পিএস মাহসুদ: আবারও নদীপথে ফিরল ঐতিহ্যবাহী এই জলের কমলা রকেট
বুড়িগঙ্গার বেশ কিছু ঘাটে নানা নামে খোঁজ করে সন্ধান মিলছিল না ঐতিহাসিক জলযান মাহসুদের। ম্লান বদনে যখন এদিক-ওদিক ঘুরছি, তখন 'রকেট' শব্দটি উচ্চারিত হতেই ঘাটের মানুষের চোখ জ্বল জ্বল করে উঠল। জানা গেল, রকেট পিএস মাহসুদ এখন বাদামতলি ঘাটে, যাত্রার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেলের মিষ্টি আলোয় বাদামতলি ঘাটে তখন কর্মব্যস্ত সময়। এমভি মধুমতির সাথে বাঁধা ছিল রকেট পিএস মাহসুদ। মধুমতির আড়ালে অনেকটা নিভৃতেই চলছে মাহসুদকে সাজিয়ে তোলবার কাজখানা। তবে ভাতঘুমের আলস্য দেখা গেল না কর্মীদের মাঝে। সেখানে তখন নিদারুণ ব্যস্ততা। কেউ রঙয়ের কাজ করছে, কেউ ইঞ্জিন চেক দিচ্ছে। কেউ বা কেবিনের আনাচেকানাচে কোনো খুঁত থেকে গেল কিনা খুটিয়ে দেখে নিচ্ছে বারবার।
এত পুরোনো স্টিমারের জরাজীর্ণ কলকব্জা সারিয়ে তুলতে আন্তরিক চেষ্টাই করেছে অনেক জোড়া হাত। এই চেষ্টায় কত যত্ন মিশে আছে তা বোঝা যায় এটির ফিরে পাওয়া নবযৌবন দেখেই। বাধর্ক্যেও সে যেন চিরযৌবনা৷
আজ (১৫ নভেম্বর) মাহসুদ আবার নদীতে নামলো। চার বছরের অবসরের পর এই ফিরে আসাকে ঘিরে কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার সীমা নেই। যেন প্রিয়জনের ফিরে পাওয়ার আনন্দে মুখর তারা।
শতবর্ষী এই প্যাডেল স্টিমার ঘিরে এখন সাজসাজ রব। নতুন রঙে-রূপে সেজে উঠছে অনেকটা বাজপাখি সদৃশ মাহসুদ। যদিও সবাই আজও চেনে একে জলের কমলা রকেট নামেই। নামের পেছনে আছে একসময়ের বিস্ময়কর গতি—ঢাকা থেকে খুলনা পৌঁছাতে লাগত মাত্র ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা! সে সময়ের তুলনায় অবিশ্বাস্য দ্রুত। যাত্রীরা বিস্ময়ে বলতেন, "এ যেন রকেটের মতো ছুটে চলে!" সেই থেকেই নাম হয় জলের রকেট। আর কমলা রঙের গাত্রবর্ণে যুক্ত হয় 'কমলা রকেট' নাম।
সময় বদলেছে। পদ্মা সেতু হওয়ার পর সড়কপথের জনপ্রিয়তায় হারিয়ে গেছে সেই নদীপথের জৌলুস। "আগে যেখানে ৫০০ যাত্রী যেত, সেতু হওয়ার পরে ২০০ জনও হয় না। তাই স্টিমার সার্ভিস বন্ধ হয়ে যায়," বললেন মাহসুদের ইঞ্জিন চালক সোহাগ।
অথচ একসময় নদীর বুক জুড়ে রাজত্ব করত এই রকেট মাহসুদ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ গন্তব্যে পৌঁছাতে ভরসা রাখতেন এর ওপর। সোহাগ জানান, "দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান—সবাই কোনো না কোনো সময় মাহসুদের যাত্রী ছিলেন। এমনকি একসময় এই স্টিমারে চড়েছেন ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথও।"
বিশ্বে এখন হাতে গোনা চার-পাঁচটি প্যাডেল স্টিমার টিকে আছে। বিরল সেই তালিকায় মাহসুদের নামও রয়েছে গর্বের সঙ্গে। মাহসুদের ইঞ্জিনচালক সাইফুল বলেন, "আমি এখানে যোগ দেওয়ার পর থেকে দেখছি, ইউরোপ থেকে অনেক পর্যটক আসেন শুধু এটি দেখতে। কেউ কেউ আবার ভ্রমণও করেন।"
