পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ, রপ্তানিতে বহুমুখীকরণ জরুরি: ইপিবি সহসভাপতি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সহসভাপতি হাসান আরিফ বলেছেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণে আরও পেশাদার হতে হবে।
তিনি বলেন, 'তৈরি পোশাক খাতের ওপর বাংলাদেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে বহির্বিশ্বের ধাক্কার মুখে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।'
আজ রোববার (১০ মে) চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে অনুষ্ঠিত 'ইফেক্টিভ পার্টিসিপেশন ইন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ফেয়ার' শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন৷
সেমিনারটির যৌথ আয়োজন করে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং চিটাগাং উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিডব্লিউসিসিআই)।
সিডব্লিউসিসিআই সভাপতি আবিদা মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সহসভাপতি এস এম আবু তৈয়ব ও নাসির উদ্দিন চৌধুরী, প্যাসিফিক জিন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ তানভীর, ইপিবির মহাপরিচালক বেবী রানি কর্মকার, সিডব্লিউসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি লুৎফমেলা ফরিদ এবং সংগঠনটির সাবেক সভাপতি মনোয়ারা হাকিম আলী।
হাসান আরিফ বলেন, 'বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮১ দশমিক ৫ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।' তিনি এ অবস্থাকে 'সংকুচিত রপ্তানি ঝুড়ি' হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বাজারকেন্দ্রিক ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ রপ্তানি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে যায়, এমন সময়ে যখন প্রতিযোগী দেশগুলো আরও সুবিধাজনক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি অর্জন করছে।
তিনি বলেন, 'যদি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয় বা শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তন আসে, তাহলে সীমিতসংখ্যক পণ্য ও বাজারের ওপর নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে৷'
অপ্রচলিত ও সম্ভাবনাময় খাতগুলোর প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাসান আরিফ বলেন, 'কৃষিপণ্য—বিশেষ করে ফল—রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।' তার তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, অর্থাৎ এপ্রিল পর্যন্ত ফল রপ্তানি থেকে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'শরিফা, কাজুবাদাম ও কফির মতো পণ্যে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের হার বেশি, যেখানে অনেক শিল্প এখনও আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি সহায়তার ঘোষণাও দেন ইপিবির এই সহসভাপতি। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণকারী নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ইপিবি সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে পারে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক প্রদর্শনী ও মেলাগুলোতে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ীদের তুলনামূলক কম অংশগ্রহণে হতাশা প্রকাশ করে তিনি এ অঞ্চলের রপ্তানিকারকদের এগিয়ে আনতে সিডব্লিউসিসিআইকে আরও শক্তিশালী নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
তার বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশ নেওয়ার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পেশাদারিত্বের প্রয়োজনীয়তা।
তিনি বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা কোনো ঘুরে বেড়ানোর অনুষ্ঠান নয়৷'
তিনি আরও যোগ করেন, বিদেশে কোনো প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার আগে রপ্তানিকারকদের অন্তত দুই থেকে চার মাস সময় নিয়ে সংশ্লিষ্ট বাজারের চাহিদা, ভোক্তাদের পছন্দ এবং সাংস্কৃতিক আচরণ সম্পর্কে গবেষণা করা উচিত।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, 'জাপানের বাজারের জন্য পণ্য ডিজাইনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রচলিত উজ্জ্বল ও রঙিন নকশার বদলে হালকা ও সরল রঙের ব্যবহার বেশি গ্রহণযোগ্য।'
আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসায়িক আচরণের গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। বিশেষ করে জাপানে ভিজিটিং কার্ড আদান-প্রদানের ভুল পদ্ধতি পর্যন্ত ব্যবসায়িক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ আরও কার্যকর করতে বর্তমানে থাকা ৪৬টি বার্ষিক মেলার তালিকা বাড়িয়ে ৫০টিরও বেশি করার চিন্তা করছে ইপিবি। সম্ভাব্য প্রায় ২০০টি আন্তর্জাতিক মেলা থেকে এসব আয়োজন বাছাই করা হবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণের জন্য একটি মানসম্মত কার্যপদ্ধতি প্রস্তুত করছে ইপিবি বলেও জানান হাসান আরিফ। প্রস্তাবিত এই নির্দেশিকায় রপ্তানিকারক, ইপিবি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে কর্মরত বাণিজ্য পরামর্শকদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে, যাতে মেলার আগে, চলাকালীন এবং পরে সমন্বয় আরও কার্যকর হয়।
