তেলের লাইনের পর এবার সংকট রাইড-শেয়ারিং চালকদের আয়ে
বুধবার সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে বহুদিন পর ভিন্ন দৃশ্য দেখলেন রাসেল হোসেন—তেল নিতে আসা যানবাহনের লাইন বেশ ছোট।
এক ঘণ্টারও কম সময়ে জ্বালানি নিয়ে বের হলেন তিনি। অথচ গত কয়েকদিন ধরে জ্বালানি পেতে তাকে পাঁচ, ছয়, কখনো ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে, সেখানে বুধবার এত কম সময়ে জ্বালানি পাওয়ার ঘটনা তার কাছে অবিশ্বাস্যই মনে হচ্ছিল। ট্যাংক ভর্তি করে হেলমেট পরে তিনি 'পাঠাও' অ্যাপ চালু করলেন।
তারপরই হিসেবটা বুঝতে পারলেন রাসেল।
অকটেনের দাম এখন লিটারপ্রতি ১৪০ টাকা, যা আগে ছিল ১২০ টাকা। দেশের ইতিহাসে এই দাম সর্বোচ্চ। যেই ট্যাংক ভরতে আগে প্রায় ৩০০ টাকা লাগত, এখন লাগছে প্রায় ৪০০ টাকা। কিন্তু অ্যাপে ট্রিপপ্রতি আয় বাড়েনি। প্ল্যাটফর্মের কমিশনও রয়েছে আগের মতোই। পরিবর্তন হয়েছে কেবল একটাই—এখন প্রতি ট্রিপ থেকে আগের তুলনায় কম লাভ থাকছে।
৪৬ বছর বয়সী এই চালক বলেন, "গত সপ্তাহে লাইনে দাঁড়িয়ে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। আর এই সপ্তাহে ট্রিপের ভাড়ায় অবস্থা খারাপ। কোনটা যে বেশি মন্দ, বুঝতে পারছি না।"
ঢাকার জ্বালানি সংকটের সর্বশেষ পর্যায়ে এই পরিস্থিতি কঠিন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে। নতুন চালান আসায় এবং দাম বাড়ার পর প্যানিক বায়িং কমে যাওয়ায় বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে লাইনের চাপ অনেকটাই কমেছে। যাত্রী ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এটি স্বস্তির খবর মনে হতে পারে।
কিন্তু 'পাঠাও' ও 'উবার'-এর মতো রাইড-শেয়ারিং অ্যাপে কাজ করা হাজারো মোটরসাইকেল চালকের জন্য এটি কেবল ভোগান্তির ভিন্ন রূপ। সংকটের কারণে আগে তাদের সময় নষ্ট হয়েছে, আর এখন জ্বালানির দাম বাড়ায় আয় কমে গেছে। আগের সমস্যার জায়গায় নতুন আরেক সমস্যা এসে হাজির হয়েছে।
রেকর্ড দাম, রেকর্ড ভোগান্তি
মার্চজুড়ে এবং এপ্রিলের শুরুর দিকে সরকার ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানির দাম স্থির রেখেছিল, যাতে করে ভোক্তারা চাপে না পড়েন। তবে এপ্রিলের মাঝামাঝি আর্থিক বাস্তবতা সামনে আসে।
চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল সরকার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ জ্বালানির দাম ঘোষণা করে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে হয় ১১৫ টাকা। ঢাকায় রাইড-শেয়ারিং মোটরসাইকেলের প্রধান জ্বালানি অকটেন এক লাফে ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকায় পৌঁছায়। পেট্রলের দাম হয় ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিনের দাম নির্ধারণ করা হয় ১৩০ টাকা।
এর আগে রেকর্ড দাম বেড়েছিল ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়, তখন অকটেনের দাম উঠেছিল লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা।
সাম্প্রতিক ঘোষণায় সরবরাহ সংকটের গভীরতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৭৮৪ টন—যা দিয়ে প্রায় ১০ দিন চলা সম্ভব। অকটেনের মজুত ছিল ২৯ হাজার ৫০০ টন, যা চলত প্রায় ২৭ দিন। শুধু মার্চেই দেশের জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে অতিরিক্ত ১,২০০ কোটি টাকা ব্যয় করে ১০টি তেলের চালান আমদানি করতে হয়েছে।
ঢাকার অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল চালকদের জীবনে এই সংকটের প্রভাব বুঝতে হলে কেবল একদিনের হিসেবই যথেষ্ট।
