আরব সাগরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়া জাহাজ থেকে উদ্ধারকৃত ১৮ নাবিকের ৫ জন বাংলাদেশি
আরব সাগরে পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার পর পাঁচজন বাংলাদেশিসহ ১৮ জন ক্রু সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনাটি ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তার ঝুঁকিকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
'এমভি গোল্ড অটাম' নামক জাহাজটি চীনের সাংহাই থেকে ওমানের সোহারে যাচ্ছিল।
গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিকেলে—অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র একদিন আগে—হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছালে জাহাজটিতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
জাহাজটিতে মোট ২২ জন ক্রু সদস্য ছিলেন—যাদের মধ্যে ৬ জন বাংলাদেশি, ১১ জন চীনা, ৩ জন ইন্দোনেশীয় এবং ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারের ১ জন করে নাগরিক ছিলেন।
ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটিকে তীরে ফিরিয়ে আনার কাজে সহায়তা করার জন্য ক্যাপ্টেন এবং মাজহারুল আবেদিন শাওন নামক অপর এক বাংলাদেশিসহ মোট ৪ জন ক্রু এখনো জাহাজটিতে অবস্থান করছেন।
উদ্ধারকৃতদের মতে, হামলার ফলে জাহাজের বেশ কয়েকটি অংশে আগুন ধরে যায়। একপর্যায়ে জাহাজের ইঞ্জিন বিকল হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ক্যাপ্টেন জাহাজটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করার নির্দেশ দেন।
একজন বাংলাদেশিসহ ৪ জন ক্রু লাইফবোটে করে পালানোর চেষ্টা করলেও ইঞ্জিন বিকল হয়ে তারা উত্তাল সমুদ্রে আটকা পড়েন। প্রচণ্ড ঢেউ ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে তারা যখন অসহায় অবস্থায় ছিলেন, তখন 'এমভি ইউনিস' নামক একটি যাত্রীবাহী জাহাজ তাদের উদ্ধার করে।
ফোনে এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বাংলাদেশি নাবিক এহসান সাবরি রিহাদ বলেন, 'আমরা প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কয়েক ঘণ্টা পর একটি জাহাজ দেখতে পাই এবং দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ফ্লেয়ার ব্যবহার করি। পরে দাঁড় বেয়ে আমরা সেই জাহাজে পৌঁছাতে সক্ষম হই।'
পরবর্তীতে পাকিস্তান নৌবাহিনী একটি উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তারা ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ থেকে আরও ১৪ জন ক্রুকে উদ্ধার করে এবং আগে উদ্ধার হওয়া ৪ জনকেও নিজেদের হেফাজতে নেয়। এর ফলে মোট উদ্ধারের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৮ জনে।
উদ্ধারকৃত নাবিকদের গত বুধবার (৮ এপ্রিল) করাচি বন্দরে নিয়ে আসা হয়, যেখানে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতে তাদের একটি হোটেলে স্থানান্তরিত করা হয়।
বর্তমানে করাচিতে অবস্থানরত পাঁচজন বাংলাদেশি নাবিক হলেন— তৌহিদুল রহমান, সৈকত পাল, রিয়াদ হোসেন, আবদুল্লাহ আল মারুফ এবং রিহাদ।
রিহাদ জানান, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে পাসপোর্ট এবং কন্টিনিউয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় সব নথিপত্র পুড়ে গেছে, যা তাদের দেশে ফেরার বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, 'আমরা যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চাই। আমাদের নথিপত্র আগুনে পুড়ে গেছে। আমরা আশা করি দূতাবাস এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।'
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং নাবিকদের দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সহজ করার কাজ করছেন।
এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার এই ঘটনাটি ঘটল।
