‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই’: ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ ডেমোক্র্যাটরা, জনসমক্ষে শুনানির দাবি
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ধারাবাহিক গোপন ব্রিফিং পাওয়ার পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে জনসমক্ষে শুনানির দাবি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল ডেমোক্র্যাট সিনেটর। তাদের অভিযোগ, হোয়াইট হাউস কেন এই যুদ্ধে জড়াল, এর লক্ষ্য কী অথবা এটি কতদিন স্থায়ী হবে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে রিপাবলিকানরা ৫৩-৪৭ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে কোন আইন বা বিতর্ক সামনে আসবে, তার নিয়ন্ত্রণ মূলত তাদের হাতেই রয়েছে। তবে গত মঙ্গলবার দুই ঘণ্টার এক রুদ্ধদ্বার ব্রিফিংয়ের পর ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইরানে স্থল সেনা মোতায়েন করার বিষয়টি ট্রাম্প নাকচ না করায় এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কানেকটিকাটের সিনেটর ক্রিস মারফি বলেন, "গোপন ব্রিফিং থেকে আমার কাছে এটিই নিশ্চিত হয়েছে, সরকারের রণকৌশল পুরোপুরি অসংলগ্ন।" তিনি আরও যোগ করেন, "বিষয়টি খুবই সহজ। সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট যদি কংগ্রেসের কাছে এই যুদ্ধের অনুমতির জন্য আসতেন, তবে তিনি তা পেতেন না; কারণ মার্কিন জনগণ কংগ্রেস সদস্যদের 'না' ভোট দেওয়ার দাবি জানাত।"
ডেমোক্র্যাটদের ভাষ্য কী?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ আইনপ্রণেতাদের দফায় দফায় ব্রিফিং দিয়ে আসছেন। যেহেতু এগুলো গোপন বৈঠক, তাই আইনপ্রণেতারা সব তথ্য প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। তবে তারা জানিয়েছেন, প্রশাসনের দেওয়া তথ্যে তারা মোটেও সন্তুষ্ট নন।
সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেন, "এই যুদ্ধের কোনো 'এন্ডগেম' (সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য) আছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট প্রায় একই নিশ্বাসে বলছেন যে যুদ্ধ শেষের পথে, আবার বলছেন এটি কেবল শুরু হলো। এটি পুরোপুরি স্ববিরোধী।"
ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন যুদ্ধের বিশাল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, "একটি বিষয় পরিষ্কার যে, ১৫ মিলিয়ন আমেরিকান যারা স্বাস্থ্যসেবা হারিয়েছেন তাদের জন্য টাকা নেই, অথচ ইরানে বোমা হামলার পেছনে প্রতিদিন এক বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে।" তার মতে, কংগ্রেসের উচিত এই যুদ্ধ তহবিলের রাশ টেনে ধরা।
ডেমোক্র্যাটদের একটি বড় অংশ আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানে সরাসরি স্থল সেনা মোতায়েনের পথে এগোচ্ছে। ব্লুমেনথাল সতর্ক করে বলেন, "মার্কিন জনগণের জানার অধিকার আছে এই যুদ্ধের প্রকৃত খরচ কত, আমাদের সন্তানদের জন্য এখানে কী বিপদ লুকিয়ে আছে এবং এই যুদ্ধ আরও বড় আকার ধারণ করার সম্ভাবনা কতটুকু।"
এরই মধ্যে ছয়জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনার তদন্ত দাবি করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন বাহিনীর ওই হামলায় অন্তত ১৭০ জন নিহত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। তবে পেন্টাগন দাবি করেছে যে তারা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালায় না।
রিপাবলিকানরা কী বলছেন?
কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানরা সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা প্রায় সবাই সর্বসম্মতভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযানকে সমর্থন জানিয়েছেন। মাত্র অল্প কয়েকজন এই যুদ্ধ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
কিছু রিপাবলিকান নেতার মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক প্রভাব দমনে এই হামলা অত্যন্ত জরুরি। তাদের যুক্তি, এই অভিযানের পরিধি সীমিত এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের প্রতি ইরানের হুমকি কমানোর জন্যই পরিকল্পিত।
হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ব্রায়ান মাস্ট গত সপ্তাহে জনসমক্ষে ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তেহরানের পক্ষ থেকে আসা 'আসন্ন হুমকি' থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করতে প্রেসিডেন্ট তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করছেন।
তবে কংগ্রেসের কোনো কোনো রিপাবলিকান সদস্য এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সাউথ ক্যারোলাইনার প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, তিনি চান না সাউথ ক্যারোলাইনার সন্তানদের ইরানের সাথে যুদ্ধে পাঠানো হোক।
কেন্টাকির রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিদিন এই যুদ্ধের কারণ ও ব্যাখ্যা পরিবর্তন করছে। তিনি লিখেছেন, "আমরা ইরান যুদ্ধের নিত্যনতুন কারণ শুনছি যার কোনটিই সন্তোষজনক নয়। 'নিপীড়িতদের মুক্ত করা' শুনতে মহৎ মনে হতে পারে, কিন্তু এর শেষ কোথায়? কয়েক দশক ধরে আমাদের বলা হচ্ছে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর খুব কাছাকাছি। যুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল শেষ উপায়, প্রথম পদক্ষেপ নয়। 'ওয়ার অফ চয়েজ' (অন্যের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ) আমার পছন্দ নয়।"
কেন এই বিতর্ক গুরুত্বপূর্ণ?
এই বিবাদ ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্টের 'ওয়ার পাওয়ারস' (যুদ্ধ ক্ষমতা) এর সীমা নিয়ে দীর্ঘদিনের পুরোনো বিতর্ককে আবারও উসকে দিয়েছে।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কেবল কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই জাতীয় নিরাপত্তা বা জরুরি হুমকির কথা উল্লেখ করে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই সামরিক অভিযান শুরু করেন।
আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই প্রেসিডেন্ট ৬০ দিন পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী মোতায়েন করতে পারেন। কংগ্রেস যদি সেই পদক্ষেপ অনুমোদন না করে, তবে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে ওই বাহিনীকে সরিয়ে নিতে হয়।
কিছু আইনপ্রণেতা ও আইনি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইরান যুদ্ধ সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের শক্তিশালী তদারকির প্রয়োজনীয়তাকেই ফুটিয়ে তুলছে। হ্যামলিন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড শলৎস বলেন, "১৯৭০-এর দশকে আমরা 'ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন' গ্রহণ করেছিলাম যা প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে সীমিত ক্ষমতা দেয়।"
তিনি আরও যোগ করেন, "তাই হয় আপনাকে যুক্তি দিতে হবে যে প্রেসিডেন্ট যা করছেন তা সংবিধান লঙ্ঘন করছে কারণ এটি কোনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত যুদ্ধ নয়; অথবা এটি কমান্ডার-ইন-চিফ বা ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্টের অধীনে তার ক্ষমতার বাইরে। তাই ঘরোয়াভাবে তার কর্মকাণ্ড অবৈধ এবং অসাংবিধানিক বলে বিবেচিত হতে পারে।"
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে, ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা 'আসন্ন হুমকির' মোকাবিলায় চালানো হয়েছিল। প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নিতে এই যুক্তি ব্যবহার করেন। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যুদ্ধ শুরুর আগেই জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র বা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের স্থাপনাগুলোতে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আসন্ন হামলার প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