সংকটের আগে শিফট ভালো গেলে পাঠাও বা উবারে কাজ করা একজন চালক দিনে গড়ে ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। ট্যাংকের ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে জ্বালানি খরচ পড়ত প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এর সঙ্গে প্ল্যাটফর্ম কমিশনও কেটে নেওয়া হতো। সব মিলিয়ে যা থাকত, তা সীমিত হলেও কোনোভাবে চলা সম্ভব ছিল।
কিন্তু সেই হিসেব এখন আর মিলছে না।
এপ্রিলে দাম বাড়ার আগেই জ্বালানি পেতে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছিল রাসেলকে। তার দৈনিক আয় ১,২০০–১,৩০০ টাকা থেকে কমে ৫০০–৬০০ টাকায় নেমে এসেছিল। এখন অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১৪০ টাকা, আর সরবরাহ সংকটও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে যা আয় থাকছে, তার বড় একটি অংশই চলে যাচ্ছে জ্বালানির পেছনে।
৩৪ বছর বয়সী মো. ইসরাফিল আগে উবার ও পাঠাও মিলিয়ে দিনে ১০ থেকে ১২টি ট্রিপ দিতেন। গত মাসে তার আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে—পুরো মাসে আয় হয় মাত্র ১৭ হাজার টাকা, যা প্রায় ১৩৮ ডলারের সমান।
কেন আয় কমেছে, সেই হিসাব তার কাছে স্পষ্ট: সকাল ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি পেয়েছেন বিকেল ৪টায়। ছয় ঘণ্টা চলে গেছে, সঙ্গে গেছে দিনের অর্ধেক সময়, অর্থাৎ অর্ধেক আয়ের সুযোগ।
তিনি বলেন, "পরিস্থিতি অনেকটা কোভিড-১৯ সময়ের মতো। কিন্তু আমাদের পাশে কেউ নেই। আমি দুই অ্যাপেই কাজ করি, কিন্তু তারা আগের মতোই কমিশন নিচ্ছে।"
কী বলছে প্ল্যাটফর্মগুলো?
একদিকে চালকেরা যখন নিজেদের আয়ের মাধ্যমে সংকটের চাপ সামলাচ্ছেন, তখন অন্যদিকে তারা যে প্ল্যাটফর্মে কাজ করেন, সেগুলো তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
রেস্ট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড নামের একটি আমেরিকান আউটলেটকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাঠাও জানায়, জ্বালানি সংকটে সেবার নির্ভরযোগ্যতা কমেছে এবং চালকদের মুনাফাও হ্রাস পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পিক আওয়ারে চালকদের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে দিতে তারা ডায়নামিক প্রাইসিং ও নির্দিষ্ট প্রণোদনার ওপর নির্ভর করছে। তবে সরাসরি ভাড়া বাড়ানো হয়নি।
উবার এ বিষয়ে কোনো প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়নি।
চালকদের কাছে এই নীরবতা অনেকটা অবহেলার মতো মনে হচ্ছে। প্রতি ট্রিপে কোনো কোনো প্ল্যাটফর্মে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন কাটা হয় বলে জানান তারা, সেই অঙ্কে এখনও কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্ল্যাটফর্ম ফিও অপরিবর্তিত রয়েছে। বদলেছে শুধু ব্যবসা পরিচালনার খরচ—যার পুরো চাপটাই এসে পড়েছে চালকদের ওপর।
উবার চালক হাসান রাহিদ বলেন, "দুই-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো মানে অন্তত ৩০০ টাকার আয় হারানো। আমরা ইচ্ছা করে ভাড়া বাড়াই না, কিন্তু ওই ক্ষতি তো পুষিয়ে নিতে হয়।"
কিছু চালক ঠিক সেটাই করেছেন—নিজ উদ্যোগে, অনানুষ্ঠানিকভাবে, এবং অ্যাপের নিয়মের বাইরে গিয়ে। দাম বাড়ার ঘোষণার পরের দিন আজিজ ভূঁইয়া নামে এক মোটরসাইকেল চালক হাতিরপুল থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত ভাড়া নিয়েছেন ১৫০ টাকা, যেখানে একই পথে অ্যাপভিত্তিক ভাড়া ছিল প্রায় ১০০ টাকা।
তিনি বলেন, "কিছু চালক ৭০ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন। জ্বালানি সংকট আর দাম বৃদ্ধি, দুটোই আমাদের ভাড়া বাড়াতে বাধ্য করেছে। বাঁচতে তো হবে।"
আরেক সমস্যার কথা জানালেন হাসান রাহিদ, যা সংকট শুরুর পর থেকেই মোটমুটি নিয়মিত। তিনি বলেন, "সরকার জ্বালানি সীমা (রেশনিং) তুলে নেওয়ার পরও অনেক পাম্প তা মানছে না। যদি মানতেই না পারে, তাহলে এই সিদ্ধান্তই বা কেন নেওয়া হলো?"