বরিশালের মুলাদীর বাসিন্দা সাইফুল এর আগে তিন বছর ছিলেন ইঞ্জিন সহকারী। তার চোখে মাহসুদের বিশেষত্ব হলো এর প্যাডেল ব্যবস্থা। "বাকি স্টিমার চলে পপুলার সিস্টেমে, কিন্তু মাহসুদ চলে প্যাডেল সিস্টেমে। যখন প্যাডেল পানিতে ঘোরে, দৃশ্যটা সত্যিই অসাধারণ লাগে। পুরো সিস্টেমটাই আলাদা।"
ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে সরকারের সিদ্ধান্তে আবারও চালু হচ্ছে ঐতিহাসিক স্টিমার 'মাহসুদ'। আগামী ১৫ নভেম্বর জমকালো আয়োজনে পুনরায় যাত্রা শুরু করবে শতবর্ষী এই রকেট স্টিমার। তবে এবার আর ঢাকা–খুলনা রুট নয়, বরং পর্যটকদের জন্য মনোরম ঢাকা–বরিশাল নদীপথেই চলবে মাহসুদ। নির্ধারিত হয়েছে সপ্তাহে দুই দিন—প্রতি শুক্রবার ঢাকা থেকে বরিশাল এবং শনিবার বরিশাল থেকে ঢাকা আসবে এ জনযান।
মাহসুদের কমার্শিয়াল ডিজিএম তানভীর আহমেদ বলেন, "আগে খুলনা পর্যন্ত সার্ভিস দেওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু এখন আর দেওয়া হবে না। রাতেও কোনো ট্রিপ থাকবে না। কেবল দিনের বেলায় চলবে মাহসুদ—ঢাকা থেকে চাঁদপুর হয়ে বরিশাল, আবার বরিশাল থেকে ঢাকা।"
তিনি জানান, এবার মাহসুদের সার্ভিস হবে রিভার ক্রুজের মতো। দীর্ঘ মেরামতের পর ৫০০-র বেশি যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকলেও নিরাপত্তার স্বার্থে যাত্রী নেওয়া হবে সীমিত আকারে।
যদিও স্টিমারটি পুরোনো, তবু ইঞ্জিন, জেনারেটর ও কেবিন—সবকিছুতেই এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। এখন চারটি জেনারেটর বসানো হয়েছে (আগে ছিল তিনটি), ইঞ্জিনে সংযোজন হয়েছে নতুন যন্ত্রাংশ, বদলে দেওয়া হয়েছে তলার প্লেটগুলো। বাড়ানো হয়েছে এসির ক্ষমতা। রাডার, ইকোসাউন্ড, জিপিএস ও কম্পাস—সবই আপডেট করা হয়েছে আধুনিক সংস্করণে।
যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য প্রতিদিন যাত্রার আগে ইঞ্জিন থেকে ডেক পর্যন্ত সব অংশের বিস্তর পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা হয়। সোহাগ জানান, "আমরা মেইন ইঞ্জিন, ডিজেল লাইন, ইলেকট্রিক কানেকশন, বিলেজে পানি জমেছে কিনা—সবকিছু দেখি। যেহেতু এটা প্যাডেল স্টিমার, তাই প্যাডেলের নাট-বল্টু সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করি।"
প্রতি সপ্তাহে একবার সম্পূর্ণ ফাউন্ডেশনের নাট-বল্টু টাইট করা হয়, পাশাপাশি রাবার প্যাড, লাইনিং, ডিস্কসহ সব অংশই নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। "স্টিমারের নিরাপত্তার জন্য যা যা করা যায়, সবই হয়েছে," বলেন সোহাগ, "বাকিটা আল্লাহর হাতে।"
মাহসুদের সার্বিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে কাজ করছেন একদল অভিজ্ঞ নাবিক ও কর্মকর্তা। হেড অফিস থেকে সবকিছু তদারকি করেন ডিজিএম তানভীর আহমেদ। তার সঙ্গে রয়েছেন কমার্শিয়াল সহব্যবস্থাপক ফাহমিদুল ইসলাম, মেরিন সহব্যবস্থাপক রাসেল এবং নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়জুর রহমান।
