‘ঋণে জর্জরিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না’: শ্রমিকের খরচ বৃদ্ধি ও ধানের দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে বোরো চাষীরা
নাটোরের বোরোচাষী তুহিন ইসলাম এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। এর মধ্যে ১২ শতক জমির ধান কাটতেই শ্রমিকের মজুরি গুণতে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৬০০ টাকা।
বাকি আরও তিন বিঘা জমিতে অন্তত ২৪ হাজার টাকার মতো শুধু শ্রমিকের পেছনেই খরচ হবে। অথচ তিনি ধান বিক্রি করছেন প্রতি মণ ৯০০ টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় অন্তত ২০০-৩০০ টাকা কম।
নলডাঙ্গা উপজেলার হালতির বিল এলাকার এই কৃষক টিবিএসকে বলেন, "একজন শ্রমিককে দৈনিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে দুই বেলা খাবার ও নাস্তার খরচ তো আছেই। কখনো শ্রমিক খরচ এত বেশি ছিল না। শ্রমিকই পাওয়া যায় না। অথচ ধানের মণ বিক্রি করলাম ৯০০ টাকায়।"
বোরো মৌসুমের শুরুতেই বাড়তি দামে সার ও কীটনাশক কিনতে হয়েছে কৃষকদের। এরপর ডিজেল ও বিদ্যুৎ সংকটে সেচ খরচও বেড়েছে। এখন ধান কাটার সময় এসে তুহিন ইসলামের মতো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা শ্রমিক মজুরি নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
তাদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি অন্তত ২০০-৩০০ টাকা বেড়েছে। অন্যদিকে ধানের দাম প্রতি মণে কমেছে ২০০-৩০০ টাকা। ফলে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়েই অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
নওগাঁর রানীনগরের বিজয়কান্দি গ্রামের কৃষক বিপথ চন্দ্র বলেন, জমি লিজ, চাষাবাদ, সার, কীটনাশক, সেচ ও ধান কাটাসহ প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ২৫-২৬ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে প্রতি বিঘায় গড়ে ২২ মণ ধান উৎপাদন হলেও বাজারে কম দামের কারণে ধান বিক্রি করে মিলছে মাত্র ২০-২২ হাজার টাকা।
তিনি বলেন, "এভাবে চললে সংসার চালাবো কীভাবে? ঋণে জর্জরিত হওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর দেশে ৫০ দশমিক ৪৭ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে ৪ দশমিক ৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে। তবে ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় হাওরের ধান ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে তারা ভবিষ্যতে বোরো চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার ভীমপুর গ্রামের কৃষক গোলাম মোস্তফা গত কয়েক বছর আলু ও পেঁয়াজ চাষে লোকসানের পর এবার ৮ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন।
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এই কৃষক বলেন, "এবার প্রতিজন শ্রমিকের মজুরি ন্যূনতম ৯০০ টাকা। একই সঙ্গে দুবেলা খাবারও দিতে হচ্ছে। আমাদের অঞ্চলে কোনোদিন শ্রমিকের দাম এত বাড়েনি। এমনিতেই সার, কীটনাশক ও ডিজেল সংকটে উৎপাদনে চরম প্রভাব পড়েছে। তার ওপর ধানের দাম মাত্র ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ। এভাবে চলতে থাকলে কৃষক চাষাবাদ ছেড়ে শহরে গিয়ে রিকশা চালাবে, অথবা ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হবে।"
বগুড়ার দুপচাঁচিয়া এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান এবার ২৫ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, আলু, কচু ও পেঁয়াজ চাষে ক্ষতির কারণে কৃষকরা আগেই ঋণের জালে জর্জরিত। এখন ধান চাষ করেও তারা নিঃস্ব হওয়ার পথে।
তিনি বলেন, "সরকার এসব বিষয়ে নজর না দিলে কৃষকরা চাষাবাদ কমিয়ে দিতে পারেন। তখন খাদ্য সংকটের আশঙ্কা তৈরি হবে। কৃষক না বাঁচলে দেশও বাঁচবে না।"
