যুদ্ধ বন্ধে হচ্ছে সমঝোতা স্মারক: পরমাণু সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করবে ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে হোয়াইট হাউস। মার্কিন প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ইরানের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এখনো চূড়ান্ত কোনো সম্মতি আসেনি, তবে সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই পক্ষ এখন সমঝোতার সবচাইতে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরান তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থগিত করার প্রতিশ্রুতি দেবে; বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা ইরানের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের তহবিল ছেড়ে দিতে রাজি হবে। এছাড়া হরমোজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের ওপর উভয় পক্ষ যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তাও তুলে নেওয়া হবে।
সমঝোতা স্মারকের অনেক শর্তই একটি চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করবে। ফলে চূড়ান্ত সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়া অথবা একটি অমীমাংসিত দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।
হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরানের নেতৃত্ব বর্তমানে দ্বিধাবিভক্ত এবং বিভিন্ন উপদলের মধ্যে ঐক্য তৈরি করা কঠিন হতে পারে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা প্রাথমিক এই চুক্তিটি আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় প্রকাশ করছেন। এর আগেও আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে মার্কিন কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি সম্ভব হয়নি। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমোজ প্রণালিতে সদ্য ঘোষিত সামরিক অভিযান থেকে প্রেসিডেন্টের সরে আসার সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত আলোচনার অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করেই।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে ১৪ দফার এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করছেন। এই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, অঞ্চলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে এবং হরমোজ প্রণালি খুলে দেওয়া, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ৩০ দিনের একটি বিস্তারিত আলোচনার সময়কাল শুরু হবে। এই আলোচনা ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় হতে পারে।
এই ৩০ দিনের মধ্যে হরমোজ প্রণালিতে ইরানের নৌ-চলাচলে বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ধীরে ধীরে তুলে নেওয়া হবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে মার্কিন বাহিনী পুনরায় অবরোধ আরোপ বা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের সময়সীমা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছর দাবি করেছিল। সূত্রমতে, এটি ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে নির্ধারিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করতে চায় যাতে ইরান সমৃদ্ধকরণের শর্ত লঙ্ঘন করলে এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বেড়ে যায়। স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হলে ইরান ৩.৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্ন মাত্রার সমৃদ্ধকরণ করতে পারবে।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা করবে না। পাশাপাশি জাতিসংঘ পরিদর্শকদের হঠাৎ পরিদর্শনের অধিকার দিতে হবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দ করা অর্থ মুক্তি দেবে।
সবচাইতে আলোচিত বিষয় হলো, ইরান তাদের উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নিতে রাজি হতে পারে। তেহরান এ প্রস্তাবটি আগে নাকচ করে দিয়েছিল। একটি বিকল্প হিসেবে এই ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
মার্কো রুবিও মঙ্গলবার বলেন, "আমাদের একদিনের মধ্যেই প্রকৃত চুক্তি লিখে ফেলতে হবে এমন নয়। এটি অত্যন্ত জটিল ও প্রযুক্তিগত বিষয়। তবে আমাদের এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান দরকার যেখানে তারা কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চায় এবং শুরুতেই কী ধরনের ছাড় দিতে রাজি আছে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, যাতে আলোচনার সার্থকতা থাকে।"
তবে রুবিও ইরানের কিছু শীর্ষ নেতাকে কটাক্ষ করে 'পাগল' বলে অভিহিত করেন এবং তারা শেষ পর্যন্ত চুক্তিতে আসবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন।
