গণছাঁটাইয়ের পর পদত্যাগ করলেন ওয়াশিংটন পোস্টের সিইও
ব্যাপক কর্মী ছাঁটাই বা 'গণছাঁটাই' কার্যক্রম তদারকি করার কয়েক দিনের মাথায় পদত্যাগ করছেন 'ওয়াশিংটন পোস্ট'-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) উইলিয়াম লুইস। বিখ্যাত এই মার্কিন সংবাদপত্রটি নিজেই এই ঘোষণা দিয়েছে।
কর্মীদের পাঠানো এক বার্তায় উইলিয়াম লুইস বলেছেন, সরে দাঁড়ানোর জন্য এটাই সঠিক সময়। তিনি জানান, পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেই কিছু 'কঠিন সিদ্ধান্ত' নেওয়া হয়েছিল।
গত বুধবার পত্রিকাটি জানিয়েছিল, তারা তাদের মোট কর্মীর তিন ভাগের এক ভাগ ছাঁটাই করছে। একই সঙ্গে খেলাধুলা ও আন্তর্জাতিক খবরের পরিধিও নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন অনেক সাংবাদিক। পোস্ট-এর ধনকুবের মালিক জেফ বেজোসও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তবে নির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে দাবি করেছেন, এই ছাঁটাই প্রতিষ্ঠানে 'স্থিতিশীলতা' আনবে।
লুইসের বিদায়ের ঘোষণার সময় পোস্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেফ ডি'ওনোফ্রিও ভারপ্রাপ্ত প্রকাশক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি গত বছর পত্রিকাটির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন।
উইলিয়াম লুইস এর আগে 'ডাউ জোনস'-এর প্রধান নির্বাহী এবং 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল'-এর প্রকাশক ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি ওয়াশিংটন পোস্টের এই পদে নিয়োগ পান।
দৈনিকটির আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে লাভের মুখ দেখানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তিনি গ্রাহক ও কর্মীদের সমালোচনার শিকার হয়েছেন।
গণছাঁটাইয়ের পর গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে পত্রিকাটির সদর দপ্তরের সামনে শত শত মানুষ বিক্ষোভ করেন। ছাঁটাই হওয়াদের তালিকায় পত্রিকাটির পুরো মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক কর্মীদল এবং কিয়েভভিত্তিক ইউক্রেন প্রতিনিধিও ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে স্থানীয়ভাবে বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া আন্তর্জাতিক কর্মীদের সহায়তায় একটি 'গোফান্ডমি' পেজ খোলা হয়েছে। এই কর্মীরা ওয়াশিংটন পোস্ট গিল্ড বা ইউনিয়নের সদস্য নন। ফলে তারা ইউনিয়নভুক্ত কর্মীদের মতো সুরক্ষা পাচ্ছেন না। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে তারা বাসস্থান, ভিসা বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
পেজটির আয়োজক মিশেল লি গত শনিবার লিখেছেন, 'ছাঁটাই হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকা সাংবাদিকেরা। রয়েছেন সিউল ও লন্ডনের ব্রেকিং নিউজ হাবের রিপোর্টার ও এডিটররা, যারা প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার খবর তুলে ধরেন। এমন সংবাদদাতারাও আছেন, যারা মাত্র কয়েক মাস আগে জীবন বাজি রেখে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আছেন এমন স্থানীয় কর্মীরা, যাদের ছাড়া আমাদের সাংবাদিকতা অসম্ভব ছিল।'
তিনি আরও লেখেন, 'তারা অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ, প্রতিভাবান, বহুভাষী এবং মেধাবী এক দল মানুষ। তাদের সঙ্গে এমনটা হওয়া উচিত ছিল না।'
রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পেজটিতে ১ লাখ ৮০ হাজার ডলারেরও বেশি (১ লাখ ৩০ হাজার পাউন্ড) তহবিল জমা পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ডলার।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের জন্য গিল্ডের আয়োজনে আলাদা একটি গোফান্ডমি পেজে ইতিমধ্যেই ৫ লাখ ডলারেরও বেশি জমা হয়েছে।
২০২১ সাল পর্যন্ত পোস্ট-এর নির্বাহী সম্পাদক থাকা মার্টি ব্যারন বলেছেন, 'বিশ্বের অন্যতম সেরা এই সংবাদমাধ্যমটির ইতিহাসের অন্ধকারতম দিনগুলোর মধ্যে এই ছাঁটাইয়ের ঘটনা অন্যতম।'
লুইসের বিদায় যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এই সংবাদপত্রের সর্বশেষ অস্থিরতার নজির। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখানে ধারাবাহিক কর্মী ছাঁটাই এবং বিতর্কিত সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিতে দেখা গেছে।
২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা বেজোস কয়েক দশকের ঐতিহ্য ভেঙেছিলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, পত্রিকাটি কোনো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে সমর্থন বা 'এনডোর্স' করবে না।
১৯৭০-এর দশক থেকে অধিকাংশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেই পত্রিকাটি কোনো না কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে আসছিল। উল্লেখ্য, এই সমর্থিত প্রার্থীরা সবাই ছিলেন ডেমোক্র্যাট দলের।
ওই পদক্ষেপের কারণে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ফলে হাজার হাজার গ্রাহক সাবস্ক্রিপশন বাতিল করেছিলেন।
এদিকে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করেছিলেন পত্রিকার মতামত বিভাগের সম্পাদক বা অপিনিয়ন এডিটর। বেজোস পত্রিকার মন্তব্য বিভাগকে 'ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মুক্ত বাজার'-এর ওপর ফোকাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই তিনি সরে দাঁড়ান।
২০১৩ সালে পত্রিকাটি কিনে নেওয়া বেজোস জানিয়েছিলেন, ওই মতাদর্শের বিরোধী কোনো লেখা প্রকাশ করা হবে না।