এছাড়া অ্যাকাউন্টস শাখার একজন কর্মকর্তা স্টাফদের বেতন-ভাতা তদারকি করেন। ঘাট ও যাত্রীসেবায় নিয়োজিত আছেন প্রায় ১৫০–২০০ কর্মী। স্টিমারের অভ্যন্তরে ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনে ১০ জন, ডেকে ১৫ জন এবং ক্যাটারিং–বাটলারসহ প্রায় ২৫–৩০ জন কর্মচারী কাজ করছেন।
সোহাগ জানান, এবার নতুনত্ব এসেছে খাবার পরিবেশনের ধরনেও। প্রচলিত নিয়মের বদলে এবার বুফে স্টাইলে পরিবেশন করা হবে খাবার। থাকছে দেশি–বিদেশি নানা পদ, যদিও মেন্যু এখনো চূড়ান্ত হয়নি। খাবার তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞ শেফ ও ক্যাটারিং সার্ভিসকে। প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের জন্য থাকবে আলাদা বুফে আয়োজন।
তবে মাহসুদের কেবিন সংখ্যা থাকছে আগের মতোই—প্রথম শ্রেণিতে ১২টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০টি। প্রতিটি কেবিনেই যুক্ত হয়েছে নতুন সুযোগ-সুবিধা। যাত্রীদের বিনোদনের জন্য সংযোজন করা হয়েছে নয়টি সাউন্ড সিস্টেম, আর প্রথম শ্রেণির যাত্রীদের জন্য থাকছে একটি বিশেষ মিটিং সেলুন।
লঞ্চে যাত্রীদের সুবিধার জন্য ফার্স্ট ক্লাসে রয়েছে তিনটি টয়লেট ও একটি গোসলখানা। সেকেন্ড ক্লাসেও আছে তিনটি টয়লেট ও একটি গোসলখানা। আর ডেক যাত্রীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে মোট ১২টি টয়লেট। তবে এসব টয়লেট বা গোসলখানার কোনোটি কেবিনসংযুক্ত নয়; সবগুলোই আলাদা করে নির্মিত।
প্রশ্ন ছিল, রাতে লঞ্চে থেকে যাত্রীরা কি রাতযাপনের অনুমতি পান? সাইফুল ইসলাম সোহাগের উত্তর, 'না।' কেউ যদি ঢাকা–বরিশাল রুটে আপ–ডাউন ট্রিপে যেতে চান, তাকেও পরদিন সকালেই ফিরে আসতে হয়। সাধারণত লঞ্চে রাত কাটানোর অনুমতি দেওয়া হয় না। এটি মাহসুদের নিয়মবহির্ভূত।
তবে বিশেষ ক্ষেত্রে অফিস আদেশের মাধ্যমে অনুমতি পাওয়া যেতে পারে। যেমন, কোনো যাত্রী যদি ফার্স্ট ক্লাসের সব কেবিন ভাড়া নিয়ে আপ–ডাউন টিকিট কাটেন, তাহলে হেড অফিসে আবেদন করে থাকার অনুমতি নিতে হয়। তবে এমন অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে হেড অফিসের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে বলে জানান সোহাগ।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, রাতে কেবিন খোলা রাখলে জেনারেটর চালু রাখতে হয়, কারণ বিদ্যুৎ ছাড়া সেখানে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু একজন যাত্রীর জন্য সারারাত জেনারেটর চালানো বাস্তবে সম্ভব নয়। তাই নিয়ম অনুযায়ী লঞ্চে রাতযাপনের কোনো সুযোগ নেই। কর্পোরেশন চাইলে বিশেষ অনুমতি দিতে পারে, কিন্তু সাধারণভাবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার লঞ্চ কর্তৃপক্ষের হাতে নেই বলেও জানান সোহাগ।