চাষী ও ব্যবসায়ীরা জানান, গত বছর কাঁচা ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ এবার সেই ধান বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। অনেক কৃষকের ঘরে এখনও পুরোনো ধান মজুত রয়েছে। এটিও নতুন ধানের দাম কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে হাওরাঞ্চলে শ্রমিক খরচ আরও বেশি হলেও সেখানে ধানের দাম তুলনামূলক কম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার অষ্টগ্রাম এলাকার কৃষক জহিরুল হক বলেন, "দেড় বিঘা জমির ধান কাটতে ৬ জন শ্রমিককে ১ হাজার ৬০০ টাকা করে দিতে হয়েছে। ধান মাড়াই পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। নিজেকেও মাঠে কাজ করতে হয়েছে। পাশাপাশি দুই বেলা খাবার ও নাস্তার খরচও বহন করতে হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "এক বিঘা জমির ধান মেশিনে কাটতে ২২-২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে বৃষ্টিতে খড় নষ্ট হয়ে যায়। আবার ধান কাটার মেশিনও পর্যাপ্ত নেই। একই সঙ্গে শ্রমিক সংকটও তীব্র। একটু আগেভাগে ধান কাটায় ১ হাজার ৬০০ টাকা করে শ্রমিক পেলেও পরে অন্যদের কাজ করাতে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।"
আরেক কৃষক মোহাম্মদ আলী বলেন, "১ হাজার ৫০০ টাকা করে তিনজন শ্রমিক এনে কাজ করেছি। আমিও সারাদিন তাদের সঙ্গে মাঠে কাজ করেছি। জমি বাড়ির পাশে হওয়ায় চারজন মিলে ধান বাড়িতে নিয়ে এসেছি। এখন ধান মাড়াই করব। অথচ বাজারে এখন প্রতি মণ কাঁচা ধানের দাম মাত্র ৭০০ টাকা।"
এ বিষয়ে বগুড়ার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, "ধানের দাম কমার অন্যতম কারণ হলো, এবার এখনো মিলাররা ধান কেনা শুরু করেনি। আবার বাজারেও এখনো পর্যাপ্ত ধান ওঠেনি। সরবরাহ বাড়লে দামও কিছুটা বাড়বে। এছাড়া বাজারে এখনও ভারতীয় চাল রয়েছে।"
তিনি বলেন, "ভারতীয় কাটারি চালের প্রতি ভোক্তাদের চাহিদাও বেশি। এ কারণেও দেশের বাজারে প্রভাব পড়ছে। তবে সুখবর হলো, এবার কৃষকরা গ্রুপভিত্তিকভাবে অটোমিলে সরাসরি ধান বিক্রির সুযোগ পাবেন। ব্যবসায়ীর মাধ্যমে নয়, তারা সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারবেন। এ বিষয়ে কৃষি বিপণন বিভাগ কমিটি গঠন করেছে। ২৫ জন কৃষক মিলে একটি গ্রুপ গঠন করবেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমবে এবং কৃষকরা ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।"
বগুড়া জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, "জেলায় ইতোমধ্যে প্রায় ১৩ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে ধানের দাম খুব কম থাকায় কৃষকদের লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। সরকার ধানের একটি নির্ধারিত মূল্য ঘোষণা করেছে। সেই দামে ধান কেনা শুরু হলে বাজারদর কিছুটা বাড়তে পারে। শ্রমিকের মজুরি মূলত চাহিদার ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় এটি কমও থাকে।"
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি এবং ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের (ইউজিভি) সাবেক উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম খান টিবিএসকে বলেন, "সারাদেশেই শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি বেড়ে গেছে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সেচ, সার ও কীটনাশকে আগের বছরের তুলনায় বেশি ব্যয় করতে হয়েছে। অথচ ধানের ন্যায্যমূল্য মিলছে না।"
তিনি আরও বলেন, "সরকারও আগের দামে ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছে। এটি বাড়ানো উচিত। না হলে কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।"
