ডলারের চেয়ে ইয়েন ও ইউয়ানে ঋণ নেওয়া সাশ্রয়ী, ইআরডির বিশ্লেষণ
ডলারের বদলে জাপানি ইয়েনে ৩৯ কোটি ৯০ লাখ ডলার সমপরিমাণ ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ তার কিস্তি পরিশোধের ক্ষেত্রে ২০ কোটি ডলারেরও বেশি সাশ্রয় করতে পারে—সরকারের নিজস্ব বিশ্লেষণে এখন এমনই তথ্য উঠে এসেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক এক নীতিপত্র (পলিসি ব্রিফ) থেকে জানা গেছে যে, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে ঋণ না নিয়ে—জাপানি ইয়েন বা চীনা রেনমিনবিতে (ইউয়ান) ঋণ নিলে, সামগ্রিক ঋণ পরিশোধের খরচ ৪০% থেকে ৫০% পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
এই ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সরকার এখন এআইআইবি এবং চীন-নিয়ন্ত্রিত নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) উভয়ের থেকেই বিবিধ মুদ্রায় বা মাল্টি-কারেন্সি ঋণ নেওয়ার পরিধি বাড়ানোর কথা ভাবছে।
তবে ইআরডির কিছু কর্মকর্তা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক ঋণের একটি বড় অংশই ইতোমধ্যে ইয়েনে রয়েছে। ফলে এই মুদ্রায় ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ালে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে ইউরো একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। অর্থনীতিবিদরাও সাবধান করে বলছেন যে, ডলার বহির্ভূত মুদ্রায় বাংলাদেশের আয় সীমিত হওয়ায়— এই রূপান্তর বা শিফট চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
তবে পরিসংখ্যানগুলো বেশ জোরালো যুক্তি দিচ্ছে। ২০২৪ সালের জুনে এআইআইবি-র 'ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট ইনক্লুসিভ ডেভেলপমেন্ট' কর্মসূচির অধীনে ৩৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারের একটি বাজেট সহায়তা ঋণ সই করা হয়। এটি ডলারে পরিশোধ করতে হলে মোট খরচ পড়বে প্রায় ৬৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
কিন্তু এই ঋণটি যদি জাপানি ইয়েনে নেওয়া হতো, তবে সেই অংকটি নেমে আসত ৪৯ কোটি ২০ লাখ ডলারে—যার অর্থ প্রায় ২০ কোটি ২০ লাখ ডলার সাশ্রয়। আবার চীনা ইউয়ানে এই ঋণের খরচ পড়ত প্রায় ৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা ডলারের তুলনায় ১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার কম।
সুদ হারের বিশাল ব্যবধানই এই পার্থক্যের মূল কারণ। বর্তমানে ডলার-ভিত্তিক ঋণের খরচ সবচেয়ে বেশি, যেখানে বেঞ্চমার্ক সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট বা সোফর ৫ শতাংশের উপরে। বিপরীতে জাপানের দীর্ঘমেয়াদী নমনীয় মুদ্রানীতির কারণে, ইয়েনে সুদের হার মাত্র ১.৫% থেকে ১.৭% এর মধ্যে, আর ইউয়ানে এই হার প্রায় ২.৫%।
বাংলাদেশের প্রথম মাল্টি-কারেন্সি ঋণ
সরকার ইতোমধ্যে এ লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছে। গত অর্থবছরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কালিয়াকৈর বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ১৬ কোটি ডলারের একটি ঋণ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একক ঋণ চুক্তিতে তিনটি মুদ্রা ব্যবহার করা হয়েছে। এই অর্থায়নের বিভাজন ছিল মার্কিন ডলার (১০ কোটি ৯৭ লাখ ৮০ হাজার), ইউরো (২ কোটি ৯৪ লাখ ২০ হাজার) এবং রেনমিনবি (১৩ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার ইউয়ান)।
এখন সরকার আরও অগ্রসর হচ্ছে। এনডিবির 'এক্সপান্ডেড ঢাকা সিটি ওয়াটার সাপ্লাই রেজিলিয়েন্স' প্রকল্পের অধীনে ৩২ কোটি ডলারের একটি ঋণের কাঠামো ডলার, ইউরো এবং রেনমিনবির সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঋণের প্রতি কিস্তি ছাড়ের আগে মুদ্রা বাছাই করার নমনীয়তা বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর হাতে থাকবে।
এআইআইবি একটি বিশেষ সুবিধাও দিচ্ছে যা মুদ্রা কৌশল ব্যবস্থাপনাকে সহজ করবে। ঋণগ্রহীতারা ঋণের মেয়াদকালে সর্বোচ্চ চারবার ঋণের মুদ্রা বা সুদের হার পরিবর্তন (কনভার্ট) করতে পারবেন। তবে সুদের হার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রতিবার সর্বোচ্চ ৫০ কোটি ডলার এবং মুদ্রার ক্ষেত্রে ৩০ কোটি ডলারের সীমা এবং নির্দিষ্ট ফি প্রযোজ্য হবে।
দুই বছরেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এই অঞ্চলের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তি, ঋণ এবং বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়নের জন্য ইউয়ান ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়। মূলত ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমানোই ছিল এর লক্ষ্য।
