সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে ব্যাপক সংস্কারের পরামর্শ সিপিডির
বাংলাদেশে আধুনিক ও গ্রিড-সংযুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে ব্যাপক নীতিগত, রাজস্ব এবং আর্থিক সংস্কারের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকরা।
তারা বলেছেন, বিদ্যমান কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করছে এবং এই খাতের প্রবৃদ্ধি ধীর করে দিচ্ছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আজ মঙ্গলবার 'দেশের শীর্ষ সিএসওগুলোর দৃষ্টিতে পাকিস্তানের সৌর বিপ্লব: জাতীয় বাজেটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা' শীর্ষক সংলাপে এ অভিমত ব্যক্ত করেন তারা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ সংলাপের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করার বৃহত্তর লক্ষ্য বাস্তবায়নে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
তিনি বলেন, দক্ষ, বিনিয়োগবান্ধব ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিবেশ গড়ে তুলতে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি নীতিমালা পুনর্গঠন করতে হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সিপিডির গবেষণা সহযোগী আতিকুজ্জামান শাজিদ বলেন, দেশে বর্তমানে অফ-গ্রিড সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি থেকে অন-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিংভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে কাঠামোগত রূপান্তর ঘটছে।
তিনি জানান, সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচির মাধ্যমে একসময় প্রায় ২ কোটি মানুষের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। তবে জাতীয় গ্রিডের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে এ মডেলটি এখন স্যাচুরেশন পয়েন্ট বা স্থবিরতায় পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাটারির কার্যক্ষমতা হ্রাস এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও রূপান্তরের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার অভাবে স্থাপিত সিস্টেমগুলোর প্রায় ৪৭ শতাংশ বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অন-গ্রিড সোলারের ব্যবহার এখনও সীমিত। বর্তমানে মাত্র ৪ হাজার ৫৫১টি নেট মিটারিং সংযোগের মাধ্যমে মোট ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পাকিস্তানের রিনিউএবলস ফার্স্ট-এর স্পেশাল ইনিশিয়েটিভস অ্যান্ড চায়না প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপক মুহাম্মদ বাসিত গাউরি। তিনি পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, উচ্চ বিদ্যুৎ মূল্য ও সহজতর নেট মিটারিং নীতির কারণে পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে ভোক্তারা নিজেরাই অধিকাংশ বিনিয়োগ করেছেন, যা দেশটির সৌর খাতের সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সংলাপে বক্তারা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্প্রসারণে কয়েকটি প্রধান কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরেন।
এর মধ্যে রয়েছে সৌর সরঞ্জামের ওপর ২৭ দশমিক ৫ থেকে ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত আমদানি শুল্ক, সাশ্রয়ী অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এবং কঠোর জামানত শর্ত, যা সৌর প্রকল্পে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) এবং সৌর সম্পদকে ব্যাংকযোগ্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়াও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
এছাড়া ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থায় চলমান ভর্তুকি কৃষি খাতে সৌরশক্তির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি নেট মিটারিং অনুমোদনের জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়াও এর বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আলোচনার মাধ্যমে কিছু জরুরি নীতি সংস্কারের সুপারিশ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা সৌর উপকরণের ওপর কর যৌক্তিকীকরণ, নেট মিটারিং অনুমোদনের জন্য একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে ওপেক্স ও লিজিং-ভিত্তিক অর্থায়ন মডেল চালুর আহ্বান জানান।
তারা জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনাকে কেবল 'ইনস্টলেশন-ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা' থেকে পরিবর্তন করে কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদী নির্ভরযোগ্যতার দিকে নেওয়ার পরামর্শ দেন। একই সাথে, জ্বালানি বিক্রি এবং কার্যকারিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সৌর সেচ ব্যবস্থাকে জাতীয় গ্রিডের সাথে একীভূত করার ওপর জোর দেন।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ), বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) এবং কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (সিএলইএএন)-এর প্রতিনিধিরাও নীতিমালার স্থিতিশীলতা, উদ্ভাবনী অর্থায়ন প্রক্রিয়া এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীজনদের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সংলাপে উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশ বর্তমানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থার রূপান্তরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।
অফ-গ্রিড সৌর কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে সফল উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃত হলেও সহনশীল ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি সময়োপযোগী নীতি সংস্কার, উন্নত অর্থায়ন কাঠামো এবং সহজতর নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর ভবিষ্যতের অগ্রগতি নির্ভর করবে।
