‘পারমাণবিক বোমার মতোই গুরুত্বপূর্ণ’: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনড় ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে শান্তি চুক্তির খসড়া আদান-প্রদান চলছে। সর্বশেষ মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে তেহরান কী বলে, তার অপেক্ষায় রয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যেই ইরানের কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো বারবার জোর দিয়ে বলছে যে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটা তাদের কাছে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শনিবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসমাইল বাঘাই সাংবাদিকদের জানান, ইরান এখনো ওয়াশিংটনের প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'আমরা আমাদের কাজ নিজেদের গতিতেই করি, কোনো সময়সীমা বা ডেডলাইনের তোয়াক্কা করি না।'
আলোচনায় কোনো অগ্রগতির আভাস না মিললেও, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান যে আগের চেয়ে অনেক কড়া হয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন দেশটির কর্মকর্তারা। এমনকি এই প্রণালির গুরুত্ব এখন তাদের কাছে পারমাণবিক কর্মসূচির সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার জন্য কয়েক দশক ধরে ইরানকে নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে হয়েছে।
ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং প্রয়াত ইব্রাহিম রাইসির মেয়াদের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবর বলেন, ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্ব বছরের পর বছর ধরে প্রণালির এই 'আশীর্বাদকে অবহেলা' করে এসেছে।
শুক্রবার সংবাদ সংস্থা মেহর-কে তিনি বলেন, 'বাস্তবে এটি একটি পারমাণবিক বোমার সমতুল্য সক্ষমতা। কারণ আপনার হাতে যখন এমন ক্ষমতা থাকে, যা দিয়ে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করা সম্ভব, তখন সেটি আসলেই এক বিশাল শক্তি।'
মোখবর জানান, 'এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা প্রণালির যে নিয়ন্ত্রণ পেয়েছি, তা কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই হাতছাড়া করবে না।' বর্তমান প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরেফ বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। এর মধ্যে তেল বিক্রি কমানোর জন্য দেওয়া নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে, যা প্রতি সপ্তাহে আরও কঠোর হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, 'নিষেধাজ্ঞা নামক কোনো সমস্যার মুখোমুখি আমরা আর হব না। কারণ, ট্রাম্প ও শত্রুদের সাম্প্রতিক আচরণের কারণে প্রণালির ওপর আমাদের অধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি আরও মজবুত হয়েছে। তাই আমার মনে হয় না যে আমরা আর কোনো বড় ধরনের সমস্যায় পড়ব।'
আরেফ আরও বলেন, ইরানের ব্যবস্থাপনা এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং এই অঞ্চলের সব দেশ এতে লাভবান হবে।
'আমরা ব্যবহার করতে না পারলে আর কেউ পারবে না'
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিষয়টিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। তারা বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর আগে মদিনার কাছে ওহুদ যুদ্ধে মুসলমানদের হারের তুলনা করেছে। ওই যুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশ অমান্য করে কৌশলগত পাহাড়ি গিরিপথ ছেড়ে দেওয়ায় পেছন দিক থেকে আক্রমণের সুযোগ পেয়েছিল শত্রুরা।
শনিবার সকালে ওফোগ চ্যানেলের উপস্থাপক হোসেইন হোসেইনি দর্শকদের বলেন, হরমুজ প্রণালি হলো ইরানের সেই ওহুদ গিরিপথ, যা ছেড়ে দিলে সেটি পরাজয়ের কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, 'বুদ্ধিমান ইরানিরা এই ওহুদ গিরিপথ না ছাড়ার বা ফেরত না দেওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক। প্রণালির পরিস্থিতি আর কখনোই আগের মতো হবে না; শত্রুদের অবশ্যই এটি জানা উচিত।'
যুদ্ধ শুরুর কিছুদিন পরই বাবার উত্তরসূরি হিসেবে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন মোজতবা খামেনি। তার নামে ছড়ানো একাধিক খুদে বার্তায়ও এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ২০১৭ সালে মারা যাওয়া শীর্ষ সংস্কারপন্থী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানির কয়েক দশক আগের একটি ভাষণের ভিডিও ক্লিপ প্রকাশ করে। সেখানে রাফসানজানি বলেন, কারণ ছাড়া প্রণালি বন্ধ করার হুমকি ইরান দেয় না, কারণ এই পদক্ষেপে ইরানের নিজেরও ক্ষতি হয়।
পার্লামেন্টে সাংবাদিকদের সামনে দেওয়া ওই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'আমরা সব সময় জোর দিয়ে বলেছি, পারস্য উপসাগর যখন আমরা আর ব্যবহার করতে পারব না, তখনই আমরা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করব। যদি পারস্য উপসাগর আমাদের কাজে না আসে, তবে আমরা অন্যদের জন্যও এটি অকেজো করে দেব; এটাই আমাদের নীতি।'
আলোচনা নিয়ে দেশের ভেতরে দ্বন্দ্ব
যুদ্ধের ফলে আরও বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠা কট্টরপন্থীরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার বা অন্য কোনো মূল ইস্যুতে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার ঘোর বিরোধী। কেউ কেউ বলছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমায় ধ্বংস হওয়া স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধারের বিষয়ে কোনো আলোচনাই হওয়া উচিত নয়।
পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের সদস্য আলী খেজরিয়ান শুক্রবার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত কোনো আলোচনা ইরান করছে না'।
তিনি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের পরাজয় ঢাকতেই ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক ইস্যুতে একটি সম্ভাব্য চুক্তির মিথ্যা প্রচার করছে।
সরকারপন্থী পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক মাহদি খাররাতিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তির ফলে সব নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে এবং বিনিয়োগের মাধ্যমে ইরানের উন্নয়ন হবে—এমনটা ভাবা দিবাস্বপ্ন। তার মতে, তেহরানকে আরও বেশি করে চীনের দিকে ঝুঁকতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গত সপ্তাহে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের জন্য চীনে গিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টার কারণে দেশের ভেতরে তিনিও সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পাননি।
গত এপ্রিলে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া কয়েক ডজন সদস্যের একজন হলেন কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতা মাহমুদ নাবাবিয়ান। তিনি দাবি করেছেন, প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যেন আরাগচিকে এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেন।
নাবাবিয়ান সামাজিক মাধ্যম এক্সে লেখেন, '১৫ সালের মতো একটি ব্যয়বহুল পরমাণু চুক্তির হোতাদের এই দল থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া গালিবাফ সাহেবের দায়িত্ব।'
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সই হওয়া ওই চুক্তির আওতায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করেন।
