সদস্য বহিষ্কারের 'বিধান নেই'; স্পেনকে বরখাস্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব প্রসঙ্গে ন্যাটো
উত্তর আটলান্টিক সামরিক চুক্তি (ন্যাটো) জানিয়েছে, জোটের কোনো সদস্য দেশকে স্থগিত বা বহিষ্কার করার কোনো আইনি ব্যবস্থা (বিধান) তাদের চুক্তিতে নেই। যুক্তরাষ্ট্র স্পেনকে ন্যাটো থেকে সাময়িক বরখাস্ত করার চেষ্টা করতে পারে এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) এ তথ্য জানায় এই সামরিক জোট।
এর আগে এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইলে ইরান যুদ্ধে মার্কিন অভিযানকে সমর্থন করতে ব্যর্থ হওয়া ন্যাটো মিত্রদের শাস্তি দেওয়ার জন্য বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে স্পেনকে জোট থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর ব্রিটেনের দাবির বিষয়ে বিষয়ে মার্কিন অবস্থান পুনর্বিবেচনার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান, সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাকীলীন চুক্তিতে 'সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের কোনো বিধান নেই'।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রীও এ প্রতিবেদনকে গুরুত্ব দেননি।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে বিবিসি পেন্টাগন ও যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর এবং ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করার পর মিত্ররা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকবার ন্যাটোর মিত্রদের সমালোচনা করেছেন।
এমনকি স্পেন তার ভূখণ্ডের বিমানঘাঁটি ইরানে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্পেনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে—নেভাল স্টেশন রোটা এবং মোরন এয়ার বেস।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সাংবাদিকদের বলেন, 'আমরা ই-মেইলের ভিত্তিতে কাজ করি না। আমরা আনুষ্ঠানিক নথি ও অবস্থানের ভিত্তিতে কাজ করি।'
তিনি আরও বলেন, স্পেন 'মিত্রদের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার পক্ষে, তবে তা অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে' থেকে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, যুদ্ধে আরও বেশি জড়ানো বা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বন্দর অবরোধে অংশ নেওয়া যুক্তরাজ্যের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নয়। তবে যুক্তরাজ্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের স্থাপনায় হামলা চালাতে দিয়েছে এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের বিমান ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার অভিযানে অংশ নিয়েছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশ বলেছে, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বা যুদ্ধের অবসান হলে তারা হরমুজ প্রণালি খোলা রাখতে প্রস্তুত।
গত মাসে ট্রাম্প বলেন, তিনি সবসময় ন্যাটোকে 'একমুখী রাস্তা' হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি বলেন, 'আমরা তাদের রক্ষা করি, কিন্তু তারা আমাদের জন্য কিছুই করেন না।'
ওই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে আরও জানান, ইরান যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ব্যবহার, ঘাঁটি এবং ওভারফ্লাইট অধিকার দিতে মিত্র দেশগুলোর অনীহা বা অস্বীকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে পেন্টাগনের উচ্চপর্যায়ে এই ই-মেইল চালাচালি হচ্ছে। ই-মেইলে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই ধরনের সহযোগিতা ন্যাটোর সদস্য হওয়ার 'ন্যূনতম ভিত্তি' বা বেসলাইন।
এদিকে, শুক্রবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি ন্যাটো মিত্রদের ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এই জোট 'শক্তির উৎস'।
সাইপ্রাসে এক ইইউ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'ন্যাটোর ইউরোপীয় অংশকে শক্তিশালী করতে কাজ করতে হবে।'
অন্যদিকে জার্মান সরকারের এক মুখপাত্র বলেন, স্পেনের সদস্যপদ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।
বার্লিনে এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'স্পেন ন্যাটোর সদস্য এবং আমি এমন কোনো কারণ দেখি না, যার জন্য এই অবস্থান পরিবর্তিত হবে।'
আর্জেন্টিনায় মালভিনাস নামে পরিচিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় ৮ হাজার মাইল এবং আর্জেন্টিনার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত।
দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত এই ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরির ওপর আর্জেন্টিনা দীর্ঘদিন ধরে সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টাইন বাহিনী দ্বীপগুলোতে আক্রমণ চালানোর পর এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়।
ওই ই-মেইলে আরেকটি বিকল্প হিসেবে অসহযোগী' দেশগুলোকে জোটের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রয়টার্সকে ওই কর্মকর্তা বলেন, তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের জোট ছাড়ার বা ইউরোপে ঘাঁটি বন্ধের কোনো প্রস্তাব নেই।
রয়টার্সের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলে উইলসন এই ই-মেইলের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমনটা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার ন্যাটো মিত্রদের জন্য এত কিছু করার পরেও তারা আমাদের পাশে ছিল না। যুদ্ধ বিভাগ নিশ্চিত করবে যেন প্রেসিডেন্টের কাছে নির্ভরযোগ্য বিকল্প থাকে, যাতে আমাদের মিত্ররা আর শুধু কাগুজে বাঘ হয়ে না থাকে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করে।'
