর ফলে সার বাজার এবং খাদ্য সরবরাহের প্রতি হুমকি তৈরি হওয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম সালফার উৎপাদনকারী দেশ চীন এই মাসে রপ্তানি সীমিত করেছে, যা দাম বাড়িয়েছে এবং সহজলভ্যতাকে আরও সংকটে ফেলেছে।
গর্ডন বলেন, 'তারা সত্যিই খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। তারা নিশ্চিত করতে চায় যে সারের দাম যেন স্থিতিশীল থাকে।'
আর্গাস প্রতিষ্ঠানের সারমূল্য বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান সারাহ মার্লো বলেন, চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে চিলি ও ইন্দোনেশিয়ার।
আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বোমা হামলা শুরু করার সময় থেকেই ইন্দোনেশিয়ায় সালফারের দাম বাড়তে শুরু করেছিল এবং এরপর থেকে তা ৮০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ধাতু শিল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে অধিকাংশ সালফার আমদানি করা দেশটির নিকেল খনিগুলো বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও স্টেইনলেস স্টিল তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতুটির উৎপাদন কমাতে শুরু করেছে।
বিশ্বের শীর্ষ তামা উৎপাদনকারী দেশ চিলিতে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সালফিউরিক অ্যাসিডের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। চিলি বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি সালফিউরিক অ্যাসিড আমদানি করে এবং বিশাল আকরিক স্তূপ থেকে তামা আলাদা করতে এটি ব্যবহার করে।
মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতেও দাম ব্যাপক বেড়েছে। বিশ্লেষক ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো ওয়াল স্ট্রিট ও ওয়াশিংটনে সতর্ক সংকেত দিচ্ছে।
শিল্পসংগঠন সালফার ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রেইগ জর্গেনসন বলেন, 'পরিস্থিতি এখন এমন এক সংকটপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও কৃষিপণ্য—যেমন ফসফেট—উৎপাদন ধীর হয়ে পড়ছে।'
যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। দেশটির তেল শোধনাগার ও অভ্যন্তরীণ ধাতু গলানোর কারখানাগুলো যে চাহিদা পূরণ করতে পারে না, তার বড় অংশ আসে মেক্সিকো ও কানাডা থেকে। কানাডার আলবার্টার তেলবালুর এলাকায় কম দামের সময় সালফার বিশাল পিরামিড আকৃতিতে মজুত করে রাখা হয়েছিল।
তবুও বিদেশে সালফারের ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যদি বৈশ্বিক তামা উৎপাদন কমে যায় এবং দাম বর্তমান রেকর্ড উচ্চতার চেয়েও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে বড় তথ্যকেন্দ্রগুলোতে ভেতরের সব তার, বিদ্যুৎ পরিবাহী দণ্ড, সার্কিট বোর্ড, রূপান্তরক এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের জন্য কয়েক দশ হাজার মেট্রিক টন তামা প্রয়োজন হয়। বাড়িঘরও তামার পাইপ ও তারে ভরা। এমনকি বৈদ্যুতিক গাড়ি আসার আগেও একটি সাধারণ আমেরিকান গাড়িতে এক মাইলেরও বেশি তামার তার থাকত।
যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের যেসব শোধনাগার কানাডা ও ভেনেজুয়েলার মতো উচ্চ সালফারযুক্ত অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করে, তারা পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানির পাশাপাশি এমন একটি উপজাত উৎপাদন করে যার চাহিদাও এখন সমানভাবে বেড়েছে।
খনিশিল্পের ধনকুবের রবার্ট ফ্রিডল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান আইভানহো মাইনস সম্প্রতি আফ্রিকার সবচেয়ে বড় তামা গলানোর কারখানা চালু করেছে কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে, যা মধ্যপ্রাচ্যের অ্যাসিডের ওপর নির্ভরশীল একটি শীর্ষ তামা উৎপাদনকারী দেশ।
আইভানহো মাইনসের ত্রৈমাসিক ফলাফল প্রকাশের সময় বুধবার ফ্রিডল্যান্ড বলেন, কামোয়া-কাকুলা গলন কারখানাটি সালফিউরিক অ্যাসিডের বাড়তি দামের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ডলার আয় করছে।
একটি দক্ষ গলন কারখানা নির্মাণ করতে, যা বেশি অ্যাসিড উৎপাদন করে, বেশি খরচ হয়েছে বলে সাক্ষাৎকারে জানান ফ্রিডল্যান্ড। তিনি বলেন, 'এখন আমরা তার প্রতিদান পাচ্ছি।'
