অ্যাজমা রোগী বাড়ছে, অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ইনহেলার সহজলভ্য করার আহ্বান চিকিৎসকদের
দূষণ, জেনেটিক কারণ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনসহ নানা কারণে দেশে অ্যাজমা, নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাড়ছে। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সী মানুষই এর শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ইনহেলার সহজলভ্য করা গেলে ও এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে অ্যাজমাজনিত মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে কত মানুষ এ রোগে আক্রান্ত এবং বছরে কতজন মৃত্যুবরণ করেন—এর নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে রোগটির প্রকোপ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
হাসপাতালটিতে ২০২৫ সালে আউটডোরে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৫৬ হাজার অ্যাজমা রোগী। এর মধ্যে ৬১.৭৫ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮.২৫ শতাংশ নারী। বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রোগী ৪৭ শতাংশ, ৫০ বছরের বেশি ৩৬ শতাংশ, ১৫ থেকে ২৪ বছর ১১ শতাংশ এবং শিশু-কিশোর ৬ শতাংশ।
একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫ হাজার ৩৯০ জন রোগী। এদের মধ্যে ১ হাজার ১৭০ জন মারা গেছেন এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন আরও ১৫৫ জন। মৃতদের মধ্যে ৭০ শতাংশ পুরুষ এবং ৭৪.৬৪ শতাংশের বয়স ৫০ বছরের বেশি।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। বায়ুদূষণ, ধুলাবালি, ধূমপান ও অ্যালার্জেনের উপস্থিতি এ রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২০ সালে রোগী ছিল ৯৮ হাজার ৯৯১ জন—যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজারে, অর্থাৎ প্রায় ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সময়ে মৃত্যুও বেড়েছে ৬১.৫৮ শতাংশ।
আজ বিশ্ব অ্যাজমা দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য 'সবার জন্য অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ইনহেলার এখন জরুরি'। এ উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা সময়মতো চিকিৎসা ও ইনহেলারের সঠিক ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
প্রতিরোধ ও ইনহেলারের সঠিক ব্যবহারে জোর বিশেষজ্ঞদের
চিকিৎসকরা বলছেন, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে শ্বাসতন্ত্রের রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। বায়ুদূষণ, ধুলাবালি, ধূমপান ও অ্যালার্জেনের উপস্থিতি এর প্রধান কারণ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর স্বাস্থ্য ও অসুস্থতা জরিপ ২০২৫ অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০ রোগের মধ্যে অ্যাজমার অবস্থান সপ্তম। জরিপে প্রতি হাজারে ৩০.৯৪ জন আক্রান্ত পাওয়া গেছে। শহরে এ হার প্রতি হাজারে ৩১.৭৫ এবং গ্রামে ৩০.১৫।
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. রশিদুল হাসান বলেন, "ইনহেলারে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কম। নিয়মিত ইনহেলার (কন্ট্রোলার) ব্যবহার করলে নেবুলাইজার ব্যবহারের প্রয়োজন কমে যায়। তবে ইনহেলার নিলেই হবে না, এর সঠিক ব্যবহার পদ্ধতি শিখতে হবে।"
রেসপিরেটরি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রাজিব কুমার সাহা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টের রোগী এখন অনেক বাড়ছে। দূষণ—বিশেষ করে শিল্প ও ধুলাবালিজনিত দূষণ, আবহাওয়ার ভারসাম্যহীনতা (অতিরিক্ত গরম-ঠান্ডা) এবং কোভিডসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বাড়ার কারণে অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়াসহ নানা শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাড়ছে।"
তিনি বলেন, "অ্যাজমা রোগীদের অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। অ্যাজমার ক্ষেত্রে জেনেটিক কারণ গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে কারও অ্যাজমা থাকলে অন্যদের সতর্ক থাকতে হবে। ধুলাবালি বা ঠান্ডায় যাদের অ্যালার্জি আছে, তা যেন ট্রিগার না করে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অ্যাজমা হলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে, না হলে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা বাড়ে।"
বক্ষব্যাধি রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, "অ্যাজমা মানেই অক্ষমতা নয়। সঠিক চিকিৎসা ও নিয়ম মেনে চললে একজন রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। ইনহেলার নিলে আসক্তি হবে বা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে—এমন ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। তবে নিয়মিত ইনহেলার ব্যবহার অনেকের জন্য ব্যয়বহুল। আবার অনেকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় কাঙ্ক্ষিত ফল পান না।"
তিনি আরও বলেন, "প্রতিটি অ্যাজমা রোগীর জন্য অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ইনহেলার সহজলভ্য করতে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পর্যায়ে ইনহেলার সরবরাহ ও ব্যবহারের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে এবং নীতিনির্ধারকদের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে ইনহেলার নিশ্চিত করতে হবে।"
