মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে শ্রমবাজারে নতুন ধাক্কা, উপসাগরীয় দেশে কর্মসংস্থান কমছে বাংলাদেশিদের
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলার পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোতে তাদের কর্মসংস্থানকেও নতুন করে ধাক্কা দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ওই অঞ্চলের শ্রমবাজার এমনিতেই সংকুচিত হচ্ছিল।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে ৪৪ হাজার ৬৫৮ জন কর্মী বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র পেয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৬৬ হাজার ৭৭৩ জন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার ৩৩ শতাংশ কমেছে।
এছাড়া ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার ৩২ শতাংশ কমেছে, যা গত ৫৪ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর আগে গত বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ থেকে ৪৯ হাজার ৯৮৩ জন কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন, যা ওই সময় ৪৩ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মীর চাহিদা ব্যাপক হারে কমেছে। এই চাহিদা ৫ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে।
একই সঙ্গে আকাশসীমা বন্ধ থাকায় ফ্লাইট–সংকটে গত এক মাসে কয়েক শ বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে যেতে পারেননি। এতে তাদের বর্তমান চাকরি ঝুঁকির মুখে পরার পাশাপাশি নতুন কাজের সুযোগও কমেছে।
তাছাড়া, ওমান ও বাহরাইনে কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। গত দেড় বছরে অদক্ষ কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও।
নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে অগ্রগতি সীমিত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বিদেশে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে জনশক্তি রপ্তানিকারক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ঈদের সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে এখনো তাৎক্ষণিক কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা না গেলেও, সংঘাত অব্যাহত থাকলে তা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কারণ, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেই।
এদিকে বর্তমানে দেশে অবস্থানরত অনেক প্রবাসী কর্মী ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, যদিও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশ ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়েছে।
তবে এরই মধ্যে এই সংঘাত ৪০ দিনের বেশি গড়িয়েছে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু গাড়িচালক নিতে আমিরাতের দুজন নিয়োগকর্তা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে তাদের ঢাকা আসার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে পুরো প্রক্রিয়া আটকে গেছে।'
শামীম আরও বলেন, 'নতুন শ্রমিক নেওয়ার চাহিদা এখন স্তিমিত। সংঘাত চলতে থাকলে নতুন প্রকল্পগুলোও পিছিয়ে যেতে পারে। এতে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও কমবে।'
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে শামীম বলেন, 'এই অঞ্চলে কোনো অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তা সরাসরি আমাদের শ্রমবাজারে প্রভাব ফেলে। নতুন বাজার খোঁজার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি নেই।'
সৌদি আরবে কর্মী নিয়োগের হার কমেছে ৪৪%
বেসরকারি হিসাব বলছে, ছয়টি উপসাগরীয় দেশে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। অর্থাৎ, দেশের মোট প্রবাসী কর্মীর অর্ধেকেরও বেশি।
এর মধ্যে সৌদি আরবে ৩০ লাখের বেশি কর্মী কাজ করেন এবং গত বছর বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশের মোট কর্মীদের প্রায় ৬৭ শতাংশ (প্রায় ১১ লাখ ৩০ হাজার) সেখানে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশি কর্মীদের কাছে প্রধান গন্তব্য সৌদি আরব। কোভিড-১৯ মহামারির পর সেখানে কাজের সুযোগ আরও বাড়ে। কিন্তু কঠোর ভিসা নীতি এবং চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে গত দুই মাসে এই শ্রমবাজারে চাপের সৃষ্টি হয়েছে।
সৌদি আরবের শ্রমবাজার নিয়ে কাজ করা টিপু সুলতান জানান, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি কর্মী নেওয়ার একটি প্রস্তাবও পাননি।
তিনি বলেন, 'জালিয়াতি রুখতে যুদ্ধের আগে থেকেই ভিসা দেওয়ায় কড়াকড়ি আরোপ করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। এতে কর্মীর চাহিদা প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। এখন যুদ্ধের কারণে নতুন কর্মীর চাহিদা একদম শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে।'
টিপু সুলতান আরও বলেন, 'বিএমইটি এখন যেসব ছাড়পত্র দিচ্ছে, সেগুলো যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রক্রিয়াধীন ছিল।'
