মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-পূর্ব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ভর্তুকি, ঋণ পরিশোধের প্রাক্কলন
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট – এমন কিছু পুরোনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ অর্থনৈতিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। এই আমলে না নেওয়ার কারণে, ভর্তুকি ও সরকারের ঋণ পরিশোধের জন্য বরাদ্দগুলো কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেখানো হয়েছে; যার ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান প্রাক্কলনগুলো বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে বাজেট নথিপত্র, সরকারি কর্মকর্তা ও স্বাধীন বিশ্লেষকদের আলোচনা থেকে জানা গেছে।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতের জেরে ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে বাড়া সত্ত্বেও, সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ কমিয়ে ৮৯ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করেছে। এটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের (অর্থবছর ২৫) প্রকৃত ভর্তুকির তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি বা ১৮ শতাংশ কম। একইভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছর নাগাদ মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ২৬.৩৩ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হলেও, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ কমিয়ে ১,২৭,৫০০কোটি টাকা করা হয়েছে—যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যয়ের চেয়ে প্রায় ৯,০০০ কোটি টাকা কম।
যুদ্ধ-পূর্ব অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক্কলনগুলো মূলত গত বছরের নভেম্বর মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আর্থিক, মুদ্রা ও মুদ্রা বিনিময় হার সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় অনুমোদিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠন করার পর এপ্রিলে কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের আরেকটি বৈঠক হলেও, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে বিবেচনায় নিয়ে—সেখানে এসব প্রক্ষেপণের তথ্য হালনাগাদ করা হয়নি।
এই তথ্যটি গত ১১ জুন বাজেটের সাথে প্রকাশিত ''মিডিয়াম-টার্ম ম্যাক্রোইকোনিক পলিসি স্টেটমেন্ট' বা মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি-র একটি ফুটনোটে স্পষ্টভাবে স্বীকার করে বলা হয়েছে: "এখানে উপস্থাপিত প্রাক্কলনগুলো মূলত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের জন্য কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদিত জুলাই-নভেম্বর সময়ের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যার ফলে, এই প্রাক্কলনগুলোতে ব্যবহৃত তথ্যে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব প্রতিফলিত হয়নি... ফলস্বরূপ, অতি সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট এবং প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে বিবেচনা করলে, কিছু প্রাক্কলন বাস্তবতার চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে বলে মনে হতে পারে।"
এই সংঘাত আঞ্চলিক জ্বালানি বাজারকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস, কয়লা ও সারের দাম বেড়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, এই ক্রমবর্ধমান আমদানি ব্যয়ের কারণে চলতি অর্থবছরেই ইতিমধ্যে ৪২,৬০০ কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে। এছাড়া এই সংঘাত মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে উসকে দিতে ভূমিকা রেখেছে এবং এর আগে আমদানি ও রপ্তানি খাতে ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেলেও বর্তমানে এর গতি ধীর করে দিয়েছে।
প্রশ্নবিদ্ধ সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাস
অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকেরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণের লক্ষ্যমাত্রাগুলোর তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এগুলো বর্তমান প্রবণতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশ এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৮.৬৩ শতাংশে। চলতি জুন শেষেই এই অর্থবছর শেষ হবে। অথচ চলতি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশে নেমে আসবে বলে প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ৭.৫ শতাংশ প্রাক্কলনও করা হয়েছে।
একইভাবে চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে রপ্তানি আয়ে ২.৫৫% ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও—অর্থবছর শেষে রপ্তানিতে ৯.০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা সামান্য কমিয়ে ৭.৯৪ শতাংশ প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য দেখাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের এপ্রিলে বেসরকারিখাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪.৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তা সত্বেও জুন শেষে বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হওয়ার আশা প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেসরকারিখাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে উঠবে। বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, "এই প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ এগুলো এমন কিছু পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। অনেক অনুমানই বর্তমান বাস্তবতার সাথে মিলছে না এবং প্রাক্কলন ও লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা সম্ভব হবে না।"
কৃত্রিমভাবে সংকুচিত ব্যয়
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দর কমছিল, ডলারও মূল্য হারাচ্ছিল। ফলে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে সরকারের ভর্তুকির চাপ সহনীয় পর্যায়ে ছিল। তবে সেই সুযোগ এখন বন্ধ হয়ে গেলেও বাজেটে তার উল্টো চিত্রের প্রতিফলন ঘটেছে। বর্তমান পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ভর্তুকি বরাদ্দ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয় এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত প্রাক্কলন—উভয়ের তুলনায় কমিয়ে আনা হয়েছে।
সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকিতে সরকারের প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১,০৮,৬৭৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এখাতে বরাদ্দ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯৫,০৩১ কোটি টাকা এবং আগামী অর্থবছরের জন্য ভর্তুকিতে ৮৯,৫৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১,৩৬,১২৩ কোটি টাকা। ওই সময় সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ২১.৪৪ লাখ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঋণ বেড়ে ২৬.৩৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে বাজেট নথিতে উল্লেখ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। ঋণের পরিমাণ বাড়লেও সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১,২৭,৫০০ কোটি টাকা।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম না কমলে বা দেশে দাম না বাড়ালে – আগামী অর্থবছরে প্রকৃত ভর্তুকির পরিমাণ বাজেট বরাদ্দের তুলনায় ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে। একইভাবে ঋণের সুদ পরিশোধেও বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ১৫,০০০ কোটি টাকা বেশি প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান তারা।
কাগজে-কলমে পরিচালন ব্যয়ও সংকোচন
কাগজে-কলমে সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিচালন ব্যয়— মোট ব্যয়ের ৬৬.৩০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ৭২.৭৩ শতাংশ। কর্মকর্তাদের দাবি, এই ব্যয় হ্রাসের ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ৫০ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে, পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন স্কেলের জন্য ৩৩,৮১২ কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এর বাইরেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোডে অপ্রত্যাশিতখাতে ৪০০০ কোটি টাকা ও অন্যান্যখাতে ২০৪১ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই সংখ্যাগুলো কেবলই গাণিতিক খসড়া বা সাময়িক হিসাব। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আভাস দিয়েছেন যে, সরকার ৪১ লাখ ফ্যামিলি কার্ড ইস্যুর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, এক বছরের মধ্যে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নাও হতে পারে। এছাড়া, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ধীরগতির বাস্তবায়নের কারণে এডিপিতে বরাদ্দের অর্থও অব্যয়িত থাকবে। ফলে সংশোধিত বাজেটে এই তহবিলগুলো অলক্ষ্যে বা নীরবেই স্থানান্তর করে—কম বরাদ্দের খাতে সংস্থান করা হবে।
বাজেট-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে টিবিএস-এর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে দেখানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কিংবা অর্থসচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার কেউই সরাসরি কোনো উত্তর দেননি।
