রাশিয়ার জন্য নিষিদ্ধ প্রযুক্তির ৯০ শতাংশই আসছে চীন থেকে
রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত প্রযুক্তির জন্য চীনের ওপর মস্কোর নির্ভরতা বেড়ে এখন ৯০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে গত শুক্রবার মার্কিন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
এক বছর আগেও এই হারের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষিত 'প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব' অর্জন এবং আমদানির বিকল্প অভ্যন্তরীণ উৎস তৈরির চেষ্টা সত্ত্বেও— এই নির্ভরতা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ব্লুমবার্গকে জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে পশ্চিমা দেশগুলো থেকে সরাসরি প্রযুক্তি সংগ্রহের অবশিষ্ট পথগুলোও এখন রাশিয়ার জন্য রুদ্ধ হয়ে গেছে। এই অবস্থায় বেড়েছে চীন-নির্ভরতা।
এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা— রাশিয়ার বাণিজ্যিক প্রবাহকে আমূল বদলে দিয়েছে। এটি রাশিয়াকে যেমন আরও বেশি চীনের অর্থনৈতিক বলয়ের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে, তেমনি মস্কোর ওপর বেইজিংয়ের প্রভাবও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্লুমবার্গ তাদের প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে, রাশিয়াকে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য (বেসামরিক ও সামরিক উভয়কাজে ব্যবহারযোগ্য) প্রযুক্তি এবং এমনকি যুদ্ধে ব্যবহৃত ভূ-স্থানিক তথ্য সরবরাহ করার ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা সম্পর্কে ইইউ কর্মকর্তারা সম্পূর্ণরূপেই অবগত আছেন।
তা সত্ত্বেও, বেইজিংয়ের ওপর বড় ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় সরকারগুলো এখনও দ্বিধান্বিত। মূলত চীনের পাল্টা অর্থনৈতিক প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার ভয়েই তারা এমন সতর্কতা অবলম্বন করছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক 'পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস'-এর অর্থনীতিবিদ এলিনা রিবাকোভা গত ফেব্রুয়ারিতে ডয়চে ভেলেকে বলেছিলেন, পশ্চিমের সাথে বিচ্ছেদের ফলে রাশিয়া এখন অনেকটা "চীনের অনুগত রাষ্ট্রে" পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও যোগ করেন, "চীন এখন রাশিয়ার জন্য এককভাবে বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও, চীনের মোট রপ্তানির খুব সামান্য অংশই রাশিয়ায় যায়। কিন্তু রাশিয়ার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন; তাদের জন্য চীনই এখন প্রধান বাণিজ্যিক অবলম্বন।" কিন্তু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের হিসাবে এই অংকটা আবার কমও নয়।
রাশিয়ার গাইদার ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গত বছর রাশিয়ার মোট রপ্তানির ২৭ শতাংশ ক্রয় করেছে চীন এবং রাশিয়ার আমদানির ৩৬ শতাংশের উৎসও ছিল এই দেশটি।
অথচ একই সময়ে চীনের মোট রপ্তানিতে রাশিয়ার অংশ ৩.২ শতাংশ থেকে কমে ২.৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি মেক্সিকোতে চীনের মোট রপ্তানি অংশের কাছাকাছি এবং যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ কম।
ব্রাসেলস-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'ব্রুগেল'-এর সিনিয়র ফেলো জসোল্ট দারভাস ডয়চে ভেলেকে বলেন, "রাশিয়া একটি বড় দেশ হলেও – তাদের স্বনির্ভর হওয়ার সক্ষমতা নেই। তাই তাদের এই পণ্যগুলো অন্য কোনো উৎস থেকে সংগ্রহ করতে হবে, আর সেই উৎসটি এখন ক্রমেই চীন হয়ে উঠছে।"
রিবাকোভা জানান, চীন পরোক্ষভাবে রাশিয়াকে পশ্চিমা পণ্য—বিশেষ করে বেসামরিক ও সামরিক উভয় ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য পণ্যগুলো পেতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে।
তবে প্রতিবেদনে চীনের কাস্টমস তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো রাশিয়া ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৬.৫ শতাংশ কমে ১.৬৩ ট্রিলিয়ন ইউয়ান বা ২৩৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, চীনে রুশ পণ্য রপ্তানি ৯.৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং রাশিয়ায় চীনের রপ্তানি কমেছে ৩.৪ শতাংশ।
রয়টার্সের গত আগস্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের এই শ্লথগতি ক্রেমলিনকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
রাশিয়ান সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ যেন আর না কমে—বেইজিং সফরের সময় প্রেসিডেন্ট পুতিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে এই অনুরোধ করার পরিকল্পনাও করেছিলেন। কারণ রাশিয়ার অর্থনীতি এখন এই বাণিজ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