বিএমইটির তথ্য বলছে, গত মার্চে সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য ২৪ হাজার ৮৬২ জন কর্মীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। অথচ ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৮২ জন। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ছাড়পত্র দেওয়ার হার কমেছে প্রায় ৪৪ শতাংশ।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে জর্ডান, ইরাক ও লেবাননের মতো দেশগুলোতেও বাংলাদেশি কর্মীরা যান। কিন্তু পুরো অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় এসব দেশের শ্রমবাজারও এখন হুমকির মুখে।
বায়রার সদস্যরা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে রেমিট্যান্স কমার পাশাপাশি দেশে বেকারত্ব বাড়বে। এজন্য তারা সরকার, সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমে কিছুটা বিঘ্ন ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া ও যোগাযোগ ধীর হয়ে পড়েছে। আমরা দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।'
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে শ্রমবাজারের কার্যক্রমও আবার স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
থমকে গেছে কুয়েতের শ্রমবাজার
সংঘাতের আগে প্রতি মাসে গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার বাংলাদেশি কর্মী কুয়েতে যেতেন। কখনো কখনো এই সংখ্যা আড়াই হাজারও ছাড়িয়ে যেত।
তারা সাধারণত গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয়েও কর্মরত থাকেন। এছাড়া অনেকেই গৃহকর্মী হিসেবে—যেমন পরিচারক, রাঁধুনি ও গাড়িচালক হিসেবেও নিয়োজিত আছেন।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এসবি ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজিং পার্টনার কামাল শিকদার বলেন, 'নতুন ভিসা দেওয়া প্রায় বন্ধ। ব্যবসাও পুরোপুরি থমকে গেছে। আমার এজেন্সি নতুন কোনো চাকরির ভিসা পায়নি। কাজের সন্ধানে আমি প্রায়ই কুয়েতে যেতাম, কিন্তু ফ্লাইট বন্ধ থাকায় এখন সেটাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।'
বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় বিএমইটির ছাড়পত্র পাওয়ার পরও কর্মীরা কুয়েতে যেতে পারছেন না। মার্চে ১ হাজার ৫৩৯ জন কুয়েতগামী কর্মীকে ছাড়পত্র দিয়েছে বিএমইটি। আগের মাসে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৫২ জন।
যাদের ভিসা হয়ে গেছে তারাও যেতে পারছেন না উল্লেখ করে কামাল বলেন, 'যারা ২৮ তারিখের পর বিএমইটির ছাড়পত্র পেয়েছেন, তারা ফ্লাই করতে পারেননি। এমনকি আগের প্রার্থীরাও এখনো আটকে আছেন। পুরো প্রক্রিয়াই স্থবির হয়ে পড়েছে।'
তিনি আরও জানান, ট্রানজিট ভিসার প্রয়োজন হওয়ায় বিকল্প রুটে যাওয়াও এখন সম্ভব হচ্ছে না।
তবে কর্তৃপক্ষ সীমান্ত এলাকাগুলো থেকে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে। এসব সাপ্তাহিক ফ্লাইটে 'টু-ওয়ে' যাতায়াত করা যায়। যাত্রীদের বাসযোগে সীমান্ত পয়েন্ট থেকে কুয়েতে নেওয়া হচ্ছে।
ভিসার মেয়াদ ফুরোচ্ছে, দেশেই আটকা কর্মীরা
ছুটি কাটাতে দেশে ফেরা একাধিক প্রবাসী কর্মীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলার কারণে অন্তত আটজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
৩০ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ১ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
টিপু সুলতান বলেন, চলমান সংকটের কারণে অনেক প্রবাসী কর্মীর ভিসা, ছুটির মেয়াদ ও ইকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের জন্য কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিসার মেয়াদ এক মাস বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব এসব বিষয়ে কর্মীদের নিজ নিজ নিয়োগকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে।
ডাটাবেজ ও নতুন শ্রমবাজার খোঁজা জরুরি
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। যারা বিদেশে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন, যাদের ভিসা প্রক্রিয়াধীন এবং বর্তমানে শ্রমিকের চাহিদা কেমন—এসব তথ্য এই ডাটাবেজে থাকতে হবে। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কার্যকর নীতি প্রণয়ন সহজ হবে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকেরা ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো বিকল্প শ্রমবাজারগুলোতে নজর দেওয়ার কথা বলেছেন। তবে এসব দেশে ভিসার কাজ হতে সময় লাগে। পাশাপাশি ভাষার দক্ষতা এবং বিশেষায়িত কাজ জানার প্রয়োজন হয়।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, 'বিশ্বজুড়ে এখন দক্ষ ও বিশেষায়িত কর্মীদের চাহিদা বাড়ছে। আমাদের কর্মীদের অবশ্যই কারিগরি দক্ষতা, ভাষার জ্ঞান এবং পেশাগত প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে।'