ভাড়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। মাহসুদের কমার্শিয়াল ডিজিএম তানভীর আহমেদ জানান, "খুব শিগগিরই নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করা হবে।" আগের ভাড়া ছিল—এসি কেবিন ২০০০ টাকা, নন-এসি ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা এবং ডেকের ভাড়া পড়তো প্রায় ১৪০ টাকা। এবার তাতে কিছুটা পরিবর্তন আসবে বলে ইঙ্গিত দিলেন তিনি।
"ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা, তবে অনুকূল আবহাওয়া ও জোয়ার থাকলে ৯ ঘণ্টা ৩০ মিনিটেই গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে," বললেন ইঞ্জিন চালক সোহাগ।
অশীতিপর এই রকেট স্টিমার আজও কিংবদন্তি। বয়স তার বাড়লেও খ্যাতি কমেনি বিন্দুমাত্র। দেশের কত রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ যাত্রী—কতজনের ভ্রমণসঙ্গী ছিল মাহসুদ, তার হিসাব নেই।
বলা হয়, কবি জীবনানন্দেরও ঢাকা–বরিশাল আসা যাওয়ার বাহন ছিল এই স্টিমার। ১৯২৯ সালের দিকে প্রসিদ্ধ স্টিমারগুলো মধ্যে ছিল লেপচা, অস্ট্রিচ, গাজী এবং মাহসুদ। জানা যায়, মাহসুদেও আসা যাওয়া করতেন জীবনানন্দ।
কবির ডায়েরিতেও স্টিমারযাত্রার অসংখ্য উল্লেখ আছে। ১৯৩২ সালের ৭ জুলাইয়ের ডায়েরিতে তিনি লিখেছিলেন, 'স্টিমারে কোনও জায়গা নেই...বেডিং বাঁধা অবস্থায় রাখতে হল... লোকজন আমাকে লক্ষ্য করছে এবং আন্দাজ করতে চেষ্টা করছে... দুজন ঝালকাঠি যাবে, তাদের জায়গা দখল করবার লোভের আশায়... সমস্ত প্যাসেঞ্জারের মধ্যে আমি সবচেয়ে বেশি নদী আকাশের দিকে তাকিয়েছি।'
'স্টিমারের তৃতীয় ক্লাশ ডেক থেকে এই সব বোঝা যায়;
জীবনের বিমর্ষতা "আজও তুমি তৃতীয় ক্লাশ?"'
মৃত্যুর পরে প্রকাশিত 'ছায়া আবছায়া' কাব্যগ্রন্থের এই শিরোনামহীন কবিতায় উঠে এসেছে স্টিমারের সাথে জড়ানো জীবনানন্দ দাশের নিজস্ব বিমর্ষতা, বেকারত্বের হতাশা আর এক গভীর জীবনবোধ। জীবনের বিমর্ষতাকে উপলব্ধি করতে, কিংবা সেই বিমর্ষতার কারণেই হয়তো চড়তেন স্টিমারের তৃতীয় ক্লাসে।
কবি জীবনানন্দের মতোই অসংখ্য যাত্রী কোনো না কোনো সময় এই স্টিমারে ভর করে গেছেন পদ্মা-মেঘনার বুকে। হয়তো 'বনলতা সেন'-এর নিঃশব্দ সন্ধ্যা কিংবা 'রূপসী বাংলা'-র নদীবর্ণনায় লুকিয়ে আছে সেই স্টিমারের শব্দ, সেই নদীর রূপ।
তাই বলা যায়, প্রায় এক শতাব্দী ধরে মাহসুদ শুধু যাত্রী বহন করেনি—বহন করেছে সময়ের স্মৃতি, মানুষের আশা-নিরাশা আর কবিতার অনন্ত বীজ।
সদরঘাটে দেখা হলো ৭০ বছর বয়সী জামাল হোসেনের সঙ্গে। চাঁদপুরের এই মানুষটি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, "এই স্টিমারে আমি শত শত বার গেছি। যখন শুনলাম এটা আবার চালু হবে, মনটাই ভালো হয়ে গেল।"
আজকের দ্রুতগতির যুগে মাহসুদের টিকে থাকাই এক জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে যেতেও সে এখনো সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে। যাত্রী কম হোক বা বেশি, নদীর বুকে মাহসুদের ভেসে চলার দৃশ্যটাই আপাতত সবার কাছে এক টুকরো স্বস্তির খবর।