কারেন্সি বাস্কেটের পক্ষে যুক্তি
ইআরডির পলিসি ব্রিফে সুপারিশ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ যেন কোনো একটি একক মুদ্রায় সীমাবদ্ধ না থেকে ডলার, ইয়েন এবং ইউয়ানের সমন্বয়ে একটি 'কারেন্সি বাস্কেট' (মুদ্রাঝুড়ি) পদ্ধতি গ্রহণ করে। আইএমএফ এবং গোল্ডম্যান স্যাকস-এর সুপারিশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই কৌশলটি একটি মূলত 'হেজিং' (ঝুঁকি কমানোর কৌশল) হিসেবে কাজ করবে: যখন একটি মুদ্রার মান বাড়বে, তখন অন্য মুদ্রার মানের ওঠানামা সেই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, ডলার ঋণের ক্রমবর্ধমান সুদের হার এবং বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের অত্যধিক প্রাধান্য কমানোর প্রয়োজনীয়তা—এই দুই চাপের কারণেই তারা এই পথে হাঁটছেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নীতিগতভাবে এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, "ঋণের মুদ্রায় বৈচিত্র্য আনা এক ধরণের প্রাকৃতিক হেজিং হিসেবে কাজ করে। একটি বড় ঋণ যদি ডলার, ইউরো এবং ইয়েনের মধ্যে ভাগ করা থাকে, তবে কোনো একটি মুদ্রার মান বাড়লে অন্যটির ওঠানামা তা আংশিক সামাল দিতে পারে। ফলে পুরো ঋণ স্থিতির ওপর একসাথে চাপ পড়ে না।"
তবে তিনি এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বলেন, "আপনি যে মুদ্রায় ঋণ নিচ্ছেন, আইডিয়ালি আপনার আয়ও সেই মুদ্রায় হওয়া উচিত।"
বাংলাদেশের রপ্তানি আয় মূলত ডলারে এবং কিছুটা ইউরোতে আসে। ইয়েন বা রেনমিনবিতে আয়ের পরিমাণ খুবই সীমিত। যেসব মুদ্রায় আয় কম, সেই মুদ্রায় ঋণ নেওয়ার অর্থ হলো কিস্তি পরিশোধের সময় খোলা বাজার থেকে সেই মুদ্রাগুলো কিনতে হবে। এটি সম্ভাব্য সাশ্রয়কে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে এবং নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ইআরডির অভ্যন্তরে ভিন্নমত
ইআরডির সব কর্মকর্তা অবশ্য এই যুক্তিতে আশ্বস্ত নন। কেউ কেউ মনে করেন, ডলার এখনো বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি এবং ইয়েনে ঋণ কেন্দ্রীভূত করা নিজস্ব ঝুঁকি বহন করে। জাপানি মুদ্রার মান গত তিন দশকে ডলারের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে দুর্বল হয়েছে—১৯৯৫ সালে প্রতি ডলারের মান ৯৬.৬১ ইয়েন থাকলেও— ২০২৫ সালের শেষে তা ১৫৫.৯২ ইয়েনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জাপানের মুদ্রানীতিতে হঠাৎ কোনো কঠোর পরিবর্তন আসলে ইয়েনের মান লাফিয়ে বাড়তে পারে, যা ঋণ পরিশোধের বোঝা নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেবে।
বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ১৯.৬ শতাংশ বর্তমানে ইয়েনে রয়েছে, যা কারেন্সি বাস্কেটে তৃতীয় অবস্থানে। এসব কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, ইয়েনে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ালে ঝুঁকি কমার বদলে বরং বাড়তে পারে। তাদের সুপারিশ হলো: বৈচিত্র্যই যদি লক্ষ্য হয়, তবে ইয়েনের চেয়ে ইউরোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "মাল্টি-কারেন্সি ঋণ তখনই কার্যকর হবে— যখন আপনার সেই নির্দিষ্ট মুদ্রায় ঋণ পরিশোধের পর্যাপ্ত ক্যাশ ফ্লো থাকবে। যদি তা না থাকে, তাহলে শেষ পর্যন্ত আপনাকে বাজার থেকেই সেই মুদ্রা কিনতে হবে, যা যেকোনো সুবিধাকে মুছে দেবে এবং খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে।"
তিনি এই কৌশল সম্প্রসারণের আগে বিভিন্ন মুদ্রায় বাংলাদেশের আয় করার সক্ষমতা, রিজার্ভের পর্যাপ্ততা এবং লেনদেনের খরচ সতর্কতার সাথে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইআরডি নিজেও এই জটিলতা স্বীকার করেছে। তাদের নীতিপত্রে মুদ্রার সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি মডেলিং করার জন্য অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, কাগজে-কলমে এই কৌশল যতটাই আশাব্যঞ্জক মনে হোক না কেন, এটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের বর্তমানে যা আছে তার চেয়ে আরও উন্নত ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
ইআরডির বিশ্লেষণের তাৎপর্য
সারকথা হলো, ডলারের খরচ বেড়ে যাওয়া এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার এই সময়ে বাংলাদেশ তার ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে ভাবছে। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য সাশ্রয় যেমন বাস্তব এবং উল্লেখযোগ্য, ভুল করার ঝুঁকিও ঠিক তেমনই প্রবল।
জাহিদ হোসেনের ভাষায়: "এটি কোনো খারাপ কৌশল নয়, যদি তা কার্যকর করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা থাকে।"
