স্বাস্থ্যখাতে বড় রূপান্তর: নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিকল্পনা সরকারের
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে শিশু ও নারীদের জন্য পৃথক বিশেষায়িত হাসপাতাল, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং চিকিৎসা শিক্ষা অবকাঠামো সম্প্রসারণের বৃহৎ পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন মঙ্গলবার (৩ জুন) সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, "পরিকল্পনার আওতায় বিভাগীয় শহরগুলোতে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি দেশের ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে।"
তিনি জানান, এ পরিকল্পনার মধ্যে বড় শহরগুলোতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট পাঁচটি নারী হাসপাতাল নির্মাণ, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন আবাসন সুবিধা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রমের একটি পাইলট প্রকল্পও রয়েছে। রোগ দ্রুত শনাক্ত করার লক্ষ্যেই এ কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।
পাঁচ বিভাগে শিশু হাসপাতাল
সরকার খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী ও কুমিল্লা বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি করে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল স্থাপন করবে।
এসব হাসপাতালের আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে হাসপাতালগুলো উদ্বোধন করা হতে পারে।
প্রতিটি হাসপাতালে ১ হাজার ৪৭৫ জন জনবলের প্রয়োজন হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে আজ (৪ জুন) একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আর্থিক অনুমোদন নিয়ে আলোচনা করা হবে।
প্রতিটি হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা, কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ রাখা হবে। পাশাপাশি বড় পরিসরের আইসিইউ ইউনিটও থাকবে।
৪৯২ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নয়ন
দেশের ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। দেশের মোট ৫০০ উপজেলার মধ্যে আটটিতে ইতোমধ্যে ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে।
সম্প্রসারণ পরিকল্পনার আওতায় এসব হাসপাতালে অতিরিক্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা যুক্ত করা হবে।
পুনর্বাসনসেবা সহজলভ্য করতে প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে একজন পুরুষ ও একজন নারী ফিজিওথেরাপিস্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের এ সেবা গ্রহণে সুবিধা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নারীদের জন্য পাঁচটি এক হাজার শয্যার হাসপাতাল
দেশের বড় শহরগুলোতে নারীদের জন্য বিশেষায়িত পাঁচটি এক হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ অর্থায়নে এসব হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, "চলতি অর্থবছরের মধ্যেই এসব হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।"
ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে নতুন অবকাঠামো
চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন সুবিধা উন্নত করতে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নতুন আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রণীত এ প্রকল্পের আওতায় প্রয়োজন অনুযায়ী এক বা একাধিক নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে।
শিগগিরই এ প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হবে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে প্রধানমন্ত্রী আগামী জুলাই মাসে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যেতে পারেন।
এদিকে মিটফোর্ড হাসপাতালের পুরোনো অবকাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হাসপাতালের কয়েকটি ভবনের অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি জানান, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং সেখানে নতুন হাসপাতাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে।
অন্যদিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নতুন ভবন আগামী ১৫ আগস্ট উদ্বোধন করা হবে। এর পর পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু হবে।
সিলেটে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করবে চীন
সিলেটে প্রস্তাবিত এক হাজার শয্যার একটি হাসপাতাল নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে চীনের বিনিয়োগকারীরা। এ লক্ষ্যে তারা ইতোমধ্যে সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শন করা স্থানগুলোর মধ্যে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর এলাকা এবং হাইটেক পার্ক রয়েছে।
বুধবার পরিদর্শনকালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন।
চীনা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বদানকারী বাই আপ ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের চেয়ারম্যান স্টুয়ার্ড চিউং বলেন, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে তারা সন্তুষ্ট।
ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রমের পাইলট প্রকল্প
জাপানি চিকিৎসা গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে দেশের ৬ থেকে ১০টি উপজেলার একটি করে ইউনিয়নে পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সফল হলে পরে তা সারা দেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
এছাড়া, তথ্য সংগ্রহ ও মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ডিজিটাল রিপোর্টিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।