বিপাকে যাত্রীরা
জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে চালকদের আয় কমে যাওয়ায় মতো সংকটের পাশাপাশি বিলম্ব ও বাড়তি ভাড়ার কারণে বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরাও।
আদাবর থেকে ফার্মগেটে নিয়মিত যাতায়াতকারী আবু সাঈদ জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার পরের দিন সকালে তার ২০০ টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২৩০ টাকা।
মিরপুর মাজার রোড থেকে কাজীপাড়া যাতায়াতকারী কামরান সিদ্দিক বলেন, তার ভাড়া ১২০–১৩০ টাকা থেকে বেড়ে ১৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আবার এই রাইড পেতে তাকে অপেক্ষাও করতে হয়েছে ২০ মিনিট। দর কষাকষি করতে হয়েছে অন্তত ১০–১২ জন মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে; বেশিরভাগই ২০০ টাকার নিচে যেতে রাজি ছিলেন না। শেষে একজনকে পাওয়া যায়, যিনি তুলনামূলক কম ভাড়ায় যেতে রাজি হন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও নিয়মিত উবার ব্যবহারকারী ফারিহা নুজহাত বলেন, এই সংকট শুধু ভাড়ার ব্যাপারটিকেই নয়, সেবার নির্ভরযোগ্যতাকেও ভেঙে দিয়েছে।
অনেক চালক অ্যাপে দেখানো ভাড়ার চেয়ে বেশি দাবি করছেন, আবার কেউ কেউ সরাসরি ট্রিপ নিতেই অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন।
তিনি বলেন, "চালকেরা প্রায়ই অ্যাপে দেখানো ভাড়ার চেয়ে বেশি চান, কখনো আবার ট্রিপই নেন না। ফলে অ্যাপে দেখানো ভাড়া এখন অনেকটাই কাগুজে হয়ে গেছে, যেখান থেকে মূলক চালকদের সঙ্গে দর কষাকষি শুরু হচ্ছে।"
যেসব যাত্রী বাড়তি ভাড়া দিতে পারছেন না বা নির্ভরযোগ্য অ্যাপভিত্তিক রাইড পাচ্ছেন না, তাদের জন্য বিকল্পও খুব সীমিত। আর জ্বালানি সংকটে প্রভাব না পড়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চাহিদা এখন আগের চেয়ে বেশি।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা অনিক আগে সাশ্রয়ী ভাড়া ও কম সময়ে পৌঁছানোর জন্য মোটরসাইকেল রাইডেই ভরসা রাখতেন। তবে সাম্প্রতিক ভাড়া বৃদ্ধির পর তিনি এখন সিএনজি ব্যবহার করছেন, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে বেশি সাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে।
এক বিকেলে নবিস্কো মোড় থেকে বাসে ওঠার চেষ্টা করতে গিয়ে আকলিমা আক্তার দেখলেন, বাস আসছে না, কিন্তু বাসের জন্য অপেক্ষ করা মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। শেষ পর্যন্ত তিনি আর অপেক্ষা না করে খিলগাঁওয়ের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা ভাড়া নেন।
